২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সহযোগিতায় নতুন দিগন্ত


(১৯ এপ্রিলের পর)

যৌথ পানি সম্পদ কাজে লাগান

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সম্পর্ক বন্ধুপ্রতিম, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এটাও সত্য যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক অটুট থাকা জরুরী, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও দুই দেশের পারস্পরিক অগ্রগতির স্বার্থেই।

সঙ্গত কারণেই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রটির সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যুক্তিযুক্ত ইস্যুগুলোর সমাধান আবশ্যক বলেই আমরা মনে করি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিশ্রুত তিস্তা চুক্তি হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক রূপান্তরের আরও একটি পর্যায় অতিক্রম করবে। আমরা মনে করি, এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, দুই দেশের সম্পর্ক আরও মজবুত করতে যৌথ পানি সম্পদকে কাজে লাগানোর বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সব অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে অববাহিকাভিত্তিক একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার মধ্যেই আমাদের যৌথ ভবিষ্যত নিহিত। আমরা চাই, এ বিষয়টিকে সামনে রেখে প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুর সমাধানে দ্রুত আন্তরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।

আরেকটি বিষয় বলা দরকার যে, তিস্তায় পানি নেই দাবি করে তিস্তার বদলে পশ্চিমবঙ্গের ছোট ছোট চারটি নদীর পানি বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগির প্রস্তাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ তা আমলে নেয়নি। আর শুধু বাংলাদেশই নয়, এতে আগ্রহী নয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও। দু’দেশের সম্পর্কের জন্য তিস্তা চুক্তি যে গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তা স্বীকার করেছেন।

এমনকি দু’দেশের বর্তমান সরকারের মেয়াদেই তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো যাবে বলেও তিনি বিশ্বাস করেন। আমরা বলতে চাই, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। আমরা মনে করি, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির মধ্য দিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক আরও উচ্চতায় পৌঁছবে। উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের ২৫তম বৈঠকে দু’দেশ তিস্তার পানি বণ্টনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল। ১৯৮৫ সালে ওই চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়। এর পর নানা সময়েই চুক্তি হয়ে গেল এমন আশার সঞ্চার হলেও বার বার তা হতাশায় পরিণত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত যে কোন ধরনের ক্ষতি কমাতে হলে স্বচ্ছতা ও সমতার ভিত্তিতে তিস্তার পানি চুক্তি হওয়া জরুরী। আমরা বলতে চাই, তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুটির সমাধান করতে বাংলাদেশকে যথাযথ পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে।

সহযোগিতার নতুন দিগন্ত

ভারতের ইংরেজী দৈনিক ঞযব ঐরহফঁ-এর সাম্প্রতিক প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করে- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে তিস্তা সমস্যার দ্রুত সমাধানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আশ্বাস জটিল বিষয়কে সহজ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে মোদির বিবৃতি সর্বোতভাবে সাধুবাদযোগ্য। তার বক্তৃতায় একই সঙ্গে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের কাজের বিষয়ই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যে কাজের খসড়া শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। এটা ঠিক, এই অচলাবস্থা স্পষ্টতই রাজনৈতিক এবং এর সমাধানও রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই হতে পারে- আমরা চাই তা খুব দ্রুতই হোক।

ড. মনমোহন সিং ও শেখ হাসিনা রাজনৈতিক সম্পর্ককে তাৎপর্যপূর্ণভাবে দু’দেশের বন্ধনে রূপান্তরিত করছেন এবং তা আরও সম্প্রসারিত করেছেন। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় পারস্পরিক সহযোগিতা এমনকি স্থল চুক্তি ও পানি বণ্টন চুক্তির সূচনাও তারা করেছেন। এখন সে সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার কৃতিত্ব অবশ্য নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার। যার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র; যেমন- বিদ্যুত সহযোগিতা, কানেক্টিভিটি, ২২টি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরসহ বেসরকারী আরও ১৪টি খাতে বিনিয়োগ ইত্যাদি হয়েছে। প্রতিরক্ষায় সমঝোতা স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় হলো। বিশেষ করে সামরিক প্রশিক্ষণ ও উচ্চ পর্যায়ের প্রতিরক্ষা সফর বাড়বে।

বর্তমানে কানেক্টিভিটি আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেখানে চীনের উদ্যোগ হলো ‘বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ।’ বাংলাদেশ পুরনো রেললাইন সংস্থার, ব্রিজ নির্মাণ, বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ, বন্দর ও সড়ক নির্মাণে ভারত আর্থিক যোগান দিতে এগিয়ে এসেছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথ পুনরুজ্জীবিত করার কাজও চলছে। একই সঙ্গে চলছে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে কানেক্টিভিটির কাজ। এসব পদক্ষেপ কেবল বাংলাদেশের সঙ্গেই বন্ধন দৃঢ় করবে না, একই সঙ্গে এর মাধ্যমে ভারতও নিজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো এর মাধ্যমে উপকৃত হবে।

ভারত সফর অত্যন্ত সফল

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর সবদিক বিবেচনায় অত্যন্ত সফল হয়েছে। এর ফলে বন্ধুপ্রতিম দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভেতরকার সুসম্পর্ক আরও দৃঢ়তা পেল। ভারতের রাষ্ট্রপতি স্বয়ং বলেছেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরে সম্পর্কের উন্নতির প্রতিফলন আছে। সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসাও করেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, শেখ হাসিনার ভারত সফরের ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন ইতিবাচক মাত্রা অর্জন করেছে। তবে তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সুস্পষ্ট সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসলে দেশের মানুষ আরও সন্তুষ্ট হতে পারত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে ভারতের নিজস্ব প্রটোকল ভেঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিমানবন্দরে আসা, অতিথিকে রাষ্ট্রপতি ভবনে আতিথেয়তার বিশেষ সম্মান দেয়া, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধে জীবনদানকারী ভারতীয় সেনাদের সম্মান জানানোসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় যথেষ্ট বন্ধুতা ও আবেগ পরিলক্ষিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, গণমাধ্যম প্রভৃতি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে সেগুলো ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ ও ভারত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুটি দেশ একই সঙ্গে সার্ক, বিমসটেক, আইওয়া এবং কমনওয়েলথের সাধারণ সদস্য। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলা ভাষা ব্যবহার হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দু’দেশের মধ্যে শক্তিশালী জোটের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের এক কোটি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দান ও স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনমলে ১৯৭২ সালে ১৯ মার্চ ২৫ বছরমেয়াদী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি, ১৯৭৪ সালের ১৬ মে মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক উদারীকরণের সূত্রপাতের সঙ্গে তা বৃহত্তর প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যের উদ্ভব ঘটায়।

বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই সন্ত্রাসবাদবিরোধী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তারা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা হয়। বন্ধুদেশ হিসেবে ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে সক্ষম হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লীতে হায়দ্রাবাদ হাউসে দেশ দুটির মধ্যে ৩০ বছরমেয়াদী গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্ককে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার রোল মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে। ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় প্রতিশ্রুত ১১টি উন্নয়ন সহযোগী উদ্যোগের অধিকাংশই এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে মত দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। (সমাপ্ত)

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক