১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অফুরন্ত বিদ্যুত- সবার জন্য ও সব সময়ের জন্য-


নাজনীন আখতার ॥ সবার জন্য এবং সব সময়ের জন্য অফুরন্ত জ্বালানির ব্যবস্থা হচ্ছে! যা পাল্টে দেবে দুনিয়া! আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি অসম্ভব বলে শোনা গেলেও এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা নিকট ভবিষ্যতে ঘটতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে খ্যাতনামা টাইম ম্যাগাজিন। এর চলতি সংখ্যায় এক অখ্যাত কোম্পানি বিশ্বের জন্য অফুরন্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করছে জানিয়ে কাভার স্টোরি প্রকাশ করা হয়েছে। গত শতাব্দীর আবিষ্কৃত সব প্রযুক্তিকে এই নয়া উদ্ভাবন ছাপিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। যে মেশিনে এই অসাধারণ কাজটি সম্ভব হচ্ছে, সেই মেশিনটি দেখতে একদমই সাধারণ। প্রতিবেদক যন্ত্রটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, এটা দেখতে এতই সাধারণ যে, একটি রুমের সমান বিশালকায় মেশিন হবার পরও অনুল্লেখযোগ্য হওয়ায় প্রবেশের পর তা দৃষ্টিগোচরই হয়নি। মেশিনের দঙ্গল। এটাই সেই! শোনার পর আবার কয়েক পা ফিরে আসতে হয়েছিল দেখার জন্য। টাওয়ারের মতো নাইট্রোজেন ব্যবহারের জন্য বড় আধার। মেশিনে বড় বড় কতগুলো পাখা আছে। সেগুলো ঘুরে ঘুরে শক্তি সঞ্চয় করে। লোহার শক্তিশালী চুম্বক আকর্ষণ থাকায়, মেশিনটি যে ভবনে রাখা হয়েছে সেখানে লোহার পরিবর্তে স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে।

মেশিনটি (ফিউশন রিএ্যাক্টর) পারমাণবিক চুল্লিগুলোরই সমন্বিত আদিরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ফুটহিল রেঞ্জ এলাকায় ট্রাই আলফা এনার্জি নামে একটি ছোট কোম্পানি পরীক্ষামূলকভাবে এটি তৈরি করেছে। মেশিনটি সর্ম্পূণভাবে চালু হলে অর্থাৎ কার্যকর হলে বিশ্বে গত শতাব্দীতে আসা সব প্রযুক্তিকে ছাপিয়ে যাবে। আর এটা খুব শীঘ্রই ঘটতে যাচ্ছে। এর জ্বালানি উৎস এতোই সস্তা ও স্বচ্ছ এবং পর্যাপ্ত যে এটা মানব ইতিহাসে অসাধারণ হয়ে দাঁড়াবে। এটা সেকেলে জ্বালানির সমাপ্তি ঘটাবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা করে এই জ্বালানি হয়ে উঠবে বিশ্ব রক্ষার অন্যতম উপাদান।

ফিউশন রিএ্যাক্টর উদ্ভাবন নতুন কিছু না হলেও অন্যান্যের সঙ্গে এর তফাত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, কয়েক ডজন ফিউশন রিএ্যাক্টর তৈরি হয়েছে বা তৈরি হওয়ার পথে। যেগুলোর প্রায় সবই করা হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে বড় উদ্যোক্তা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি দি ইন্টারন্যাশনাল থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিএ্যাক্টর তৈরি হচ্ছে দক্ষিণ ফ্রান্সে বিশাল আকারের আন্তর্জাতিক উদ্যোগে। ২০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২৭ সালে। এই বাস্তবতায় বিনিয়োগ ঝুঁকি নিয়ে ট্রাই আলফা কোম্পানি যাদের নাম পর্যন্ত কেউ কখনও শোনেনি তারা এই রিএ্যাক্টর তৈরি করতে যাচ্ছে। তাদের কোন বড় পুঁজিদাতাও নেই। কয়েক মাস আগে পর্যন্ত তাদের কোন ওয়েবসাইট ছিল না। কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মুখ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা হচ্ছেন পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি ডিগ্রীধারী বাইন্ডারবাওয়ার। তিনি বলেন, ট্রাই আলফা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রাইভেট ফিউশন কোম্পানির অর্থায়ন পেয়েছে। বর্তমানে এটি শত মিলিয়ন-এ দাঁড়িয়েছে। অর্থের অঙ্কে এটি বড় হিসাব। তবে সরকারী পর্যায়ে যেসব ফিউশন রিএ্যাক্টর তৈরি হচ্ছে তার তুলনায় একটি ভগ্নাংশ মাত্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের গলন বা একীভবন বা ফিউশন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- মানুষ এ নিয়ে যত বেশি কথা বলে কাজের ক্ষেত্রে কিন্তু বিশেষ এগুতে পারে না। ফিউশন নিয়ে আরও ৫০ বছর আগেই বলা হতো এটা পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে। ফিউশন জ্বালানি নিয়ে প্রথম চিন্তাভাবনা শুরু হয় ১৯২০ সালে। এরপর ১৯৪০ সালে ফিউশন এনার্জি তৈরির জন্য কাজ শুরু হয়।

এতে জানানো হয়, পারমাণবিক বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশন পরমাণুকে ভাগ করে ফেলে। পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রের এই ঝুঁকি এড়ানো যেত যদি নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ার প্রযুক্তি সহজপ্রাপ্য হতো। বর্তমানে শক্তিকেন্দ্রগুলোতে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করা হয়। এতে অত্যন্ত ভারি কোন পরমাণু ভেঙ্গে গিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একাধিক নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। যেমন ইউরেনিয়াম-২৩৫ কে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণুতে ভাগ করে ফেলে। এটা অনেক বেশি জ্বালানি ক্ষয় করে ফেলে। এর অপূর্ণতাও রয়েছে। ইউরেনিয়াম একটি দুর্লভ পদার্থ এবং এর উৎসও সীমিত। এ কারণে পরমাণবিক কেন্দ্রগুলো একইসঙ্গে ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক। মাইল আইল্যান্ড, চেরোনবিল এবং ফুকুশিমা পরমাণবিক কেন্দ্রে প্রচুর পরিমাণে টক্সিক বর্জ্য হিসাবে বের হতো এবং তার তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়া এই শতাব্দীকে কতটা বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল তা সবারই জানা। কারণ পারমাণবিক বিপর্যয়ের একটি বড় সমস্যা হলো এটি বিপর্যয় ঘটার পরে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে থাকে। আর এই পারমাণবিক ফিশনের ঠিক উল্টোটাই হচ্ছে পারমাণবিক ফিউশন। এতে বিভাজনের পরিবর্তে পরমাণুগুলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলোকে একত্রিত করে একটি বড় অংশে পরিণত করে।

অর্থাৎ দু’টি হালকা নিউক্লিয়াস একত্রে যুক্ত হয়ে একটি ভারি নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। এটি চেইন বিক্রিয়া দেয় না তাই বিস্ফোরণের আশঙ্কা নেই। অপরদিকে এর কাঁচামাল হলো হাইড্রোজেন ও ডিউটেরিয়ামের মতো অত্যন্ত হালকা আইসোটোপ। এই আইসোটোপগুলো নিজেরা তেজস্ক্রিয় বিকিরণও দেয় না তাই দীর্ঘদিন সঞ্চয় করে রাখলেও কোন সমস্যা নেই। উৎপন্ন বর্জ্যরে তেজস্ক্রিয়তা, ফিশনের ফলে উৎপন্ন বর্জ্যরে চেয়ে দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয়। ফলে ঝুঁকিও কম। আর ইউরেনিয়ামের মতো এই জ্বালানির উৎস কখনও নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে ফিশনের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধা থাকলেও নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। কারণ ফিউশন চালু করার জন্য মিলিয়ন ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যায়ের তাপমাত্রা সৃষ্টি করতে হয়। এ ধরনের উচ্চ তাপমাত্রা ধারণ করতে পারে এমন মেশিন তৈরির জন্যই গবেষকরা বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন।

প্রতিবেদনে ট্রাই আলফা মেশিনের কাজের পদ্ধতি তুলে ধরে জানানো হয়, এই ধরনের ফিউশন রিএ্যাক্টরের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো উত্তপ্ত প্লাজমাকে (আয়নিত গ্যাস যেখানে মুক্ত ইলেকট্রন ও ধনাত্মক আয়নের সংখ্যা প্রায় সমান) সংঘবদ্ধ রাখা। কঠিন, তরল ও বায়বীয় পদার্থের এই তিন অবস্থার পর প্লাজমাকে বলা হয় চতুর্থ অবস্থা। বৈদ্যুতিকভাবে প্রশম থাকা সত্ত্বেও প্লাজমা সহজেই বিদ্যুত পরিবহন করে। এদের থাকে অতুচ্চ তাপমাত্রা। ট্রাই আলফা জানিয়েছে, তাদের মেশিনে তারা গত জুন মাসে অতি উচ্চ তাপমাত্রা প্রয়োগ করে ৫ মিলিসেকেন্ড পর্যন্ত প্লাজমাকে সংঘবদ্ধ ও স্থিতু করতে পেরেছে। ট্রাই আলফা বলছে, এটা তুলনামূলক কম সময় হলেও ধীরে ধীরে তারা এই সময়টাকে আরও একটু বাড়ানোর ক্ষেত্রে সফলতা পেতে যাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে বলা যায়, ফিউশন রিএ্যাক্টরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্লাজমা বশে আনা গেছে। এছাড়া আরেকটি বিষয় হচ্ছে মেশিনে প্রবেশ করানো প্লাজমা মেঘ নিজেই একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করছে। সেখানে বাইরে থেকে কোন চৌম্বকীয় ক্ষেত্র প্রয়োগের কোন প্রয়োজন হচ্ছে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যিকভাবে এভাবে জ্বালানি শক্তি পাওয়া খুব শীঘ্রই হয়তো সম্ভব হবে না। চাঁদে অবতরণ করার মতো বিশাল অর্জন রয়েছে মানব ইতিহাসে। সেক্ষেত্রে এখনই এটাকে সেরকম অর্জন বলা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ ফিউশন রিএ্যাক্টরের মাধ্যমে এ কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। আধুনিক ও চৌকস অনেক মানুষ এই খাতে তাদের অর্থ বিনিয়োগ করে বাজি ধরেছেন এবং সেটাকেই তাদের পেশা হিসেবে নিতে চাইছেন। আর বাকি যারা আছেন তারা এ নিয়ে সফলতার প্রত্যাশায় পৃথিবীর সঙ্গেই বাজি রেখেছেন।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: