১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের তাগিদ

প্রকাশিত : ২ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:২৬ পি. এম.
ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের তাগিদ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের জন্য এখাতে বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অতি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে কাঁচামাল উৎপাদনে দ্রুত এপিআই পার্ক (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস) স্থাপন করাও জরুরি। এপিআই পার্ক ব্যতিত পর্যাপ্ত ও মান সম্পন্ন কাঁচামাল উৎপাদন করা সম্ভব নয়। এছাড়া একটি টেকসই এপিআই খাতের বিকাশে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সুবিধা প্রদান, শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া এবং ওষুধ নীতিমালার দ্রুত বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) ‘এ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) : প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে আলোচকরা ওষুধ শিল্পের বিকাশে দ্রুত এই শিল্পের কাঁচামাল দেশেই উৎপাদন করার ওপর সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআই সভাপতি ওসামা তাসির। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম। এছাড়া সেমিনারে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)’র নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম প্রধান অতিথি এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. রুহুল আমিন বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ১৫০টি দেশে ওষুধ রফতানি করা হচ্ছে। যার মোট প্রবৃদ্ধি বছরে ১০ শতাংশ। তবে এই শিল্পের কাঁচামাল আমদানি নির্ভর হয়ে গেছে। মোট ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে দেশে কাঁচামাল উৎপাদিত হলে ওষুধ আরও সহজলভ্য হবে। পাশাপাশি রফতানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক রবিউল মূল প্রবন্ধে আরও জানান, ওষুধের ৪১ প্রকার কাঁচামালের মধ্যে ৩ থেকে ৪ শতাংশ দেশের ৮ কোম্পানির উৎপাদিত। এক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করা প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। এছাড়া দক্ষ ও অভিজ্ঞদের দিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। দেখতে হবে কিভাবে আরও বিনিয়োগ ও গবেষণার মাধ্যমে কাঁচামাল উৎপাদন করা যায়। কারণ কাঁচামাল আমদানির কারণেই প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ওষুধ শিল্প খাতে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের হার তেমন পাচ্ছে না।

ওষুধ কোম্পানিগুলোর চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর দেড় হাজার কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এসব কাঁচামাল দেশে উৎপাদন করা গেলে আমদানি খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বাঁচানো সম্ভব। এবং অন্যদিকে উদ্বৃত্ত কাঁচামাল রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্র অর্জন করা যেত। মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবেও বাংলাদেশের প্যাটেন্ট এপিআই উৎপাদনে কোন আইনী প্রতিবন্ধকতা নেই। আভ্যন্তরীনভাবে দেশে ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ওষুধের বাজার রয়েছে। এধরনের একটি সম্ভাবনাময় খাতকে এগিয়ে নিতে হলে সরকার ও বেসরকারীখাতকে একযোগে কাজ করতে হবে।

প্রসঙ্গত, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে বেশ কয়েক বছর আগে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় এপিআই পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু আমলতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখনো সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতে পারেনি। যদিও প্রতিবছর দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। এপিআই পার্কের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় কাঁচামাল উৎপাদনে ওষুধ কোম্পানিগুলো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। ট্রিপস চুক্তি বাস্তবায়িত হয়ে গেলে পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধ ও কাঁচামাল সুলভ মূল্যে আমদানি সহজ নাও হতে পারে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯৮ শতাংশ চাহিদা মেটাতে সক্ষম, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তিনি বলেন, বতর্মানে প্রায় ১৫০টি দেশে ১৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওষুধ রফতানি করা হচ্ছে। এটি আমাদের ঔষধ খাতের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশে উৎপাদিত ওষুধের গ্রহণ যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আমাদের ট্রিপস (ট্রেড রিলেটেড আসপেক্ট অব ইনটেলেকচুয়্যাল প্রপার্টি রাইটস) চুক্তির আওতায় বিদ্যমান সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য এখনই যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যদি সরকার ও বেসরকারীখাত যৌথভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। তিনি ওষুধ খাত বিশেষকরে সম্ভাবনাময় এপিআই খাতের উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম গতিশীল করার আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে বিশ^বিদ্যালয়সমূহ ও বেসরকারীখাতের মধ্যকার সহযোগিতা আরও বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন। বিডা’র চেয়ারম্যান বলেন, সারা পৃথিবীতে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের গবেষণা পরিচালনায় বেসরকারীখাত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। সেই পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশেও বেসরকারীখাত এগিয়ে আসতে পরে। এপিআই খাতের বিকাশে প্রয়োজনে বিডা হতে সর্বাত্বকসহযোগিতা দেয়া হবে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন এখাতে গবেষণা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহরে পাশাপাশি বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নে সরকার ও বেসরকারীখাতকে একযোগে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ২০৩৩ সালের পরবর্তীতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি টেকসই ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের বিকাশে আমাদের অবশ্যই এপিআই খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। এছাড়া উৎপাদনে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বনামধ্য প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে স্থানীয় উদোক্তাদের যৌথ বিনিয়োগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। যাতে এখাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. রুহুল আমিন বলেন, প্রধামনন্ত্রী ২০১৯ সালকে ‘এপিআই ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পবছর’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে আমাদের পিছিয়ে থাকার কোন সুযোগ নেই। তিনি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পক্ষ হতে এ খাতের বিকাশে নীতি সহায়তা সহ সকল ধরনের সহযোগিতার আশ^াস প্রদান করেন। তিনি উদ্যোক্তাদের এপিআইতে আরও বেশি হারে বিনিয়োগের পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানোর তাগিদ দেন।

প্রকাশিত : ২ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:২৬ পি. এম.

০২/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: