১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

ছাত্রলীগকে গিলে খাচ্ছে ছাত্রদল শিবির

প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৯
  • গোয়েন্দা সংস্থার পর্যালোচনা

শংকর কুমার দে ॥ সারাদেশের শিক্ষাঙ্গনে বিগত দশ বছরে ছাত্র রাজনীতির সন্ত্রাসী কর্মকা-ে নিহত হয়েছে ৫৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই নিহত হয়েছে ৩৯ শিক্ষার্থী। আর ছাত্রলীগের হাতে নিহত হয়েছে ১৫ জন। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগেও অনুপ্রবেশ ঘটেছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা পরিচয় গোপন করে অনুপ্রবেশ করেছে ছাত্রলীগে। সেই হত্যকা-ের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের অনেকেই প্রকৃত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী নন। ছাত্রলীগে শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে বলে জানা গেছে। বিগত দশ বছরের বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির থেকে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে হত্যাকা-, সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটিয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার দাবি। ছাত্রলীগের হাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্দয় নিষ্ঠুর নির্যাতনে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর আলোচনায় এসেছে ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ঘটনা। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এই ধরনের তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ এই সময় একাধিক সহিংসতা, সন্ত্রাসসহ নানা অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বারবার ছাত্রলীগের পদস্থলনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এরপর আওয়ামী লীগে একাধিক কমিটি হয়েছে ছাত্রলীগের কার্যক্রম অনুসন্ধানের জন্য। প্রধানমন্ত্রী তার নিজস্ব টিম দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনা করেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। ছাত্রলীগের ব্যাপারে এই সমস্ত অনুসন্ধান এবং রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায় ছাত্রলীগকে গিলে খাচ্ছে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবির। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র শিবিরের কার্যক্রমগুলো আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যায়। এই সময় ছাত্র শিবির এবং ছাত্রদল পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে। অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ করে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০১২ এর পর থেকে ছাত্র শিবিরের কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্রলীগে যোগদান করে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, ছাত্রশিবিরের পরিচয় গোপন রেখে নতুন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ হিসেবে যোগদান করানো হয়েছে।

২০০৯ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হন ঢাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবুল কালাম আজাদ। তাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। পরে এ নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, ছাত্রশিবির থেকে আসা কিছু লোকজন এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। ২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নসরুল্লাহ নাসিমকে হত্যাকা-ের পেছনেও ছাত্রশিবির থেকে আসা ছাত্রলীগ কর্মীদের ভূমিকা ছিল বলে গোয়েন্দা সংস্থার দাবি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ছাত্রলীগের বিগত কমিটি গঠিত হওয়ার পর ছাত্রলীগের এই অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই সময় দলের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আন্ষ্ঠুানিকভাবে এটাও বলেছিলেন যে, ছাত্রলীগের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছাত্রশিবির প্রবেশ করেছে। ২০১৪-১৫ সালে শুধু ছাত্রশিবির নয়, ছাত্রদলেরও একটা বড় অংশের প্রবেশ ঘটে। এরাও ছাত্রলীগের মধ্যে প্রবেশ করে বিভিন্ন রকম অপকর্ম ঘটাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছাত্রলীগের শিবিরকরণের যে পরিকল্পিত নীলনক্সার বহির্প্রকাশেই এখন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিস্তৃতি বলে গোয়েন্দা সংস্থার দাবি।

গোয়েন্দা অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর ছাত্রশিবির সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের কর্মীদের ছাত্রলীগে প্রেরণ করেন এবং নিজেদের সংগঠন গুটিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে থেকে বিভিন্ন অপকর্ম করার জন্য দলীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের আলোকে জামাত-শিবিরের যারা নেতাকর্মী, তারা তাদের সন্তানদের বা পরিচিত ছাত্রশিবিরদের ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ ঘটায়। এ সমস্ত শিক্ষার্থীদের মূল কাজ হলো যে ছাত্রলীগ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থেকে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম পরিচালনা করা। যে কাউকে মেরে ফেলা, রগ কাটার মতো বিষয়গুলো সারাদেশে ছিল ছাত্রশিবিরের সংস্কৃতি। এ ধরনের সংস্কৃতি ছাত্রলীগে আমদানি হয়েছে। ছাত্রলীগের বিগত কমিটিতে প্রথম ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। শোভন-রাব্বানীর যখন কমিটি হয় তখন এদের বাদ দেয়ার কথা থাকলেও তারা এত শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছিল যে তাদের বাদ দেয়া সম্ভব হয়নি। এখনও ছাত্রশিবিরের একটি বড় অংশ ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দলের নেতৃত্বে আছে বলে অভিযোগ আছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০১ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে যে ১০৭ জন ‘বিতর্কিত’ স্থান পেয়েছেন, তাদের মধ্যে ১৯ জনের পরিবার সরাসরি বিএনপি কিংবা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১১ জন মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, ৮ জন বিভিন্ন মামলার আসামি। ৬ জন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা। রুহুল আমিন ছিলেন গাজীপুর সদরের কাউলতিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। এটা ২০০৬ সালের ঘটনা। এক যুগের মাথায় তিনি এখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। এইচএম তাজউদ্দিন হয়েছেন ছাত্রলীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। তিনি ছিলেন এক সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক সময়কার সাথী (ছাত্রশিবিরের একটি পদবি)। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনাসহ বিতর্কিত কর্মকা-ের জন্য বারবার আলোচনায় আসে ছাত্রলীগ। মাদক ব্যবসা, টেন্ডার-বাণিজ্য, পুলিশকে মারধরসহ একের পর এক নানা অভিযোগ উঠেছে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্দয়, নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যাকা-ের ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৯

১০/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: