১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

‘প্যাঙ্গুইন বুকস’-এর অজানা গল্প


আশি বছর আগের ঘটনা। এ্যালেন, রিচার্ড এবং জন লেন নামের তিন ভাই লন্ডনে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন প্যাঙ্গুইন বুকস নামের একটি প্রকাশনা। টলবট স্কয়ার ফ্ল্যাটের বাথরুমে বসে তারা যেরকম ব্রেইনস্টর্মি তথা মগজ খাটানোর সেশন পরিচালনা করতেন, ঠিক ঐ রকম কিছু একটা করার পরিকল্পনা থেকেই নিয়েছিলেন এই উদ্যোগ। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। আধুনিক সাহিত্যের ভাল বইগুলো বিস্তৃত আকারে প্রকাশ করা এবং তা তুলনামূলকভাবে কম দামে বিক্রি করাÑ এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছিল প্যাঙ্গুইন বুকস।

শুরুর দিকে উলওর্থ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ রাস্তার পাশের দোকানগুলোতে ছয় পেনসে এক একটি বই বিক্রি করত প্যাঙ্গুইন। জর্জ অরওয়েল এই মহতী উদ্যোগের মাঝেই দেখেছিলেন এক ‘ধ্বংসাত্মক’ সম্ভাবনা। তিনি বলেছিলেন, ‘প্যাঙ্গুইনের বইগুলো চমৎকার। বিশেষ করে ছয় পেনস মূল্যে বই বিক্রি এর মূল আকর্ষণ। বিষয়টা এতটাই চমৎকার যে, এতে অন্য প্রকাশকরা একজোট হয়ে এদের বিরুদ্ধে যাবে এবং দমন করার চেষ্টা করবে।’ কিন্তু তেমনটা ঘটেনি। পাঠকের কাছে প্যাঙ্গুইনের বইগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্যাঙ্গুুইনের বই নিয়ে পাঠকের মাঝে বিপুুল উদ্দীপনা, উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়।

যাত্রা শুরুর মাত্র চারদিনের মাথায় বিক্রি হয়ে যায় দেড় লাখ বই। আর প্রথম চার মাসে বিক্রি গিয়ে দাঁড়ায় এক মিলিয়নে। ১৯৪৬ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি এক শ’ মিলিয়নেরও বেশি বই বিক্রি করতে সক্ষম হয়। বিক্রিবাট্টা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, এতে অবশ্যম্ভাবী কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়। প্রথমত, প্যাঙ্গুুইনকে প্রচুর কর্মী নিয়োগ দিতে হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট আস্তানা গাড়তে হয়েছিল। আস্তানাটি ছিল ট্রিনিটি চার্চের সমাধি চত্বরে। জায়গাটি বেছে নেয়া হয়েছিল খরচ বাঁচাতে। সমাধি দেয়ালে কফিনগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হতো, আর বেদির সামনে একটা লোহার গ্রিলের নিচে রাখা হয়েছিল প্যাকেজিং টেবিল যেখানে প্যাঙ্গুইনের কর্মীরা বই বাঁধাইয়ের কাজ করত।

একদিন বিকেলে এক মজার ঘটনা ঘটে। চার্চে বিয়ে পড়াচ্ছিলেন এক পাদ্রী। তিনি কনেকে যেই না জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এই লোকটিকে তোমার আইনগত স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবে? ঠিক তখনই বাঁধাইয়ের কাজে নিয়োজিত একজন শ্রমিকের হাতের আঙ্গুলে হাতুড়ির ঘা লাগে। তার চিৎকারে চমকে ওঠে সবাই। কনে ভড়কে যায়। কিন্তু বর পুরুষোচিত সাহস দেখিয়ে কনেকে আশ্বস্ত করে। এতেই কেল্লাফতে। সে যাই হোক, প্যাঙ্গুইনের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ঘটতে থাকে। সাফল্য উদযাপন করতে লেন ভাইয়েরা তাদের কর্মীদের নিয়ে প্যারিস ভ্রমণের আয়োজন করে। ভ্রমণকারীদের সঙ্গে একটি প্রিন্টারও সঙ্গে নেয়া হয়। সেটাতে সাঁটা হয় প্যাঙ্গুইনের লোগো ও মেডেল সংবলিত পোস্টার। ট্রেনে করে তারা প্যারিস ভ্রমণে গেলে সবার চোখ পড়ে তাদের সেই পোস্টার আর মেডেলের দিকে। একদিন বিকেলে তাদেরই একজন কর্মী প্যারিসের পতিতালয়ে গিয়ে চমকে উঠে। সেখানে মেয়েরা দাঁড়িয়েছিল সারিবদ্ধ হয়ে। খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করছিল তারা। সেখানে হাই হিল পরে সেজেগুজে থাকা একটি মেয়েকে দেখে কর্মীটি ভীষণরকম ভড়কে গিয়েছিল। কারণ মেয়েটির গলায় ঝোলানো ছিল প্যাঙ্গুইনের মেডেল।

১৯৬১ সালের মধ্যে আড়াই শ’ মিলিয়ন বই বিক্রি হয়ে যায়। ঐ বছর প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্তির সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা এর শেয়ার কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সে এক কঠিন অবস্থা। একদিনেই ছাব্বিশ বস্তা আবেদন জমা পড়ে। দেড় শ’ গুণ বেশি বিক্রি হয় প্যাঙ্গুইনের শেয়ার। শেয়ারবাজারে এর অবস্থা কী ছিল তা বোঝা যায় ন্যান্সি মিটফোর্ড নামক একজন নারীর এ্যালেন লেনকে লেখা এক চিঠিতে। তিনি চিঠিতে দুই হাজার শেয়ারের আবেদন জানিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, ‘শেয়ারের যে তীব্র সঙ্কট চলছে এর মধ্যেই দুই হাজার শেয়ার ক্রয়ের আবেদন জানিয়ে চিঠিটা লেখাটা যদি বড়ই দুঃসাহসিক মনে হয় তবে দয়া করে চিঠিটা ছুড়ে ফেলে দিন এবং ভুলে যান।’ শেয়ারবাজারে প্রথম দিনেই শেয়ারের মূল্য পঞ্চাশ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। সে সময় থেকে অদ্যাবধি বিশ্বব্যাপী প্যাঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস গ্রুপ একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে প্যাঙ্গুইনের বই মানুষের জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। প্যাঙ্গুইনের বই যেন নিত্য পণ্য। বিগত কয়েক দশক ধরে প্যাঙ্গুইনকে সামাজিক অগ্রগতি ও সমাজকে আলোকিত করার অন্যতম পাথেয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্যাঙ্গুইনের প্রতিষ্ঠাতাদের কিছু উত্তরাধিকারী অস্ট্রেলিয়ায় আছে। প্যাঙ্গুইনের প্রতিষ্ঠাতা তিন ভাইয়ের একজন রিচার্ড লেন। তার মেয়ে এলিজাবেথের সঙ্গে আমার বছর দুয়েক আগে মেলবোর্নে দেখা হয়। কথায় কথায় জানতে পারলাম, আমার লেখা বইগুলো সে খুব পছন্দ করে। আমার রচিত বই বলতে বিভিন্ন বইয়ের ওপর সমালোচনামূলক লেখা সংবলিত (আমার এক বন্ধু এগুলোকে ‘গোঞ্জো গ্রন্থপুঞ্জি’ বলে ডাকে)। সে যাই হোক, এলিজাবেথ আমাকে অনুরোধ করেছিল প্যাঙ্গুইন নিয়ে লিখতে। আমিও বেশ আগ্রহী হয়ে যাই এত বিখ্যাত একটি প্রকাশনা সম্পর্কে লিখতে।

এজন্য প্রথম দিকে আমরা ক্যাফেতে বসতাম। তারপর তার বাড়িতে আমরা দীর্ঘক্ষণ প্যাঙ্গুইনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতাম। কিভাবে সবচেয়ে ভালভাবে পাঠকদের কাছে প্যাঙ্গুইনের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা যায় এজন্য আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আলোচনায় এত কিছু বের হয়ে আসল যে, আমার বই লেখার পরিকল্পনা বদ্ধমূল হলো। কিন্তু সমস্যা হলো এর ব্যাপৃত পরিধি। প্যাঙ্গুইনের সাহিত্য নিয়ে পরিকল্পনা ও সম্পাদনার ব্যাপ্তি এত বিশাল যে, আমি প্রমাদ গুনলাম। মেলবোর্ন ও ব্রিস্টলে প্যাঙ্গুইনের বিশাল আর্কাইভ আমাকে ফেলে দিয়েছিল যেন অথৈ জলে। মেলবোর্নে লেন পরিবারের আর্কাইভটি বেশ সমৃদ্ধ এবং বর্ধিত। ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটিতে প্যাঙ্গুইনের যে আর্কাইভ আছে তাও অত্যন্ত চমৎকার। প্রতিটি বই, প্রতিটি সিরিজ, এমনকি প্রতিটি সম্পাদনা ও অন্য কিছুর ওপর এর এক একটি ফাইল রয়েছে। মেলবোর্ন আর ব্রিস্টল এই দুই জায়গাতেই অসংখ্য বইপত্র পেলাম, যা পড়ার সৌভাগ্য আমার কখনও হয়নি। লেখকদের জন্য এটা হতে পারে অনেকটা গুপ্তধনের মতো। তবে ঝুঁকিপূর্ণ। কেন ঝুঁকিপূর্ণ বললাম, তার কারণ লেখকরা বইয়ের সমুদ্রে হারিয়ে গেলে নিজের লক্ষ্য থেকেই সরে যেতে পারে। প্যাঙ্গুইনে এত বেশি বইপত্র যে, একে সহজেই এনসাইক্লোপিডিয়া প্যাঙ্গুইনিয়া বলে অ্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে।

প্যাঙ্গুইন নিয়ে বই লেখার পরিকল্পনা যখন বদ্ধমূল হলো তখন দেখা গেল আরেক সমস্যা। প্যাঙ্গুইনের ইতিহাস সংবলিত দলিলপত্রে কর্পোরেট ইতিহাস যতটা না তুলে ধরা হয়েছে তারচেয়ে অনেক কমই তুলে ধরা হয়েছে প্রতিষ্ঠাতাদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে। তবে সবচেয়ে গুরুতর যে সমস্যার মুখোমুখি আমি হয়েছি তা হলো এর ইতিহাস বিকৃতি। প্যাঙ্গুইন নিয়ে যে কথাগুলো প্রচলিত আছে সেগুলোর সঙ্গে দলিলপত্রের অমিল দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। প্যাঙ্গুইনের গল্পকে অর্থাৎ ইতিহাসকে যেন কল্পকাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে এবং তা করেছে এ্যালেন লেন। তিনি দীর্ঘদিন প্যাঙ্গুইনের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি প্যাঙ্গুইনের ইতিহাসকে স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে বিকৃত করেন। নির্লজ্জভাবে মিথ্যা দিয়ে তিনি প্যাঙ্গুইনের ইতিহাসকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, সেই মিথ্যাকে পৌরাণিক অস্ত্রের সঙ্গেই তুলনা করা যায়।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ হলো তখন প্যাঙ্গুইন বুকস লিমিটেড বিশ্বযুদ্ধ সমাপন উপলক্ষে কোন অনুষ্ঠান আয়োজন না করে তাদের এক দশক পূর্তির অনুষ্ঠান আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠানেই এ্যালেন মিথ্যাচারের মধ্য দিয়ে প্যাঙ্গুইনের ইতিহাস বিকৃত করেন। তিনিই এই প্রতিষ্ঠানটি করার মূল কারিগর হিসেবে দাবি করেন। নিজের ইচ্ছা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার জোরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করিয়েছেন এমন মিথ্যা কথা অবলীলায় বলে গেছেন সেদিন। এ্যালেনের সব কথার মধ্যেই আমি মিথ্যা খুঁজে পেয়েছি।

এ্যালেন লেন কিভাবে প্যাঙ্গুইন নামক প্রতিষ্ঠান গড়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন সেই বিখ্যাত গল্পটিও মনে হবে অনেকটা কল্পকাহিনী। তিনি একটি ট্রেনের প্ল্যাটফরমে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রেলওয়ে বইয়ের দোকানে নিম্নমানের বই দেখে দুঃখিত হয়েছিলেন। আর সেই সময় তিনি এমন একটি প্রকাশনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন যেটা উন্নতমানের বই বিক্রি করবে। এ্যালেনের এই গল্পে তিনি যে পাঠকের কথা চিন্তা করেছেন তা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবু তিনি সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য নাইট উপাধি লাভ করেছিলেন। এ্যালেনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো প্রতিষ্ঠানটি গঠনে ভাইদের অবদান অস্বীকার করা। অথচ তাদের যৌথ প্রচেষ্টা না থাকলে প্যাঙ্গুইন সফল হতো না।

প্যাঙ্গুইনের ইতিহাসকে ঘিরে যে মিথ্যার বেসাতি তৈরি হয়েছে সেগুলোই আমি ‘প্যাঙ্গুইন এ্যান্ড লেন ব্রাদার্স : দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব এ পাবলিশিং রেভুলেশন’ বইটিতে তুলে এনেছি। অস্ট্রেলিয়ায় ব্লাক ইঙ্ক নামের একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এই বইটি প্রকাশ করে। আমি লেন পরিবারের সঙ্গে দুই শ’ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়েছি এবং আমরা একত্রে ব্রিস্টল ও মেলবোর্নের আর্কাইভ থেকে হাজার হাজার দলিলপত্র খুঁজে পেয়েছি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রিচার্ড লেনের ডায়েরি। দুই লাখ শব্দের সেই ডায়েরিতেই আছে অনেক অজানা সত্য। লেন পরিবারের স্মৃতিকথা এবং সেইসঙ্গে অপঠিত দলিলপত্রাদি ঘাঁটার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে প্রকৃত সত্য, যে সত্য আমাদের জন্য পীড়াদায়ক। প্যাঙ্গুইনের মতো প্রতিষ্ঠানের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে মিথ্যাচার দিয়ে কলঙ্কিত করা হয়েছে, যা ভীষণ লজ্জার।

গার্ডিয়ান অবলম্বনে