মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

মেধাবী হওয়ার পরও বিসিএসে পিছিয়ে পড়ছে মেয়েরা

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫
  • পারিবারিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা

বিভাষ বাড়ৈ ॥ নারী শিক্ষায় দেশের অগ্রগতির সুফল হিসেবে ছেলের তুলনায় মেয়ের সংখ্যা এখন বেশি, প্রায় প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষাতেই। তুলনামূলক পুরুষের তুলনায় ভাল ফলও করছে মেয়েরা। তবে পারিবারিক, সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মেধাবী হওয়ার পরও বিসিএস পরীক্ষায় গিয়ে নারী পিছিয়ে পড়ছে। বিসিএস পরীক্ষায় গত এক দশকের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিয়োগে ১০ শতাংশ কোটা বহাল রাখার পরও উত্তীর্ণদের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই পুরুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেধাবী হওয়ার পরও বিসিএস পরীক্ষায় মেয়েরা ভাল ফল করতে পারছে না। বিয়ের পর পারিবারিক কাজে জড়িয়ে পড়াসহ নানা কারণে মেয়েরা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। অনেকে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না, আবার নিলেও পারছে না পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে।

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সর্বশেষ ১০ বিসিএসের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বশেষ দুই বিসিএস অর্থাৎ ৩৩ ও ৩৪তম বিসিএসে সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী উত্তীর্ণ হয়। তবে সেই হারও ৩৮ শতাংশের কিছু বেশি। সরকারী কর্মকমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এটি আহমেদুল হক বলছিলেন, পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েরা ভাল করলেও বিসিএস পরীক্ষায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন। এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার সময় বিয়েসহ পারিবারিক কাজে মেয়েদের তেমন জড়াতে হয় না। কিন্তু এরপর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সন্তান লালন-পালনসহ পারিবারিক কাজে জড়িয়ে পড়ায় পরীক্ষার আসার সুযোগ হারিয়ে ফেলছে মেয়েরা। পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আগেই মেয়েরা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বিয়ের পরে পরীক্ষায় যারা আসতে পারছে তারাও পরিবার গুছিয়ে রাখার পরে ভালভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছে না। ফলে মেয়েরা মেধাবী হলেও বিসিএস পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে। তবে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য এ পরীক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে বলে বলছিলেন পিএসসির সাবেক এ চেয়ারম্যান। অনেকে বিশেষজ্ঞই বলছেন, যেসব কারণে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে তার মুখোমুখি হতে হয় না ছেলেদের। পরীক্ষার সময় মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি স্বাধীনভাবে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পায় বলে তাদের ফলও ভাল হয়। আবার মৌখিক পরীক্ষার জন্য তদ্বিরসহ নানামুখী প্রভাব বিস্তারেও ছেলেদের ফল অনেকের ভল হয় বলে অভিমত অনেকের। জানা গেছে, সর্বশেষ ৩৪তমসহ বিগত ৩৩, ৩২, ৩১,৩০, ২৯, ২৮, ২৭, ২৬, ২৫ ও ২৪তম বিসিএস পরীক্ষায় নিয়োগের জন্য পিএসসির সুপারিশকৃতদের অধিকাংশই ছিল পুরুষ। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল পুরুষ প্রার্থী। পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধীদলীয় নেতা, কৃষিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতো রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদেই এখন নারী। কিন্তু বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এখনও নিজেদের অবস্থান মেলে ধরতে পারছেন না তারা। এ পরীক্ষায় পিএসসির পক্ষ থেকে ১০ শতাংশ কোটা বহাল রাখার পরও তারা পিছিয়ে পড়ছেন। বর্তমান বিধান অনুযায়ী বিসিএস পরীক্ষায় মেধা কোটা ৪৪ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা ৫, প্রতিবন্ধী কোটা এক শতাংশ কার্যকর রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ একরামূল কবীর বলছিলেন, প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি থেকে শুরু করে সকল পাবলিক পরীক্ষাতেই এখন মেয়েরা তুলনমূলক ভাল করছে। তার পরও বিসিএস পরীক্ষায় তারা পিছিয়ে পড়ছে, এটা একটা ভাবনার বিষয়।

কারণ হিসেবে এ শিক্ষাবিদ বলছিলেন, প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার সময় বিয়েসহ পারিবারিক কাজে মেয়েদের তেমন জড়াতে হয় না। কিন্তু এর পর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সন্তান লালন-পালনসহ পারিবারিক নানা কাজে জড়িয়ে পড়তে হয় তাদের। বিয়ের পরে পরীক্ষায় যে মেয়েরা আসতে পারছে তারাও পরিবার গুছিয়ে রাখার পরে ভালভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছে না। আবার অনেকে পরীক্ষাতেই আসতে পাওে না।

পিএসসি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আগেই মেয়েরা মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকে। পর্যাপ্ত সুযোগ থাকার পরও অনেকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায় না। অথচ নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বিসিএস পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ৩৪তম বিসিএসে যে দুই হাজার ১৫৯ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করা হয় তার ৩৯ শতাংশ হচ্ছে নারী। বাকি ৬১ শতাংশ পুরুষ। ৩৩ তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে বিভিন্ন ক্যাডারে যে আট হাজার ৩৭৮ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয় তার মধ্যে ৬১ দশমিক ৭৮ শতাংশই পুরুষ। নারী ৩৮ দশমিক ২২ শতাংশ। ৩২ তম বিসিএসে নারী ও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগে বিশেষ বিসিএস হওয়ায় সাভাবিকভাকেই নারী ছিল বেশি। ওই বিসিএসে নারী ছিল ৫৫ দশমিক দশ শতাংশ আর পুরুষ ৪৪ দশমিক ৯০ শতাংশ।

৩১ তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ হয় দুই হাজার ৬৯ জন। এর মধ্যে ৭০ দশমিক ৪২ শতাংশ পুরুষ আর ২৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ নারী। ৩০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে বিভিন্ন ক্যাডারে যে দুই হাজার ৩৬৭ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয় তারও প্রায় ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশই পুরুষ, নারী ৩১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই অবস্থা দেখা যায় ২৯তম বিসিএস পরীক্ষাতেও। ওই বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে পুরুষ ছিল ৭১ দশমিক ৫৪ শতাংশ আর নারী ২৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় দুই হাজার ১৯০ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল পিএসসি। এর মধ্যে পুরুষ ছিল ৬৯ দশমিক ৪১ শতাংশ আর নারী ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় তিন হাজার ২৩৯ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে দুই হাজার ৪১৭ ছিল পুরুষ, যা শতকরা ৭৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। ৮২২ নারী নিয়োগের জন্য সুপারিশকৃত হয়েছিলেন, যা মোট নিয়োগের ২৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

একইভাবে ২৬তম বিশেষ বিসিএসে সুপারিশকৃত এক হাজার ৬৩ জনের মধ্যে ৭০৩ ছিল পুরুষ, যা মোট নিয়োগের শতকরা ৬৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে নারী ছিল ৩৬০ জন, শতকরা হিসাবে এই সংখ্যা ৩৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২৫তম বিসিএসে নিয়োগের জন্য পিএসসি দুই হাজার ৭২২ জনকে সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে দুই হাজার ২৯ পুরুষ আর ৬৯৩ নারী। এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে শতকরা হিসেবে ৭৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ পুরুষ ও ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ নারী। এছাড়া ২৪তম বিসিএস পরীক্ষায় নিয়োগের জন্য সুপারিশকৃত পাঁচ হাজার ২২৫ মধ্যে পুরুষ ছিল তিন হাজার ৮০৯ জন। আর নারীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪১৬ জন। পুরুষ ছিল ৭২ দশমিক ৮৯ শতাংশ আর নারী ছিল ২৭ দশমিক এক শতাংশ।

বিসিএসে নারীর এভাবে পিছিয়ে পড়া প্রসঙ্গে পিএসসির এক সদস্য বললেন, ১০ শতাংশ কোটা রাখার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে বিসিএস পরীক্ষায় নারীদের পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী করেছে। তবে এখনও আশানুরূপ ফল হচ্ছে না। নারী-পুরুষ সবাই মেধারভিত্তিতে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এখানে বৈষম্যের কোন সুযোগ নেই। অনগ্রসর হিসেবে সরকার নারীর জন্য ১০ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা চালু রেখেছে। ফলে নারী আগের চেয়ে অনেক এগিয়েছে। গত দুই বিসিএসে বেড়েছে নারীর উত্তীর্ণের হার। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা বাড়বে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন দীর্ঘদিন বিসিএস ক্যাডারদের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি বলছিলেন, আসলে পারিবারিক বাধা, সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষায় এসেই পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। বিসিএসের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। মেধাক্রমের দিকে তাকালে দেখা যাবে মেয়েরা ভাল করছে, কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে মেয়েরা। কারণ, দেখা যায় একটা মেয়ের অনার্স- মাস্টার্সের সময়েই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। কিংবা বিসিএসের আগেই বিয়ে হচ্ছে। ফলে তারা পারিবারিক নানা কাজ ও সামাজিক বাধার মুখে আর নিজের ক্যারিয়ারের দিকে তাকাতে পাওে না। এইচএসসি পরীক্ষা থেকেই আসলে মেয়েরা এভাবে পিছিয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি, এসএসসিতে দেখা যায় মেয়েরা ভাল করছে কিন্তু এইচএসসিতে সেই অবস্থা তেমন নেই। অনার্স , মাস্টার্সে দেখা যায় কম সংখ্যক মেয়ে হয়ত ভাল ফল করছে কিন্তু অধিকাংশ মেয়েই আগের ভাল ফল ধরে রাখতে পারে না। এই সময় থেকেই বিয়ে হয়ে যাওয়াসহ পারিবারিক সীমাবদ্ধতা থাকায় মেয়েরা আগাতে পারে না। বিসিএস পরীক্ষায় এর প্রভাব পরে অনেক বেশি। এ সময় অনেক মেয়ে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষায় অংশই নিতে পাওে না পরিবার, সন্তান লালন-পালন করার কারণে। যারা পরীক্ষায় আসে তারাও সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে না।

বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে এখন সফলতার সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন এমন অনেক নারী কর্মকর্তাই হতাশা প্রকাশ করছেন এই বলে যে, ‘অনেক বিসিএস ক্যাডার পুরুষকে দেখি যারা বাইরে খুব আধুনিক, প্রগতিশীল মনোভাবের। কিন্তু নিজের পরিবারের কথা এলেই বলেন, নারীর উচ্চ শিক্ষা, চাকরির কি প্রয়োজন? নারী থাকবে ঘরে, তারা রান্নাবান্না করবে। ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করবে ইত্যাদি ইত্যাদি।’

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫

১৭/১২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: