২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি


(গতকালের পর)

এই নাটিকার শেষ দৃশ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়। ৭ জুন ’৬৬ তার মুক্তির দাবিতে আহূত ধর্মঘট চলাকালে তেজগাঁওয়ে শ্রমিক মনু মিঞা পুলিশের গুলিতে মারা যায়। এর পরে গ্রেফতার দেখিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করে ৩৪ জন বাঙালী আমলা-রাজনীতিবিদ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে সরকার একটি মামলা রুজু করে। এই আসামিদের অপরাধ- প্রতিবেশী দেশ ভারতের সহায়তায় তারা পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। এই মামলার ফাঁদে ফেলে শেখ মুজিব ও ছয় দফাকে নিশ্চিহ্ন করার যে স্বপ্ন আইয়ুব-মোনেম দেখেছিল তা বুমেরাং হয়ে যায়। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও মুজিবের মুক্তির দাবিতে জনগণ সোচ্চার হয়, আন্দোলনে রাস্তায় নামে। সেøাগান তোলে- জেলের তালা ভাংবো-শেখ মুজিবকে আনবো। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে এই আন্দোলনের আগুন গনঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আইয়ুব সরকার আন্দোলনের আগুন থেকে আপাতত বাঁচার জন্য ১ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ রাওয়ালপিন্ডিতে সকল রাজনৈতিক দলের একটি গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। নজিরবিহীন হলেও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি সত্ত্বেও মুজিবকে এই বৈঠকে আমন্ত্রণ এবং প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব মুজিব প্রত্যাখ্যান করেন। এমতাবস্থায় আগরতলা মামলা-সত্য কি মিথ্যা-তা প্রমাণের পূর্বেই ২২ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ মুজিব ও তার সকল সহযোগীকে সরকার বিনা শর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ছয় দফা দাবি, আগরতলা মামলা এবং মুজিবের মুক্তির জন্য ঘটে যাওয়া সফল গণঅভ্যুত্থান এই অঞ্চলে তাকে জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে যেন হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছে দেয়। মুক্তি লাভের পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ তারিখে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাকে যে গণসংবর্ধনা দেয়া হয়, সেখানে লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়। এই সভাতেই জাতির পক্ষে ছাত্র নেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেদিন থেকে মুজিব নিজ নাম অপেক্ষা বঙ্গবন্ধু হিসেবে অধিক পরিচিতি লাভ করেন।

১০ মার্চ ’৬৯ বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত শেখ মুজিবুর রহমান পিন্ডির গোলটেবিলে তার ছয় দফার সঙ্গে ছাত্রদের এগারো দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। কিন্তু পূর্বের ন্যয় শাসক গোষ্ঠী তা অগ্রাহ্য করে। আগের যে কোন সময়ের চেয়ে আরও বেশি আত্মবিশ^াসী ও আত্মপ্রত্যয়ী মুজিব ঢাকায় ফেরার পরদিন থেকেই বড় শহরগুলোতে যেখানেই সভা সমাবেশ করেন, সেখানে মানুষের স্রোত দেখে সরকার বিচলিত হয়ে যায়। ২৫ মার্চ তারিখে আইয়ুব খানকে হটিয়ে ইয়াহিয়া খানের আবির্ভাব ঘটে। তিনি সামরিক আইন জারি করেন। ফলে রাজনীতি আবারও অনিশ্চয়তার গহ্বরে নিপতিত হয়। বঙ্গবন্ধু বাঙালীর নাড়ীর স্পন্দন বুঝতে পারেন। তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে, হাজার বছরের ঘুমন্ত জাতি এবার জেগে উঠেছে এবং তারা তার পেছনে আছে। তার প্রতি বাঙালীদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণের জন্য এখন বাঙালীদের সাংবিধানিক ম্যান্ডেট প্রয়োজন। অতঃপর তিনি নতুন সামরিক সরকারের কাছে এক ব্যক্তির এক ভোটের নির্বাচন দাবি করেন।

৫ ডিসেম্বর ’৬৯ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধুর একটি উক্তি ইত্তেফাকের পাতা থেকে হুবহু উদ্ধৃত করছি- “এক সময় এই দেশের বুক হইতে, এমনকি মানচিত্র হইতে বাংলা শব্দটি মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া অন্য কিছুর নামের সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি যে আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ।” ১৯৭০ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি পুনঃনির্বাচিত হন। মার্চে সরকারের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। ৭ জুন ’৭০ মনু মিঞার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে রেসকোর্সে ছয় দফা’কেই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেন। নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে পূর্ব পাকিস্তানের এমন কোন মহকুমা, থানা বাদ যায়নি যেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়ে মুজিব ছয় দফা ও নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেননি। ঐ বয়সে এমন অক্লান্ত পরিশ্রম করার মতো শারীরিক শক্তি কেবলমাত্র নৈতিক মনোবল এবং লক্ষ্য পূরণের সংকল্প ছিল বলেই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। এরপর ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর ’৭০ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদে যথাক্রমে- ১৬২ ও ২৬৪ আসন নিয়ে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেয়ে যায়। নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে ইয়াহিয়া খান বিজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ভাবি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিনন্দন ও ০৩ মার্চ ’৭১ তারিখে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আনন্দের বাতাস বইতে থাকে। এই প্রথম বাঙালীরা দেশ শাসনের অধিকার পেতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা ও সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করে।

বাঙালীরা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে, কিন্তু তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করতে শাসক গোষ্ঠী বদ্ধপরিকর থাকে। জানুয়ারি মাসে পিন্ডি ও লারকানায় ইয়াহিয়া, ভুট্টো এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কম্যান্ডারগণ বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত সকলে একমত হয় যে, আপাতত শেখ মুজিব পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হলেও তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে পূর্বাঞ্চলকে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী করা মাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। তার এই স্বপ্ন কোন মতেই বাস্তবায়িত হতে দেয়া যাবে না। অতএব সিদ্ধান্ত হয় যে, মার্চের শেষ নাগাদ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু এবং এপ্রিলেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। তাদের পরিকল্পনার ভেতর ছিল প্রথমেই শেখ মুজিবকে আটক ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় এবার তাকে ফাঁসিতে ঝোলান। আন্দোলন ও সংগ্রামের সকল উৎসসমূহ একেবারে দমিয়ে দেয়া এবং তা অত্যন্ত বর্বর ভাবে। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী সমাজ বলতে যা বোঝায়, এদের অস্তিত্ব উপয়ে ফেলতে হবে যেন আগামী দুই চার দশকে কেউ মাথা তোলার সাহস না পায়। মুজিবের বাঙালী জাতীয়তাবাদে ইতোমধ্যে উজ্জীবিত এই অঞ্চলের সশস্ত্র বাহিনী, ই.পি.আর ও পুলিশ বাহিনীকেও নিষ্ক্রিয় এবং নিশ্চিহ্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় অর্থাৎ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার পথে এগিয়ে যায়।

বাঙালীদের ক্ষমতা গ্রহণ এবং পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালীদের ধ্বংস করার এই পরস্পর ভিন্নমুখী প্রস্তুতির ভেতরেই ক্যালেন্ডারের পাতা ফেব্রুয়ারি মাসকে পার করে মার্চ মাস এসে হাজির হয়। পহেলা মার্চ থেকে পঁচিশ মার্চ পর্যন্ত সময়টি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল অধ্যায়। পহেলা মার্চ হঠাৎ অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হলে বাঙালীরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তারা পাকিস্তানের জাতির পিতার ছবি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো এবং জাতীয় পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু জনতাকে ধৈর্য্য ধারণ ও শান্ত থেকে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি ২ মার্চ ঢাকায় ও ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল ও ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় উপস্থিত হয়ে পরবর্তী কর্মসূচী নিয়ে আসার আহ্বান জানান। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে নজিরবিহীন হরতাল পালিত হয়। ৪,৫ ও ৬ মার্চ তারিখে মানুষ ৭ মার্চকে সামনে রেখে ঢাকা অভিমুখে এগোতে থাকে।

অবশেষে হাজির হয় ৭ মার্চ। এ যেন সমগ্র বাংলাদেশ চলমান। সমগ্র বাংলাদেশ ছুটছে ঢাকা অভিমুখে। পুরো ঢাকা শহর কাঁপছে মিছিলের পদভারে। সব মিছিলের লক্ষ্যস্থল ঢাকার রেসকোর্স ময়দান। যেখানে লিখিত হতে যাচ্ছে একটি জাতির ভবিষ্যত, একটি ইতিহাস। এরা সবাই সাক্ষী হতে যাচ্ছে সেই ইতিহাসের। বিকেল ৩ টার কিছু পর মঞ্চে উঠে এলেন সুঠাম দেহের অধিকারী, সবচেয়ে আত্মপ্রত্যয়ী, সাহসী, আপাদমস্তক খাঁটি বাঙালী পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। তারুণ্যের সেই সময় থেকে সমুদ্রের সকল ঝড় ঝাপটা, উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে তিনি আজ উপকূলে উপস্থিত। তার ডাকেই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, জকিগঞ্জ- গোয়াইনঘাট থেকে শ্যামনগর, কলাপাড়া অবধি আছড়ে পড়ছে আওয়াজ “শেখ মুজিবের পথ ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন কর।

চলবে...