১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অমৃত কলা, পেঁপে ও আনারসের লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন


অমৃত কলা, পেঁপে ও আনারসের লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন

বশিরুল ইসলাম ॥ সবুজ শ্যামলিমা আর পাখি ডাকা গ্রামীণ পরিবেশে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্ররা রিসার্চ সিস্টেম (সাউরেস) এবং ড. ওয়াজেদ মিয়া কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের মাধ্যমে গবেষণা করে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করে যাচ্ছেন। এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় কর্মদক্ষ পেশাজীবী তৈরি করতে সক্ষম হলেও বর্তমানে গবেষণা ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছিল। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানেরই মেধাবী ছাত্র এ এস এম কামাল উদ্দিন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিলেন অমৃত কলার চাষ। তিনি পেঁপে ও আনারসের লাগসই চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। ড. নূর মোহাম্মদ মিয়া ও ড. ছিদ্দিক আলীসহ অনেক কৃষিবিদ উচ্চ ফলনশীল ধান বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-১০, বিআর-১১, বিআর-১৪, বিআর-১৯, বিআর-২৩ জাত আবিষ্কার করে শুধু নিজ দেশে নয় প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, পশ্চিম আফ্রিকায়ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। কাজী পেয়ারার জনক ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা এ বিশ্ববিদ্যালযেরই ছাত্র । ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা এবং ড. এসএম জামান নামে দুজন কৃষি বিজ্ঞানী বাংলাদেশ সরকারের ‘সায়েন্টিস্ট ইমেরিটাস’ পদে ভূষিত হয়েছিলেন। তাছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কৃষিতে অবদান রাখার জন্য এ প্রতিষ্ঠানের অনেক গ্র্যাজুয়েট স্বাধীনতা পুরস্কার, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার, বিজ্ঞান একাডেমিক স্বর্ণপদক ও শেরেবাংলা পদকসহ বিভিন্ন ধরনের পদক লাভ করেন। আর বর্তমানে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে সাউ সরিষা-১, সাউ সরিষা-২, সাউ সরিষা-৩, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আলুবীজ ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে সফলতা, মধু চাষ, পরিবেশ সংরক্ষণে ছাদ বাগান, পশুর চিকিৎসার, টমাটিলো, রুকোলা, সাদা ভুট্টা, জামারুসান মূলা, বিভিন্ন বিদেশী ফুলের উৎপাদন সফলতা উল্লেখযোগ্য।

১৯৩৮ সালে সাধারণ কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থাপিত এই ইনস্টিটিউটটি ২০০১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার পর ব্রিটিশ শাসিত এ প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তনের মধ্যদিয়ে উচ্চতর কৃষিশিক্ষা এবং কৃষি গবেষণায় নতুন ধারা সূচিত হয়। তাই একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, দেশে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠান পালন করেছে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা। এ দেশের কৃষি উন্নয়নের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে অগ্রণী নেতৃত্বের ভূমিকা রাখেননি এখানকার কৃষিবিদরা।

ফার্মগেট থেকে শেরেবাংলা নগর ২৯৮.৪৮ একরের সুবিশাল জায়গার দখল ছাড়তে ছাড়তে প্রতিষ্ঠানটি এখন মাত্র ৮৭ একরের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুবই অপ্রতুল। তবুও শিক্ষা, গবেষণা ও ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে। দেশের প্রাচীন এ প্রতিষ্ঠানটি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে এবং প্রস্তুত করে চলছে দেশ পরিচালনার ভবিষ্যতের কৃষিবিদদের। এ বিশ্ববিদ্যালয় একদিকে দক্ষ পেশাজীবী, অন্যদিকে গবেষণার মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়নের অবদান রেখে চলছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কৃষিবিদ, প্রাণিবিজ্ঞানী এবং কৃষিবিজ্ঞানী তৈরি করার পাশাপাশি কৃষি গবেষণার যথাযথ প্রচার ও প্রসার করার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান সেমিস্টার পদ্ধতিতে হওয়ার পাশাপাশি সিলেবাস শেষ করে নির্দিষ্ট দিনে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এমনকি এখনকার শিক্ষার মনোরম পরিবেশ রাজনীতি, সন্ত্রাস, হানাহানি থেকে মুক্ত। সেশনজটমুক্ত এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও গবেষণার উন্নতমান দিন দিন আকর্ষণ করছে দেশের প্রতিভাদীপ্ত তরুণ শিক্ষার্থীদের। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা চুক্তি বিনিময়ে ইতোমধ্যে দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। দিন দিন বেড়ে চলছে বিদেশী শিক্ষার্থীর ভর্তি সংখ্যা।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদ, এগ্রিবিজনেস ম্যানেজমেন্ট অনুষদ, এ্যানিম্যাল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ এবং ফিশারিজ ও একোয়াকালচার অনুষদের ৩৫টি বিভাগ রয়েছে। স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি তিনটি কোর্স চালু রয়েছে। তিনটি কোর্সে তিন হাজার পাঁচ শ’ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা পাস করে দেশ-বিদেশে কৃষি উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ আরও বলেন, প্রাচীনতম এ কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও আবাসন সমস্যা বেশ পুরনো। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল নানাভাবে। আর এ সমস্যা দূর করতে বর্তমান সরকার ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য ৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকার যা পরবর্তীতে ১০০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার প্রকল্প পাস করেন। আর ২১ জুলাই ২০১৬ সালে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে ৩শ’ ৫২ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়। এ বিশাল অঙ্কের বরাদ্দের কারণে-ভোগান্তি দূর হবে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যা। ত্বরান্বিত হবে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম। এ উন্নয়ন প্রকল্প বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা যথাসময়েই বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ।

এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ১ এপ্রিল ২০১৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ সাল পর্যন্ত। অনুমোদিত এ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোসমূহের মধ্যে রয়েছে ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে কৃষকরতœ শেখ হাসিনা হলের অবশিষ্ট ৬তলা থেকে ১০তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ২২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা হলের দক্ষিণ ব্লক অবশিষ্ট ৩য় তলা থেকে ১০ম তলা পর্যন্ত নির্মাণ ও উত্তর ব্লক অবশিষ্ট ৬তলা থেকে ১০তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে শেখ কামাল একাডেমিক ভবনের উর্ধমুখী অবশিষ্ট ২য় তলা থেকে ১০তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে প্রশাসনিক ভবনের অবশিষ্ট ৫তলা থেকে ৬ তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ড. ওয়াজেদ মিয়া কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে অবশিষ্ট ৫তলা থেকে ৬তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ভবনের অবশিষ্ট ৪তলা থেকে ৬তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ২৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে টিএসসি কমপ্লেক্স ভবনের অবশিষ্ট ৩তলা থেকে ৬তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে শিক্ষকদের আবাসিক ভবনের অবশিষ্ট ৬তলা থেকে ১০তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ১৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ৩য় এবং ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আবাসিক ভবনের অবশিষ্ট ৫তলা থেকে ১০তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ডরমিটরি ভবনের অবশিষ্ট ৩তলা থেকে ৬তলা পর্যন্ত নির্মাণ, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণ। এ প্রকল্পে অধিকাংশ কাজই ইতোমধ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে।

নতুনভাবে শুরু হচ্ছে ৪২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ছাত্রীদের জন্য ১০০০ আসন বিশিষ্ট ১০তলা ভিত দিয়ে ১০তলা হল ভবন নির্মাণ, ৪২ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ছাত্রদের জন্য ১০০০ আসন বিশিষ্ট ১০তলা ভিত দিয়ে ১০তলা হল ভবন নির্মাণ, ১৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন ৩৯ ইউনিট বিশিষ্ট ১০তলা ভিত দিয়ে ১০তলা ভবন নির্মাণ, ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ভেটেরিনারি ক্লিনিক নির্মাণ, ৫ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে পোল্ট্রির শেড নির্মাণ, এছাড়াও গবেষণা প্লটের জন্য ভূমি উন্নয়ন, সেচ ব্যবস্থা, গ্রীন হাউস নির্মাণ, অত্যাধুনিক ২টি গেট নির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পানি, গ্যাসের লাইন স্থাপন, বই-পুস্তক ও জার্নাল সংগ্রহ, উচ্চতর কৃষি গবেষণা এবং মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তাছাড়া উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ভার্চ্যুয়াল ক্লাসরুম উদ্বোধন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উন্নত দেশের পাঠদান সম্পর্কে জানতে পারবেন। উন্নত দেশের শিক্ষকরা এখানে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে পারবেন। মিনি আবহাওয়া অফিসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আবহাওয়া সংক্রান্ত সকল তথ্য-উপাত্ত সহজে সংগ্রহ এবং গবেষণা করতে পারবে। আবহাওয়া অফিসের তাপমান যন্ত্র, ব্যারোমিটার, সানশাইন রেকর্ডার, থার্মোগ্রাফ ও ব্যারোগ্রাফ, হেয়ার হাইগ্রোগ্রাফ ইভাপোরেশন প্যান, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ঘড়িসহ অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এই মিনি আবহাওয়া অফিসে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত সেমিনার রুম উদ্বোধন করা হয়েছে। এতে রয়েছে মাল্টিমিডিয়া, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, ডিজিটাল স্ক্রীন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক সুবিধা। আর্কাইভ উদ্বোধন করা হয়েছে কৃষিবিষয়ক ডিজিটাল। এর ফলে শিক্ষার্থীরা, গবেষকগণ সহজেই পূর্বে সম্পাদিত সকল কৃষি গবেষণার তথ্য ও ফল জানতে পারবেন এই আর্কাইভের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার ফল জানতে পারবেন বিদেশী ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকবৃন্দ।

প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। তাই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সরকার আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাণিজ্য মেলার মাঠটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত করে দেয়ার জন্য ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী তথা এলামনাইদের দাবি। যেহেতু এ বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত-তাই কৃষির বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভব এর জন্য প্রয়োজন শুধু সরকারের সদিচ্ছার।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: