২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বদর নেতার উত্থান ও পতন যেভাবে-


বদর নেতার উত্থান ও পতন যেভাবে-

আরাফাত মুন্না ॥ বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হোক, তা চাননি। এ দেশের স্বাধীনতা যারা চেয়েছেন তাদের ওপর চালিয়েছেন নির্যাতন। স্বাধীনতাকামীদের হত্যায় গড়ে তুলেছিলেন আলবদর নামের কিলিং স্কোয়াড। টানা নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ পাকিস্তানী হায়েনাদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এই স্বাধীন দেশেই আবার স্বাধীনতাবিরোধী এই ব্যক্তি হয়েছেন মন্ত্রী। তার গাড়িতে উড়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। দেশপ্রেমিক জনগণ তা মেনে নিতে পারেনি। অতপর... ফাঁসি। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীরই বর্ণনা এটি।

মইত্যা রাজাকার হিসেবে খ্যাত মৃত্যুদ-প্রাপ্ত এই যুদ্ধাপরাধী মন্ত্রী থাকা অবস্থায় বার বার একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘটনাকে ভিন্নদিকে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়েছেন একাত্তরে নিজের ভূমিকাকে। তবে শেষরক্ষা হলো না। আদালতের কাঠগড়ায় মেটাতে হলো ইতিহাসের দায়।

মইত্যা রাজাকার খ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মন্মথপুর গ্রামে। ১৯৬১ সালে নিজামী তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির) সঙ্গে যুক্ত হন। দ্রুততম সময়ে নিজামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন এবং ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এই যুদ্ধাপরাধী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর সক্রিয় সহযোগী হিসেবে তিনি বাঙালী নিধনে অংশ নেন। মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল গঠিত হয় কুখ্যাত আলবদর বাহিনী।

এই বাহিনী গঠনের দিন গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘আলবদর একটি নাম, একটি বিস্ময়। আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা। যেখানে মুক্তিবাহিনী সেখানেই আলবদর। ভারতীয় চরদের কাছে আলবদর সাক্ষাত আজরাইল।’ এর পরই শুরু হয় নিজামীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা ও গণধর্ষণ।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির গণতদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় নিজামীর হাতে এবং নিজামীর নির্দেশে কিভাবে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্য এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের মর্মস্পর্শী বর্ণনায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৪ মে সাঁথিয়া উপজেলার ডেমরা, রূপসী ও বাউশগারী গ্রামের সাড়ে চার শ’ মানুষকে হত্যা এবং ৩০ থেকে ৪০ জন নারীকে ধর্ষণের ঘটনা, ৮ মে করমজা মন্দিরের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে গ্রামবাসীকে হত্যা, ২৭ নবেম্বর ধুলাউড়ি গ্রামে নারী ও শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা এবং ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় জাতির সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ে নিজামীর নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

স্বাধীনতাযুদ্ধের পর অনেকটা আত্মগোপনে চলে যায় জামায়াতে ইসলামী। সেই সঙ্গে নিজামীও। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর খুনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা পরিচালিত সরকারের আমলে নিজামী আবারও প্রকাশ্যে আসেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত ছিলেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর আমির। ১৯৮৩ সালে দায়িত্ব পান দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের, ১৯৮৮ সালে সেক্রেটারি জেনারেলের। এর মধ্যে ১৯৯১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতার স্বাদ পায় জামায়াত।

২০০০ সালে গোলাম আযম আমিরের পদ থেকে অবসরে গেলে ওই বছর দলটির আমিরের পদে বসেন নিজামী। পাবনা-১ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নিজামী। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর গাড়িতে তুলে দেয়া হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। কিন্তু অঘটন পিছু ছাড়েনি তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে লাঞ্ছিত হতে হয় তাকে।

নিজামী শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের ইউরিয়া সার কারখানার জেটিতে ইতিহাসের বৃহত্তম অস্ত্রের চালান আটক করে স্থানীয় পুলিশ। পরে ওই সরকারের আমলে ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায়। সরকারের পটপরিবর্তনের পর চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার বিচারে সাক্ষ্যপ্রমাণে এ ঘটনার সঙ্গে সাবেক শিল্পমন্ত্রী নিজামীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি আদালত তাকে মৃত্যুদ- প্রদান করে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে নিজামীকে গ্রেফতার করা হয় ২০১০ সালের ২৯ জুন। ট্রাইব্যুনালে সবচেয়ে দীর্ঘসময় চলা এই মামলায় চূড়ান্ত রায় আসে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর। স্বাধীনতাযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যা-গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ- দেয় ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ে বলা হয়, সক্রিয়ভাবে যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন তাকে মন্ত্রী করা হয়েছিল যা ছিল ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ নারীর প্রতি চপেটাঘাত। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল রাখে আপীল বিভাগ। আর ওই রায়ের রিভিউতেও বহাল রাখা হয় মৃত্যুদ-। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হলো কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর অধ্যায়, দায়মুক্ত হলো বাংলাদেশ।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: