১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

মঞ্চে স্বাধীনতা

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯
  • মলয় বিকাশ দেবনাথ

অনেকটা সময় পার হলেও আজ আমরা যে জায়গায় এসে পৌঁছেছি তাতে মনে হচ্ছে, যে চেতনাকে সামনে রেখে স্বাধীনতা এসেছিল সেই চেতনার বাস্তব রূপ আজ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক বাস্তবতা নিয়েই তৈরি হয় সাহিত্য, নাটক, কবিতা, গান, সিনেমা, চিত্রকলা তথা শিল্পের সমস্ত কিছু। আজ বাস্তবতা এই যে, নতুন প্রজন্ম দেশমাতৃকার প্রেমে আপ্লুত। রাস্তার শৃঙ্খলা আনয়নে কোমলমতি বাচ্চাদের পদক্ষেপ সে প্রমাণ বহন করে। দেশবিরোধী গোষ্ঠী সমাজে নানা সময়ে যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে আসছিল এতদিন পরে হলেও জনগণ তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের ইতিবাচক ও উন্নয়নমুখী পদক্ষেপ আর সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার মধ্য দিয়ে জনমনে বাঙালী চেতনা ফিরে এসেছে। তাইতো তৈরি হচ্ছে শ্রাবণ ট্র্যাজেডির মতো মঞ্চায়ন, মঞ্চায়িত হচ্ছে সৈয়দ জামিল আহমেদের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার’ মতো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটক। শিল্পকলা একাডেমি আজ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে দেশব্যাপী উৎসব হচ্ছে। মানুষ সন্ধান পাচ্ছে তার শেকড়ের। লিয়াকত আলী লাকীর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রত্ননাটক মহাস্থান। এই প্রথম এত বড় পরিসরে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে সৃষ্টি হয়েছে গবেষণালব্ধ প্রত্ননাটক মহাস্থান। এই পরিবেশ যদি বজায় থাকে তবেই আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাঙালী জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম দিয়ে স্বপ্নের সোনার বাংলা বিশ্বদরবারে স্থান পাবে।

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা। বাঙালী জাতি পেল একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখ-, পেল সাম্প্রদায়িকতামুক্ত প্রেক্ষাপট, স্বাধীন শিল্পচর্চার অনুকূল পরিবেশ। এর নেপথ্যে নাটক ও নাট্যকর্মীদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নাট্যকর্মীরা জনগণকে পথনাটকের মাধ্যমে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেছিলেন। এ ছাড়া শরণার্থীদের জন্য তহবিল গঠনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ক্যাম্পে নাটক মঞ্চায়ন হতো। পথে পথে ট্রাকে করে নাট্যকর্মীরা নাটক করে এ দেশের মানুষকে মুক্তির চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন কলকাতার শরণার্থী শিবিরে মামুনুর রশীদ ‘পশ্চিমের সিঁড়ি’ নাটকটি করেছিলেন। তবে উল্লেখ্য, মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকে স্বাধীনতা আন্দোলনের কাঠামো পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৫৩ সালে বন্দী অবস্থায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দীদের সহযোগে সে নাটক মঞ্চস্থ হয়। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যকর্মীরা কাজ শুরু করেন মঞ্চ নিয়ে। নিয়মিত মঞ্চায়িত হতে থাকে নাটক, নান্দনিকতায় বিকশিত হতে থাকে নাট্যজগত। যুক্ত হতে লাগল তরুণ ছাত্র সমাজ। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধিকার আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় শুরু হলো নাট্যরচনা, মঞ্চে ফুটে উঠল সামাজিক প্রতিচ্ছবি। নাট্যকর্মীদের দায়বদ্ধতাও বাড়ল, শুরু হলো দর্শনীর বিনিময়ে মঞ্চায়ন, গড়ে উঠল নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়, আরণ্যক নাট্যদল, থিয়েটার, নাট্যচক্র, ঢাকা থিয়েটার বহুবচনসহ ঢাকাকেন্দ্রিক কিছু নাট্যদল। এছাড়া চট্টগ্রামের থিয়েটার ‘৭৩’ অরিন্দম নান্দিকার, গণায়ন, অঙ্গন, রাজশাহীর সাংস্কৃতিক সংঘ, নাটোরের সাকাম, খুলনা থিয়েটার ফরিদপুরের সুনিয়ম, বরিশালের খেয়ালি বরিশাল নাটক, কুমিল্লার জনান্তিক, ময়মনসিংহের বহুরূপী, কুষ্টিয়ার চারণিক, ইত্যাদি। এই দলগুলো স্বাধীনতা উত্তর মঞ্চনাটককে ত্বরান্বিত করে।

১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা উত্তর মঞ্চনাটক চর্চা আবার নতুন পথ দেখতে শুরু করে। সেই প্রতিযোগিতার একটি বড় শর্ত ছিল নাটকের পা-ুলিপি হতে হবে দলের অভ্যন্তরীণ নাট্যকারের লেখা। তৈরি হয়ে যায় বেশ কিছু নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক ও অভিনেতা। যেমন সেলিম আল দীন, আল মনসুর, হাবিবুল হাসান, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, ম হামিদ, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ নাট্যজন। অন্যদিকে স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই যারা নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নাট্যচর্চাকে নাট্যধারায় অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন, মমতাজউদ্দিন আহমেদ, মামুনুর রশীদ, আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমদার। এই গুণী নাট্যব্যক্তিত্বদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় মঞ্চনাটকের জৌলুস ফিরে আসতে থাকে। নাটকের নির্মাণ, অভিনয় প্রয়োগে প্রতিনিয়ত নতুনত্বের ছাপ দেখা দেয়। সামাজিক, বৈপ্লবিক নাটকের পাশাপাশি নাটকে স্থান পায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাস্তবতা, রোমান্টিকতা, কমেডি। তবে লক্ষণীয় যে, যুদ্ধপরবর্তী নাট্যজগতের রথী, মহারথীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাই তৎকালীন নাটকগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পাকসেনাদের এক দোসরকে কেন্দ্র করে সৈয়দ শামছুল হক রচনা করেন ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। এটিকে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম কাব্য নাটকও বলা হয়ে থাকে। এছাড়া ‘এখানে এখন’ নাটকেও তিনি ফুটিয়ে তোলেন মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়টাকে। ‘জয়জয়ন্তী’ নাটকে মামুনুর রশীদ তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রাম্যজীবন ও শিল্পীদের জীবন সংগ্রাম। ড. এনামুল হক রচনা করলেন সেই সব দিনগুলো।’ এসএম সোলায়মানের এ দেশে এ বেশে নাটকের বিষয়বস্তু ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নও প্রাপ্তি। নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু রচনা করলেন, ‘একাত্তরের পালা’ ও টিটোর স্বাধীনতা। মমতাজউদ্দিন আহমেদের ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ কি চাহো শঙ্খচিল, স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা ও বর্ণচোরা নাটকে উঠে আসে স্বাধীনতার ইতিহাস। সে সময় মঞ্চের পাশাপাশি নাটক পথেও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এসএম সোলায়মান ‘ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাচাল’ পথনাটকে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছিলেন। মান্নান হীরার ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উল্লেখযোগ্য পথনাটক।

স্বাধীনতা উত্তর দশ বছরে মঞ্চ নাটকে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সে সময় স্ব স্ব দলের প্রযোজনার পাশাপাশি নাট্যকর্মীগণ একটি ছাতার নিচে আসার তাগিদ অনুভব করলেন। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার উল্লেখযোগ্য নাট্যদলগুলো আলোচনায় বসে এবং তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন গঠনের পরিকল্পনা হাতে নেয়, যা বাস্তবায়ন হয় ১৯৮১ সালের আগস্ট মাসে। ফেডারেশনের প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে নির্বাহী পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতিম-লীর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রামেন্দু মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। নাট্য আন্দোলন আরও বেগবান হলো, সংযোজিত হলো নাট্যবিষয়ক শিক্ষাগ্রহণকারী পেশাদারি নাট্যকর্মী। (দিল্লীর ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা) এনএসডি থেকে সদ্য বের হওয়া কিছু নাট্যকর্মী তাদের শ্রম এবং শিক্ষাকে প্রয়োগ করতে লাগলেন মঞ্চ প্রযোজনায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রভাবে মঞ্চনাটক নতুন মাত্রা পেল। আশির দশকের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলোর মধ্যে সেলিম আল দীনের কীর্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, চাকা, মামুনুর রশীদের ওরা আছে বলেই, ইবলিশ, এখানে নোঙর, খোলা দুয়ার, গিনিপিগ, আব্দুল্লাহ আল মামুনের সেনাপতি, এখনও ক্রীতদাস, মমতাজউদ্দিনের বিবাহ, কি চাহ শঙ্খচিল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বাংলা নাট্য ইতিহাসের অপর এক মাইলফলক হচ্ছে ‘মুক্ত নাটক’। নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চাকে মধ্যবিত্তের বলয় থেকে বের করে বৃহত্তর শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্ম প্রকাশ করে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরণ্যক নাট্যদলের নেতৃত্বে ১৯৮৪ সালে শুরু হয় মুক্ত নাটক আন্দোলন। বাংলাদেশের মঞ্চনাটক প্রসেনিয়াম আর্চ ভেঙ্গে রাজপথে এসে জায়গা করে নিল, নাট্যচর্চা মঞ্চের পাশাপাশি জনপ্রিয়তা পেতে থাকে শহীদ মিনার, উদ্যান, পার্ক, ময়দানে। বাংলাদেশে পথনাটকের গোরাপত্তন ঘটে ঢাকা থিয়েটারের চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি নাটকটির মাধ্যমে। সেলিম আল দীনের রচনায় ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনায় টিএসসির সড়ক দ্বীপে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। তৎকালীন স্বৈর সরকারের পুলিশ বাহিনী নাটকটির ওপর হামলা চালায়। তবে নব্বইয়ের স্বৈর সরকারের পতন ও গণআন্দোলনে গ্রুপ থিয়েটারের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতি, স্বৈরাচারের কীর্তিকলাপ ও গণতন্ত্রের মুক্তি নিয়ে প্রচুর নাটক মঞ্চস্থ হয়। মমতাজউদ্দিন আহমেদের সাতঘাটের কানাকড়ি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে উৎকৃষ্ট প্রমাণপত্র। ’৯০-এর দশকে ঢাকা থিয়েটার তাদের চিন্তাভাবনাকে একটু ভিন্ন দিকে নিয়ে গিয়েছিল হাজার বছরের বাঙালীর ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করার প্রচেষ্টায়। সেলিম আল দীনের রচনায় ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় যৈবতি কন্যার মন, হাতহদাই বনপাংশুল প্রভৃতি। এর মাধ্যমে নাট্যরীতি বহুমাত্রিকতা লাভ করে। যেমন বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি, পাঁচালি রীতির প্রবর্তন হয়।

গ্রুপ থিয়েটারের প্রযোজনায় এই উপমহাদেশীয় নাটকের পাশাপাশি সংযোজিত হয় পাশ্চাত্যের অনুবাদ নাটক। যেমন সফোক্লিসের ‘রাজা ইডিপাসের’ মতো ধ্রুপদী নাটক থেকে শুরু করে স্যামুয়েল বেকেট, ইউজিন আয়ানেস্কা, বার্টল্ট ব্রেখট, জ্যাঁ পল সার্ত, এলবেয়ার ক্যামু, এডওয়ার্ড এলবি, হেনরিক ইবসেন, শেক্সপিয়ার, হাইনার ম্যুালার, হ্যারল্ড পিন্টার, আর্থার মিলার, মলিয়ের প্রমুখ নাট্যকারের নাটক উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে মলিয়েরের কমেডি বিশেষভাবে দর্শক জনপ্রিয়তা পেয়েছে যেমন- লোকনাট্যদলের কঞ্জুস, কুশীলবের গিট্টু, নাট্যকেন্দ্রের বিচ্ছু অন্যতম। বলতে দ্বিধা নেই যে, মলিয়েরের কমেডি নাটক দিয়ে দর্শক ধরে রাখার একটা প্রচেষ্টা ছিল নাট্যাঙ্গনে। যাহোক, জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বার্টল্ট ব্রেখটের অনুবাদ নাটকগুলো যেমন- নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের গ্যালিলিও, সৎ মানুষের খোঁজে, দেওয়ান গাজীর কিস্সা, নাগরিক নাট্যাঙ্গনের ‘জনতার রঙ্গশালা’ অন্যতম। এপিক থিয়েটারের যে ধারা ব্রেখট সৃষ্টি করে গেছেন তা দর্শকদের নাটকের সঙ্গে যুক্ত রাখার চমৎকার উদাহরণ। বিদেশী নাটকের মধ্যে আরেক অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডি ও কমেডি। ঢাকা থিয়েটারের মার্চেন্ট অব ভেনিস, নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের দর্পণ, থিয়েটারের ম্যাকবেথ। ঢাকার মঞ্চে নিরীক্ষাধর্মী নাটক স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’ সফল মঞ্চায়নও হয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর মঞ্চে অভিনয়ের পাশাপাশি আলোক পরিকল্পনা ও মঞ্চসজ্জা, রূপসজ্জা ও পোশাক পরিকল্পনায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রভাব পড়েছে নাটকের এই শাখাগুলোতে। আলোক পরিকল্পনার আধুনিকায়নে যারা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার তারা হচ্ছেনÑ ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ, কামরুজ্জামান। জামিল আহমেদের আলোক পরিকল্পনায় প্রযোজিত হয়েছে ফণিমনসা, কিত্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, ইনস্পেক্টর জেনারেল, ইডিপাস, গিনিপিগ, অচলায়তন, বিসর্জন, বিষাদ সিন্ধু। ড. জামিল আহমেদ প্রথম বাংলা নাটককে দেশের গ-ি ছেড়ে বিদেশের মাটিতে মঞ্চায়িত করেন। সেলিম আল দীনের রচিত চাকা নাটকটি ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করে ডেনি প্যাট্রেজের সঙ্গে যৌথভাবে নির্দেশনা দেন আমেরিকায় এবং এটি তাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে। এরপর ১৯৯১ সালে ঢাকার মঞ্চে নাটকটির নির্দেশনা দেন। এছাড়া তিনি বিষাদ সিন্ধু নাটকের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যার পা-ুলিপি রচনা করেছিলেন ড. বিপ্লব বালা। নাটকটির স্থিতিকাল ছিল ৬ ঘণ্টা। এছাড়া তার নির্দেশনায় মঞ্চায়িত হয় লোকনাটক কমলা রানীর সাগরদীঘি, বেহুলার ভাসান, সংভংচংয়ের মতো প্রযোজনা, যা দর্শককে আকৃষ্ট করেছিল দারুণভাবে। কিন্তু এ ধরনের কাজের অপ্রতুলতা মঞ্চনাটক থেকে দর্শকবিমুখতা তৈরি হয়েছে। ২০১০ সালে তিনি পুনরায় এনএসডিতে নির্দেশনা দেন ম্যাকবেথ নাটক এবং ২০১২ সালে কলকাতায় শ্যামার উড়াল। তার রচনায় রয়েছে প্রথম গ্রন্থ ‘হাজার বছর বাংলাদেশের নাটক ও নাট্যকলা’, ৭০টি লোকনাট্যরীতি নিয়ে গ্রন্থ অচিন পাখি এবং উন্নয়ন নাট্য নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী গ্রন্থ তৃতীয় বিশ্বের বিকল্প নাট্যধারা : উন্নয়ন নাট্য : তত্ত্ব ও প্রয়োগ। নিরীক্ষাধর্মী নাটক নিয়ে কিছু কাজ হচ্ছে; কিন্তু অনিয়মিত মঞ্চায়নের ফলে এগুলোর সম্প্রসারণ বা প্রচার হচ্ছে না। ড. ইস্রাফিল শাহীন ম্যাকবেথ নাটকটিতে প্রচলিত প্রসেনিয়াম রীতি ভেঙ্গে পরীক্ষণমূলকভাবে একটি সফল প্রযোজনা করেছিলেন। গ্রুপ থিয়েটারের বদৌলতে নাট্যচর্চা এ ভূখ-ে ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে। এখন ছোট-বড় মিলে দুই শতাধিক নাট্যদল রয়েছে, প্রযোজনাও হচ্ছে নিয়মিত। মঞ্চের অপ্রতুলতা যদিও এর অন্তরায়, আরও মঞ্চের প্রয়োজন। এলাকাভিত্তিক নাট্যমঞ্চ এখন যুগের চাহিদা। তবে পেশাদারিত্বের অভাব এখনও মঞ্চনাটকে পরিলক্ষিত হয়। মঞ্চ নাটকে পেশাদারিত্ব এনে দিতে না পারলে এ শিল্পের ধারাবাহিকতায় যথেষ্ট টান পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পেশাদার নাট্যদল গঠনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল বাংলা থিয়েটার (১৯৯১), থিয়েটার আর্ট ১৯৯২ এবং সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) ১৯৯৪। সিএটি ছাড়া বাকি দুটি দল ব্যর্থ হয়েছে। কামালউদ্দিন নিলুর উদ্যোগে বিদেশী কিছু পেশাদারি নাট্যকর্মীর সহযোগিতায় ঢাকার মঞ্চে নাট্যচর্চা শুরু করেন।

এখন দেশের গ-ি ছাড়িয়ে বাংলা নাটক ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের নাটকও প্রযোজিত হচ্ছে এ বাংলায়। এপারের সঙ্গে ওপারের তৈরি হয়েছে সেতুবন্ধন। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই কমনওয়েলথ গেমসের উদ্বোধনী সন্ধ্যায় স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে মঞ্চস্থ হয়েছে থিয়েট্রেক্সের প্রযোজনায় শাহমান মৈশানের রচিত ও সুদীপ চক্রবর্তী নির্দেশিত নাটক দক্ষিণা সুন্দরী। দেশের মঞ্চে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর উদ্যোগে দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও যুবকদের নিয়ে তার পিপলস থিয়েটার একটি যুগান্তকারী প্রয়াস। পরিশেষে বলা যায় আশাহত হওয়ার কিছু নেই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাট্যকলা বিভাগে ওনার্স, মাস্টার্স পড়ানো হচ্ছে। তাই মেধার বিকাশ অবিসম্ভাবী। এছাড়া তরুণ নাট্য নির্মাতা যেমন- আজাদ আবুল কালাম, শুভাশীষ সিনহা, সুদীপ চক্রবর্তী, আব্দুল হালিম স¤্রাট, আহমেদুল কবির ইয়ং, তিতাস জিয়া, রুহুল আমিন, রিয়াজউদ্দিন মাহমুদরা তরুণ নাট্যকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পূর্বসূরিদের দিকনির্দেশনায় মঞ্চনাটককে আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সময় এখন আমাদের। সঠিক ইতিহাস ও বাস্তবতার মিথস্ক্রিয়ায় শিল্প সৃষ্টির নিরন্তর চেষ্টা সফল হয়েছে। শিল্পীরা আজ স্বাধীন। তাই নাটক ছিল, নাটক আছে, নাটক থাকবে এবং ধরে রাখবে শিল্পমান।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯

২৬/০৩/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

স্বাধীনতা দিবস বিশেষ আয়োজন ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ:
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধে ইউজিসির নির্দেশ || খালেদা জিয়ার জামিন বিষয়ে আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী || চট্টগ্রাম-৮ আসনে জিয়া উদ্দিন বাবলুকে জাপার প্রার্থী ঘোষণা || দক্ষ প্রশাসক ও কুটনীতিকের নাম শেখ হাসিনা ॥ সেতুমন্ত্রী || মিয়ানমারের সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার করা হবে ॥ সু চি || সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ৩ মোটরসাইকেলে আগুন || কুষ্ঠরোগীদের দেখে দূর-দূর ছেই ছেই করবেন না ॥ প্রধানমন্ত্রী || আমি নিজেও সু চির অধঃপতনে দুঃখ পেয়েছি ॥ পররাষ্ট্রমন্ত্রী || মানবতাবিরোধী অপরাধে টিপু রাজাকারের ফাঁসি || সিসি ক্যামেরার আওতায় আপিল বিভাগের এজলাসের বিচার কার্য শুরু ||