২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

প্রাচীন বিহার- হলুদ জগদ্দল অগ্রপুরী, ইতিহাস অনুদ্ঘাটিত


প্রাচীন বিহার- হলুদ জগদ্দল অগ্রপুরী, ইতিহাস অনুদ্ঘাটিত

বিশ্বজিৎ মনি ॥ নওগাঁয় ঐতিহাসিক সোমপুর বিহারের পাশাপাশি আরও ৩টি বিহার রয়েছে। অবহেলা আর অযতেœ বিহারগুলো আজ ধ্বংস হতে চলেছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একটি করে ছোট্ট সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েই যেন তাদের দায়িত্ব পালন করেছে! তবে হলুদ বিহারে তেমন কোন সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ওই বিহারগুলো খনন, প্রতœসামগ্রী উদ্ধার বা সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে তাদের এতটুকুও উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়নি দীর্ঘদিনেও। বিগত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর জগদ্দল বিহার খননকাজ শুরু হয়। বেশকিছু প্রতœসামগ্রীও উদ্ধার হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই বিহারের খননকাজ বন্ধ করা হয়। যা আজও বন্ধই রয়ে গেছে। উদ্ধারকৃত অনেক সামগ্রী ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। সম্প্রতি সন্ধান মিলেছে রানীনগরে আরও ৪টি বিহারের। ব্যক্তি উদ্যোগে এখানকার একটিতে খনন কাজ শুরু করে বিহারের নিদর্শন পাওয়ার পর তা খনন বন্ধ রাখা হয়েছে।

হলুদবিহার ॥ বদলগাছী উপজেলার বিলাসবাড়ি ইউনিয়নের দ্বীপগঞ্জ গ্রামে ‘হলুদবিহার’ অবস্থিত। এখানে যে একটি বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব আছে তা শুধু দুটি শব্দ-‘হলুদবিহার ও দ্বীপগঞ্জ’ থেকে উপলব্ধি করা যায়। হলুদবিহার যেমন একটি বিহার বা সংঘারামের অস্তিত্বের ইঙ্গিত বহন করে, তেমনি দ্বীপগঞ্জও একটি দ্বীপের অবস্থানের আভাস দেয়। এই বিহার নওগাঁ জেলার তথা এশিয়ার বৃহত্তম সোমপুর বিহার বা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার থেকে মাত্র ১৫ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। দ্বীপগঞ্জ গ্রামে হাটের পাশে এই উঁচু ঢিবিটি সকলের দৃষ্টি কাড়ে। এই ঢিবির উচ্চতা সমতল ভূমি থেকে প্রায় ২৫ ফুট ও পরিধি প্রায় ১শ’ ফুট। বিহারের পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাঝেমধ্যে মাটি খননকালে আকর্ষণীয় প্রতœনিদর্শন যেমন-পাথর, ধাতব মূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, অলংকৃত ইট পাওয়া যায়। আলোচিত ঢিবি ও মাটির তলা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন দেখে অনেকে অনুমান করত যে, এটি একটি প্রাচীন কীর্তি। বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব বিভাগ অনুসন্ধান ও জরিপ চালিয়ে এটি একটি বৌদ্ধ বিহার বলে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব বিভাগ ১৯৭৬ সালে হলুদবিহারকে সংরক্ষিত মনুমেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেয়।

এই মহাবিহার সংরক্ষিত ঘোষণার আগেই স্থানীয় লোকজন এর অনেক ক্ষতিসাধন করে। বিহার সংলগ্ন দ্বীপগঞ্জ হাট সম্প্রসারিত করে ব্যবসায়ীরা বহু নিদর্শন দোকান নির্মাণ করতে গিয়ে ধ্বংস করেছে। কেউ কেউ বসতবাড়ি তৈরি করতে গিয়ে এই স্থাপনার প্রায় এক-চতুর্থাংশ জবরদখল করেছে। ঢিবি ও অন্যান্য নিদর্শন থেকে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ নিশ্চিত যে, ঢিবির অভ্যন্তরে একটি বৌদ্ধবিহার বা ভজনালয় অবস্থিত।

জগদ্দল বিহার ॥ ধামইরহাট উপজেলার ধামইরহাট-জয়পুরহাট সড়কের উত্তর দিকে অবস্থিত প্রাচীন কীর্তি এই জগদ্দল বিহার। স্থানীয় লোকজন এটাকে ‘বটকৃষ্ণ রায়’ নামে এক জমিদারের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করেন কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। জানা যায়, রাজা রাম পাল গৌড় রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর রামাবতী নগরে রাজধানী স্থাপন করেন। আইন-ই-আকবরীর রচয়িতা আবুল ফজল ওই স্থানকে রমৌতি বলে উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন বাংলার ধর্মমঙ্গল কাব্যগুলোতে রামাবতীর উল্লেখ রয়েছে। রাম পালের পুত্র মদনপালের তাম্র শাসনেও রামাবতী নগরীর উল্লেখ আছে। দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন, এই রামাবতী নগরে রামপাল জগদ্দল মহাবিহারের প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্ত জগদ্দল বিহার দিনাজপুরে অবস্থিত বলে উল্লেখ করেন।

অগ্রপুরী বিহার ॥ এছাড়াও ধামইরহাট উপজেলার আগ্রদ্বিগুণে আরও একটি প্রতœতত্ত্ব স্তূপ রয়েছে। তিব্বতীয় সাহিত্যে এটিকে অগ্রপুরী বিহার বলা হয়েছে। বিহার বলতে বুঝায় বিদ্যালয় ও উপাসনালয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের আমলে নির্মিত এই স্তূপের উচ্চতা ও আয়তন দেখে মনে হয় একদা এটি একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু প্রতœতত্ত্ব বিভাগ উদ্যোগ না নেয়ায় এ বিহারের খননকাজ আজও শুরু হয়নি। ফলে এর ভেতরের প্রতœনিদর্শন ও ইতিহাস অনুদ্ঘাটিতই রয়ে গেছে।