২১ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বাণিজ্যমেলা-২০১৮ ॥ নারী উদ্যোক্তাদের আয়োজন ছিল আকর্ষনীয়

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা-২০১৮। প্রতিবারের মতো এবারও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের চত্বরে মেলা উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অংশ নেয় সারা বাংলাদেশ থেকে আসা সফল ব্যবসায়ী, অতিপরিচিত ব্র্যান্ড কোম্পানি এবং বাহারি পণ্যের বিভিন্ন উদ্যোগীরা। প্রথম থেকেই মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত এই মেলা প্রাঙ্গণ উৎসব আর আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে অসংখ্য দর্শনার্থী এবং আয়োজকদের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞের অভূতপূর্ব এক মিলনমেলায়। প্রতিবছর মেলার আয়োজন করা হলেও নির্দিষ্ট মেলার গুরুত্ব ভিন্ন আদলে দর্শকদের সামনে দৃশ্যমান হয়। অনেক ক্রেতা আর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী সারা বছরের এই বিশেষ মাসটির অপেক্ষায় দিন গোনে। বাণিজ্য মেলার অন্য রকম বৈশিষ্ট্য যেমন উদ্বুদ্ধ করে উদ্যোক্তাদের একইভাবে ক্রেতাদের জন্যও নিয়ে আসে এক আলাদা মাত্রার প্রত্যাশা এবং কাক্সিক্ষত সামগ্রী পাওয়ার বিপুল আগ্রহ আর উদ্দীপনা। মেলাজুড়ে ছিল প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোর আবশ্যকীয় পণ্য সম্ভার। যেখানে ফ্রিজ, টিভি থেকে শুরু করে পছন্দনীয় পোশাক, অলঙ্কার, প্রসাধন সামগ্রী ছাড়াও আছে হাঁড়ি, পাতিল, থালা, প্লেট, কাপ, চামচ এমনকি খাদ্যদ্রব্যেরও কোন কমতি ছিল না। জমজমাট ব্যবসা বাণিজ্য বলতে যা বোঝায়। যেখানে ক্রেতা সাধারণে ভূমিকা থাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং অত্যাবশ্যক।

এসব উদ্যোক্তা এবং ক্রেতার উপচে ভিড়ের একটি বিরাট অংশ জুড়ে আছে নারীরা। উন্নয়নের জোয়ারে নারীরা আজ সীমাবদ্ধ পারিবারিক আলয় ছেড়ে বৃহত্তর সামাজিক আঙ্গিনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত থেকে শক্ততর করেছে। এক সময় মেয়েরা ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা সামাজিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে পেশাজীবী হিসেবে নিজের ভাবতেও পারত না। শিক্ষিত নারীরা শিক্ষকতাকেই সর্বোত্তম পেশা হিসেবে বিবেচনায় এনে নিজেদের বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়েও সম্পৃক্ত করেছে। কিন্তু যুগের দাবি আর সময়ের দুর্বার গতি নারীদের সীমাবদ্ধ চেতনা থেকে মুক্তি দিয়ে আরও বৃহৎ আকারে তাদের ভাবাতে শুরু করেছে। সেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেও নারীদের অনুপ্রবেশ অবারিত হয়েছে। সময়ের নিরন্তর মিছিল যেমন একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতা তার চেয়েও বেশি উন্নয়নের সমস্ত সূচকে নিরবচ্ছিন্ন অবদান রাখার অদম্য ইচ্ছা থেকে নারীরা আজ সমস্ত বন্ধন জাল ছিন্ন করে বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিধিকে তাদের অনন্য ভূমিকায় অনবদ্য করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়ও এর কোন অন্যথা হয়নি কখনও। নারীরা তাদের নিজস্ব অর্থায়নেই শুধু নয় হরেক রকম হস্তশিল্পের কারুকার্যে বাহারি পণ্যের সামগ্রী নিয়ে দর্শনার্থী ও ক্রেতার সামনে শৈল্পিক আর নান্দনিক আবহে উপস্থাপন করে। এমনই কয়েক নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় এই বাণিজ্য মেলায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং আর্থিক লাভ-লোকসানের যথার্থ বিষয়গুলো। ব্যবসা-বাণিজ্য মানেই আর্থিক সফলতা। শুধু তাই নয়, চাকরি থেকে আরও বেশি মাত্রার অর্থ উপার্জন। যেখানে ঝুঁকি এবং আশঙ্কা প্রতি মুহূর্তে তাড়িত করলেও কোন এক সময় তারা নিজেকে সফলভাবে দাঁড় করাতে পারে।

ক্ষুদে জুয়েলারি উদ্যোক্তা লাবণ্য হেনা। পুরো নাম সাবিহা সুলতানা লাবণী। স্নাতক পাস করেও চাকরির কথা না ভেবে সরাসরি নিজেকে যুক্ত করলেন চ্যালেঞ্জিং পেশা ব্যবসায়ে। সফলও হলেন। বাণিজ্য মেলায় তার স্টলটি সাজানো মেয়েদের পছন্দের হরেক রকম অলঙ্কার দিয়ে। বসুন্ধরায় কাপড়ের শোরুমও আছে তার। রীতিমতো উদ্যোগী নারী। স্বামী থাকেন ফ্রান্সে ব্যবসার কাজকর্ম নিয়ে। একমাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। ব্যবসাকে দাঁড় করাতে নিজের সঞ্চয়ের কিছু সম্বল নিয়ে পুঁজি হিসেবে খাটাতে হয়। আড়াই লাখ টাকা। ২০০৬ সাল থেকে শুরু করা তার ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। দ্বিগুণ পুঁজি বিনিয়োগ করে এখন তার ব্যবসায়িক সাফল্য ক্রমশ বাড়ার দিকে। তার তৈরি পোশাক এবং অলঙ্কারের দোকানে এখন পুঁজি প্রায়ই ৫ লাখ টাকা। কারও কোন আর্থিক সহায়তা নিতে হয়নি এখনও অবধি। তিনি মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছেন। এখন শুধু সামনের দিকে তাকানো। বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ অন্য এক ধরনের অনুভূতি আর আমেজ জড়ানো থাকে। হরেক রকম দর্শনার্থী এবং ক্রেতার মহাসম্মিলনে পুরো পরিবেশের যে আনন্দযোগ তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা করা যায় না। বছরে একটি বিশেষ আর্থিক সংযোগের ব্যাপার তো আছেই। যা শুধু বাণিজ্যিক সফলতাই দেয় না ব্যক্তিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকেও অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। কেনা-বেচা তো প্রতিদিনই হয়, কিন্তু বিশেষ কোন আয়োজনে নিজের অংশীদারিত্ব একেবারে অন্য রকম একটি ব্যাপার।

বুটিক হাউসের আর এক কর্মোদ্যোক্তা সেলিনা আলী। নিজের পছন্দমতো অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের প্রায় দশ বছর পর নিজেকে স্বাবলম্বী করার অদম্য ইচ্ছা থেকেই ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়া। সেই ২০০৬ সাল থেকে শুরু করা। প্রায় ১ যুগ পার করে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। ‘সেলিনা বুটিকস’ নামে বেইলি রোডের অন্তরা ভবনে তার কাপড়ের শোরুম আছে। সবই মেয়েদের থ্রি পিস। হস্তশিল্পের বাহারি কারুকার্যে এসব কাপড় সাজানো গোছানো হয়। বাংলাদেশের রাজশাহী, যশোর, জামালপুর বিভিন্ন জেলা থেকে এসব হাতের কাজের সূক্ষ্ম নান্দনিক শিল্প থ্রি পিসে যেভাবে অলঙ্কৃত করা হয় তা যেমন দর্শনীয় একইভাবে বিচিত্রতার সম্ভারে পরিপূর্ণও বটে। মাত্র ১ লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও তাতে আজ ৫০ লাখের মতো বিনিয়োগ হচ্ছে। মোটামুটি সফল এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এই সেলিনা আলী। দুই কন্যাসন্তানের জননী। বড় মেয়ে ভিকারুনিসা স্কুল এ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি পাস করে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছে। ছোট মেয়েও একই স্কুলের ছাত্রী। শুধু সফল ব্যবসায়ীই নন একজন সার্থক মাও বটে। বাণিজ্য মেলায় নিজের বুটিক হাউসকে উপস্থাপন করতে পেরে যে আনন্দ-অনুভূতি অর্জন করা যায় তা আর কিছুতে সম্ভব হয় না। প্রতিদিনের বিক্রি আর উৎসব আয়োজনের এই বিশেষ মেলায় সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া সত্যিই জীবনের অন্যতম এক মহাযোগ। প্রতিবারই এ ধরনের মেলায় অংশ নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। এই কৃতী ব্যবসায়ী। শুধু তাই নয় ঢাকা শহরের অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মেলায়ও তার বুটিক হাউসকে তিনি দর্শনার্থীর সামনে হাজির করেন। এভাবে আগামীর দিনগুলোকে তিনি সম্ভাবনাময় করে তুলতে চান।

প্রসাধন সামগ্রীর পশরা সাজিয়ে বসেছেন আর এক নারী উদ্যোক্তা পান্না শাহমিমি। এইচএসসি পাস করে পছন্দের মানুষের সঙ্গে সংসারের গ্রন্থি বাঁধলেন। এক সময় মনে হলো নিজেকে ও স্বাবলম্বী করা খুবই দরকার। সে তাগিদেই চাকরির দিকে মন না দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার দিকেই নজর দিলেন। মাত্র ৫০ হাজার টাকার পুঁজি খাটিয়ে শুরু করলেন প্রসাধন সামগ্রীর বেচা-কেনা। ‘হুদা বিউটি’ নামে তার এই প্রসাধন বিপণিটি যমুনা ফিউচার পার্কে সাজানো আছে। মেয়েদের হরেক রকম প্রসাধনের সম্ভার নিয়ে গোছানো এই স্টলটি সত্যিই অপরূপ এবং মনোমুগ্ধকর। এখন তার এই ব্যবসায় পুঁজি খাটছে প্রায় ২০ লাখের মতো। ২০০৬ সাল থেকে তৈরি হওয়া এই ‘হুদা বিউটি’ প্রায় ১ যুগ পার হওয়ার গৌরবও অর্জন করে। এখন তিনি মোটামুটি সফল এবং তৃপ্ত। তবে তার এই দোকানটিকে তিনি আরও বাড়াতে চান। একটা সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দিতে ইচ্ছুক আট বছরের একমাত্র কন্যাসন্তানকে। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন এই ক্ষুদে নারী উদ্যোক্তা।

রাবেয়া বশরী যে ব্যবসায়ী হিসেবে নয় বিক্রেতা হিসেবে নিজেকে যুক্ত করলেন বৃহদাকার এই বাণিজ্য মেলা ২০১৮-এর আয়োজনে। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বিবিএ করা রাবেয়া ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন ক্ষুদে কর্মকর্তা। খ-কালীন পেশা হিসেবে বাণিজ্য মেলায় নিজেকে সম্পৃক্ত করা। এই এক মাসের উপার্জিত অর্থে তিনি জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা সামলাতে পারবেন বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। কোরিয়ান কসমেটিক শপে কর্মরত রাবেয়া উচ্ছল, প্রাণবন্ত এক তরুণী। এই এক মাসের পোশাকেও তিনি দারুণভাবে উপভোগ করছেন। অন্য ধরনের আমেজ আর আবেগে আপ্লুত রাবেয়া বাণিজ্য মেলাকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যতম শক্তি বলে মনে করেন।

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

০৯/০২/২০১৮ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: