২৫ জানুয়ারী ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

স্বয়ংসম্পূর্ণ ৩ বছরে ॥ পেঁয়াজ উৎপাদন ৩০ লাখ টনে নিয়ে যাওয়ার টার্গেট

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৯
স্বয়ংসম্পূর্ণ ৩ বছরে ॥ পেঁয়াজ উৎপাদন ৩০ লাখ টনে নিয়ে যাওয়ার টার্গেট
  • উৎপাদন মৌসুমে বন্ধ থাকবে আমদানি
  • চাষীরা পাবেন প্রণোদনা
  • চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদন করতে চায় সরকার

কাওসার রহমান ॥ সারাবছর পশুতে স্বাবলম্বী হওয়ার পর সরকার এবার পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও ভারত নির্ভরতা কাটিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী তিন বছরেই সরকার পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে চায়। এ লক্ষ্যে পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকাগুলোতে আগামী বছরে আরও বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় মনে করছে, ৩০ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারলে দেশে পেঁয়াজ সঙ্কট আর হবে না।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দেশে পেঁয়াজের নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির পর সরকার চিন্তা শুরু করে কোরবানির গরুর মতো পেঁয়াজেও বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে না কেন? দেশের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে একটি প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর যে নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে সেখান থেকে বাংলাদেশ কিভাবে বেরিয়ে আসতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের গরুর খামারিরা যে সফলতা দেখিয়েছেন, সেটি পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সম্ভব। আমাদের চাষীদের যে সক্ষমতা আছে, সেক্ষেত্রে তারা খুব সহজেই ৩০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে চাষীদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চাষীরা যখন পেঁয়াজ উৎপাদন করে বাজারে নিয়ে আসবেন, তখন যেন ভারত থেকে স্বল্প সময়ের জন্য পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়। চাষীরা যদি পেঁয়াজের দাম পান, তাহলে পরবর্তী বছর আরও বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন করবেন। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশ পেঁয়াজেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। এ লক্ষ্যে বাজারে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ যেন বৃদ্ধি পায় তা নিশ্চিত করতে পেঁয়াজ-চাষীদের প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে কৃষি সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘ফরিদপুর, মেহেরপুর ও পাবনা এলাকায় পেঁয়াজ বেশি উৎপাদন হয়। আমরা এসব এলাকায় আগামীতে আরও বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। আমরা যদি ৩০ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারি তাহলে দেশে আর পেঁয়াজ সঙ্কট হবে না। আমরা এ লক্ষেই পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছি।’

তিনি বলেন, পেঁয়াজ-চাষীরা যেন তাদের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পান, তা নিশ্চিত করতে আমরা কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। পেঁয়াজের উৎপাদন মৌসুমে যেন বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছি। সেক্ষেত্রে আমদানি করা পেঁয়াজের তুলনায় বাজারে দেশে উৎপাদন করা পেঁয়াজের পরিমাণ বেশি থাকবে এবং তার ফলে পেঁয়াজ-চাষীরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন।

কৃষি সচিব বলেন, ‘কৃষকরা যেন তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনে আগ্রহী হন সেজন্য আমরা প্রণোদনা দেয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার চায় পেঁয়াজের চাহিদার পুরোটা যেন দেশের পেঁয়াজ-চাষীরাই উৎপাদন করতে উৎসাহী হন, সে বিষয়ে উৎসাহ দিতে আগামী রবি মৌসুমে পেঁয়াজ-চাষীদের প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী বলেছেন, ‘আগামী তিন বছরের মধ্যে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে দেশ। কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান সেজন্য এবার পেঁয়াজ উঠলে রফতানি বন্ধ করা হবে।’ দেশের এই পেঁয়াজ সঙ্কট সমাধানে ব্যবসায়ীদের মানবিক হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

যেভাবে গরুতে সাফল্য এসেছে

জানা যায়, দেশ বিভাগের পর থেকেই বাংলাদেশের পশুর বাজার ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে। বিশেষ করে গরুর মাংসের বাজারে। এক লাফে গরুর মাংসের দাম কেজি প্রতি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তীব্র সঙ্কট তৈরি হয় কোরবানির পশু সংগ্রহের ক্ষেত্রে। গরুর দামও দ্বিগুণ বেড়ে যায়। হঠাৎ করে গরু রফতানি বন্ধ করে দেয়ার প্রথম দুই বছর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে কোরবানির জন্য গরু খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছিল অনেকের জন্য। শেষদিকে গরুর হাটে গিয়ে লোকজন কোরবানির জন্য গরু পাননি এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। এই সঙ্কটকে দেশের গরু খামারিরা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। ভাল দাম পাওয়ায় সারাদেশে একের পর এক গরুর খামার গড়ে উঠতে থাকে। নতুন অনেক উদ্যোক্তা শুরু করেন গরুর খামার। ফলে খুব দ্রুতই পাল্টে যায় বাংলাদেশে পশু পালনের চিত্রটি। এ পর্যন্ত দেশে ৫ লাখ ৭৭ হাজার গরুর খামার গড়ে উঠেছে।

গত কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে অনেক গরুর খামার গড়ে উঠেছে। গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের কোরবানির পশুর বাজার ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয়। কোরবানির জন্য দেশে উৎপাদিত পশু দিয়েই মূলত চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। এ বছর যে এক কোটি ১১ লাখ পশু কোরবানির সময় জবাই হয়েছে তার প্রায় পুরোটাই দেশীয়। এ বছর কোরবানির জন্য প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ পশু প্রস্তুত ছিল। বিপরীতে ভারত থেকে পশু আমদানিও ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। গত ছয় বছরে এই আমদানি ২৩ লাখ থেকে এক লাখে নেমে এসেছে।

গরুর মতোই যেসব ভোগ্যপণ্যের জন্য বাংলাদেশের ভোক্তারা ভারতের ওপর অনেক নির্ভরশীল তার মধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম এখন আকাশচুম্বী। গত একবছরে পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে পাঁচ শ’ ভাগের বেশি। টিসিবির তথ্য বলছে, একবছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালের নবেম্বরে প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকায় এবং আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ২০ থেকে ৩০ টাকায়। এই হিসেবে গত এক বছরে দেশী পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে ৫৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। আর গত এক মাসের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির মূল্য বেড়েছে ৮২ দশমিক ৬১ শতাংশ। একবছরে আমদানি করা পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে ৫৪০ শতাংশ।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমদানি করা মিসরের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। আর দেশী পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে। তবে ভাল পেঁয়াজ (দেশী) ২৬০ থেকে ২৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকায় টিসিবি এখন প্রতিদিন ৫০টি ট্রাকে ১ হাজার কেজি করে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। টিসিবির পেঁয়াজ অবশ্য ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর অনেক খুচরা ও মুদি দোকানদার পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন।

পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হতে পরিকল্পনা

পেঁয়াজের এই নজিরবিহীন মূল্য বৃদ্ধি যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে সেটি হচ্ছে, ভারতের ওপর যে নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে সেখান থেকে বাংলাদেশ কি বেরিয়ে আসতে পারবে? এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ও চিন্তাভাবনা করছে। মন্ত্রণালয়ের চিন্তাভাবনা হচ্ছে, পেঁয়াজ উৎপাদনের সময় যদি অন্তত চার মাস ভারত বা অন্য কোন প্রতিবেশী দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়, তাহলে কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদন করে ভাল দাম পাবেন। এতে কৃষক পেঁয়াজ চাষে উৎসাহিত হবেন এবং পেঁয়াজেও দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ চাহিদার ৬০ শতাংশ পেঁয়াজ দেশেই উৎপাদিত হয়। বাকি ৪০ শতাংশ পেঁয়াজ বিদেশ থেকে আমদানি করে চাহিদা পূরণ করা হয়। উদ্যোগ নিলে এই ৪০ শতাংশ পেঁয়াজও দেশে উৎপাদন করা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামান মনে করেন, ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের গরুর খামারিরা যে সফলতা দেখিয়েছেন, সেটি পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, ভারত থেকে যদি পেঁয়াজ না আসত তাহলে হয়তো বাংলাদেশের কৃষক উৎপাদিত পেঁয়াজের ভাল দাম পেতেন।

কৃষি সচিব বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ক্ষেত্রে কেজি প্রতি ১০-১২ টাকা পান, ভারত থেকে পেঁয়াজ না আসলে বাংলাদেশের কৃষকরা প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৩০-৩২ টাকা পেতেন।’

তিনি বলেন, সরকারী হিসেবে বাংলাদেশে বর্তমানে ২৩ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। কিন্তু পেঁয়াজ ঘরে তোলার সময় প্রায় পাঁচ লাখ টন নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ বাজারে থাকে। অন্যদিকে বিদেশ থেকে আমদানি হয় ১১ লাখ টন। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ প্রয়োজন।

মোঃ নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের চাষীদের যে সক্ষমতা আছে, সেক্ষেত্রে তারা খুব সহজেই ৩০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পাবেন। সেক্ষেত্রে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলেছি যখন চাষীরা পেঁয়াজ উৎপাদন করে বাজারে নিয়ে আসবেন, তখন যেন ভারত থেকে আপাতত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়। এতে কৃষকরা যদি পেঁয়াজের দাম পান, তাহলে পরবর্তী বছর আরও বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন করবে।’

কৃষি সচিব আরও বলছেন, বিষয়টি নিয়ে অতীতে ভিন্ন চিন্তা করা হয়নি। কৃষক যখন উৎপাদন করে তখন বিদেশ থেকে আমদানি করলে দাম অনেক নেমে যায়। এটা যাতে না হয়। এটা হলে পরবর্তী বছর কৃষক উৎপাদন করতে আগ্রহী হন না। ভারত থেকে বা দেশের বাইরে থেকে যে পেঁয়াজ আসবে, সেটা যদি না আসে তাহলে সারাবছর হয়তো আমাদের দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের দাম একটু বেশি থাকবে। হয়তো কেজি প্রতি ৪০-৪৫ টাকা থাকবে, কিন্তু কখনও আড়াই শ’ টাকায় উঠবে না।

পেঁয়াজ সঙ্কট স্থায়ীভাবে সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে কৃষি সচিব মোহাম্মদ নাসিরুজ্জামান বলেন, পেঁয়াজ-চাষীরা যেন তাদের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পান, তা নিশ্চিত করতে কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। তিনি বলেন, সাধারণত আমরা দেখি দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ যখন বাজারে আসে তখন আমদানিকৃত পেঁয়াজও বাজারে থাকে। ফলে দেশীয় পেঁয়াজের দাম পড়ে যায় এবং পেঁয়াজ চাষীরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না। এই পরিস্থিতি যেন এবার তৈরি না হয় সে লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পেঁয়াজের উৎপাদন মৌসুমে যেন বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছি আমরা। সেক্ষেত্রে আমদানি করা পেঁয়াজের তুলনায় বাজারে দেশে উৎপাদন করা পেঁয়াজের পরিমাণ বেশি থাকবে এবং তার ফলে পেঁয়াজ-চাষীরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন।

এছাড়া বাজারে দেশে উৎপাদন করা পেঁয়াজের পরিমাণ যেন বৃদ্ধি পায় তা নিশ্চিত করতে পেঁয়াজ-চাষীদের প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষকরা যেন তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনে আগ্রহী হন সেজন্যই এই প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান কৃষি সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকার চায় পেঁয়াজের চাহিদার পুরোটা যেন দেশের পেঁয়াজ-চাষীরাই উৎপাদন করতে উৎসাহী হয়, সে বিষয়ে উৎসাহ দিতে আগামী রবি মৌসুমে পেঁয়াজ চাষীদের প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উৎপাদন বাড়ানোর

বিকল্প নেই

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ উৎপাদন করতে না পারলে যে কোন সময় এমন সঙ্কট আবার দেখা দিতে পারে। আমাদের কখনই উচিত হবে না একটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল হওয়া। পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প বাজারও খুঁজতে হবে। তাছাড়া বাংলাদেশের ভেতরেও পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, পেঁয়াজের জন্য ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার একটি দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমত, ঐতিহাসিকভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভারতের পেঁয়াজের গুণগত মান এবং দাম বিবেচনা করলে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুদ্দিন বলেছেন, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন হলেও এই ফসল উৎপাদনে কৃষকদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।

চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে কৃষক যতটা আগ্রহী, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে তেমনটা নন। কারণ চাল উৎপাদন অপেক্ষাকৃত লাভজনক। যে জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়, সেই জমিতে অন্য ফসলও ফলানো হয়। তাই বলা যায় যে, জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকে।

পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় চাইলেই ফসল ফলানোর জন্য জমি বাড়ানো যাবে না। বাংলাদেশে সাধারণত শীতকাল পেঁয়াজ উৎপাদনের উপযোগী আবহাওয়া, এখন নতুন জাতের পেঁয়াজ গরমকালে উৎপাদন করা গেলেও সেগুলো বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। এছাড়া বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে পানি জমে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে পড়ে। তাই পচনশীল এই পণ্যটি সংরক্ষণ করা জরুরী হলেও বাংলাদেশে পেঁয়াজের জন্য উপযুক্ত কোল্ড স্টোরেজের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আলু যে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয়। সেখানে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায় না। কারণ পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজে আর্দ্রতা লাগবে ৬০ শতাংশ, তাপমাত্রা লাগবে আট ডিগ্রী থেকে ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। আলুর কোল্ড স্টোরেজে এই মাত্রাটা ভিন্ন থাকে।’

সব জমিতে পেঁয়াজের ফলন না হওয়াকে উৎপাদন কম হওয়ার কারণ হিসেবে মনে করছেন ড. জহিরুদ্দিন। তিনি বলেন, পেঁয়াজের উপযুক্ত জমি হলো মিডিয়াম হাইল্যান্ড, মিডিয়াম লো ল্যান্ড অর্থাৎ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোয় পেঁয়াজের ফলনটা ভাল হয়। কিন্তু সিলেট বা দক্ষিণে চট্টগ্রামের হাইল্যান্ড বা বেশি লো ল্যান্ডে এর ফলন হবে না। কারণ জমিতে পানি জমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। জমিতে কোন ফসল ফলানো হবে সেটার সিদ্ধান্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কৃষকরা নেয়ায় বাজারে আকস্মিক সঙ্কট দেখা দেয় বলে তিনি মনে করেন।

পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কম সময়ে ফলন বেশি হয় এমন জাতের পেঁয়াজ উদ্ভাবন করতে পারলে অথবা বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্য উপযোগী পেঁয়াজের উচ্চ ফলনশীল বীজ আমদানি করা গেলে উৎপাদন অনেকটা বাড়ানো সম্ভব।

কৃষকরাও পেঁয়াজ চাষে একই সমস্যার কথা বলেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশের সরকার এবং ব্যবসায়ীরা চাল বা অন্যান্য শস্য উৎপাদনের দিকে যতটা মনযোগী, তেমনটা পেঁয়াজ বা অন্য ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেখা যায়না। রাজশাহীর কৃষক আসলাম হোসেন বলেন, ‘পেঁয়াজে মনে করেন লাভ কম। চালে মুনাফা বেশি। পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। একটু বৃষ্টি হলে জমিতে পানি ওঠে পচে যায়। ফলে লোকসান হয় অনেক।’

কৃষিমন্ত্রীর লক্ষ্যও পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ভারত যে হঠাৎ করে পেঁয়াজ দেয়া বন্ধ করে দেবে আমরা ভাবতেও পারিনি। তবে আমাদের আগে থেকেই অনুমান করা উচিত ছিল, আরও আগে উদ্যোগ নিলে হয়তো এমন অবস্থা হতো না। আমরা এখন চেষ্টা করছি পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর।’

তিনি বলেন, ‘আমরা পেঁয়াজের অনেকগুলো ভ্যারাইটি নিয়ে এসেছি। এসব জাত মাঠে আবাদেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করি আগামী বছর আমরা পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব।’

মন্ত্রী জানান, দেশে পেঁয়াজের চাহিদার ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে মেটানো হয়। বাকি ৩০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। তবে এবার আমরা পেঁয়াজের মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান। তিনি মনে করেন দেশে পেঁয়াজের যেসব নতুন জাত উদ্ভাবন হয়েছে, তা যদি নিয়মিত চাষ করা হয় তাহলে ভবিষ্যতে পেঁয়াজ আমদানি করা লাগবে না।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষিপণ্য প্রকৃতিনির্ভর, তাই বৃষ্টি-বন্যা কৃষি উৎপাদনে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। গতবছর দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন ভাল হয়েছিল। কিন্তু আগাম বৃষ্টি শুরু হওয়ায় কৃষকরা পেঁয়াজ ঘরে তুলতে পারেনি। পাশাপাশি হঠাৎ করে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে দেশে পেঁয়াজের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতির দ্রুত উত্তরণ ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ এক সময় খাদ্য ঘাটতির দেশ ছিল। কিন্তু আমরা এখন ধান, মাছসহ অধিকাংশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি উৎপাদনে সরকারের গত দশ বছরে অসামান্য সাফল্য রয়েছে। তাই কেবলমাত্র পেঁয়াজের দাম দিয়ে সরকারের সাফল্যকে বিচার করা ঠিক হবে না।

উল্লেখ্য, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ লাখ ৮ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হলেও বৃষ্টির কারণে ৯২৯ হেক্টর জমির পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। ফলে উৎপাদন পাওয়া গেছে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ। তবে গত কয়েক বছরে হেক্টর প্রতি ফলন ১১ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে।

সারাবছর চাষযোগ্য পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবন

সাধারণত পেঁয়াজ রবিশস্য হলেও এবার সেই ধারণা ভেঙ্গে দিলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। উদ্ভাবন করেছেন সারাবছর চাষোপযোগী পেঁয়াজের জাত বারি ৫। সারাবছর চাষের উপযোগী বারি ৫ জাতের এই পেঁয়াজ উদ্ভাবন করেছে মাগুরা আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্র। মাগুরা আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রে এই গবেষণায় তিন বছর আগে সাফল্য পেলেও, এবারই প্রথম চাষীদের মধ্যে পরীক্ষামূলক চারা বিতরণে সাফল্যের দেখা মেলে। একই সঙ্গে উচ্চ ফলনশীল বারি-৪ জাত চাষেও মিলেছে সফলতা। এই জাত চাষে তিন গুণ বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, বার্ষিক ঘাটতি পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এই পেঁয়াজ। মাগুরা অঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান জানান, বারি-৪ এবং সারাবছর চাষযোগ্য বারি-৫ জাতের পেঁয়াজ চাষ করে হেক্টর প্রতি ২৫ থেকে ২৭ টন পেঁয়াজ উৎপাদন সম্ভব। যেখানে সাধারণ পেঁয়াজে হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয় ৭ থেকে ৮ টন।

অবশ্য উচ্চ ফলনশীল হওয়ায় মেহেরপুরের চাষীরা শুরু করেছেন ভারতীয় সুখসাগর পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন। এই জাতের পেঁয়াজের দীর্ঘসময় সংরক্ষণ নিয়েও গবেষণা চলছে কৃষি বিভাগে। কৃষি বিভাগ বলছে, এ জাতের পেঁয়াজে পানি বেশি থাকায় সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা চলছে।

প্রকাশিত : ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

০৭/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: