১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মধ্য-আয়ে বাংলাদেশ জয়তু শেখ হাসিনা


বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এ বছরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও সুখপ্রদ সংবাদÑবিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ অনুন্নত দরিদ্র দেশের পর্যায় থেকে নি¤œ মধ্য-আয়ের উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৩-১৪ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি কিংবা মোটা দাগে মাথাপিছু আয় হিসাবকৃত হয়েছে ১১১০ মার্কিন ডলারে। ২০১৪-১৫ সালে মাথাপিছু আয় হয়েছিল ১১৮৪ মার্কিন ডলার এবং এ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১৪ মার্কিন ডলার। বিশ্ব ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বার্ষিক মাথাপিছু আয় ১০৪৬ ডলার অতিক্রম করলে নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশ হওয়া যায়। বাংলাদেশ ২০১২-১৩ অর্থবছরেই ওই পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বিশ্ব ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ন্যূনপক্ষে ৩ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে (ক্রয়ক্ষমতার সমতা সূত্র অনুযায়ী) মাথাপিছু আয় ১০৪৬ ডলার বা তার চাইতে বেশি থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশ নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। গত ৩ বছরের মাথাপিছু আয় এই মানে বিবেচনা করে বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের অনুকূলে নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশের ওপরে অবস্থান ঘোষণা করে। এ ঘোষণা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ, যথা চূড়ান্তভাবে নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি আগামী ৩ বছরের ভেতর দেবে জাতিসংঘ। মাথাপিছু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির ইতিবাচক বিবর্তনের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য, যথা সাক্ষরতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং আর্থ-সামাজিক সমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পাবে। এসব আর্থ-সামাজিক খাতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং তা সমুন্নত রাখার জন্য যে সব কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে তার আলোকে বলা চলে যে, সংশ্লিষ্ট সকল দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমাদের অনুকূলে যাবে।

বিশ্বব্যাংক কর্তৃক এই স্বীকৃতির ফলশ্রুতি হিসেবে কতিপয় বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। এক. নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ অনুন্নত দেশের অনুকূলে বিশ্ব ব্যাংক ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে নি¤œতম সুদে এবং দীর্ঘতম মেয়াদে ঋণ সহায়তা পাবে না। ফলত আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সমিতি বা আইডিএ থেকে বার্ষিক শতকরা ১ ভাগ বা তার চেয়ে কম হারে ১০ বছর প্রীতিকাল বা গ্রেস পিরিয়ড সংবলিত ৪০ বছর (বা ওই ধরনের মেয়াদে) মেয়াদী ঋণ সহায়তার দাবিদার বাংলাদেশ থাকবে না। অবশ্য এই পরিবর্তন আগামী ৭ বছর পর (জাতিসংঘ কর্তৃক নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতির ৩ বছর পরে) বাংলাদেশ অনুন্নত দরিদ্র দেশের ওপরে তথা নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশে অবস্থিত থাকলে প্রযোজ্য হবে। তখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সমিতি থেকে প্রদত্ত ঋণের ওপর অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত রেখে বার্ষিক মোটামুটি শতকরা ৫ ভাগ সুদ হারে ঋণ নেয়া যাবে। উল্লেখ্য, এই সুদের হার সমকালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লভ্য বাণিজ্যিক ঋণের বিপরীতে ধার্য সুদ হারের চাইতে কম। দুই. অনুন্নত দরিদ্র দেশ হিসেবে বাণিজ্য ক্ষেত্রে উন্নত দেশ, যথা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বাংলাদেশ থেকে রফতানীয় পণ্যসামগ্রীর ওপর প্রদত্ত বা প্রদানীয় শুল্ক সুবিধা নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নাও পেতে পারে। আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশ বাণিজ্য ক্ষেত্রে যে সব দেশ থেকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে তা কমার বা প্রত্যাহৃত হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই। উদাহরণত, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতার ভিত্তিতে ভারত যে সব বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কবিহীন প্রবেশাধিকার দিয়েছে তাতে কোন পরিবর্তন হবে না বলেই ধরে নেয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জিএসপি সুবিধাপ্রাপ্ত দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশের এখনও অন্তর্ভুক্ত না হওয়া জিএসপি প্রত্যাহারের নির্দেশক নয়। যথা উল্লেখিত শর্তাদি পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ হলে বাংলাদেশ অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা পাবে বলে ধরে নেয়া যায়। বলা প্রয়োজন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডঞঙ এর আওতায় নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা ও সমঝোতার আলোকে অনুমান করা যায় যে, অদূর ভবিষ্যতে কেবলমাত্র নি¤œ মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হলে বাংলাদেশের অনুকূলে প্রাপ্ত বা দাবিকৃত কিংবা প্রদত্ত বা প্রদানীয় শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করা হবে না।

মাথাপিছু আয় বাড়ার বিবেচনায় বাংলাদেশের মধ্য-আয়বিশিষ্ট দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কৃতিত্ব জননেত্রী শেখ হাসিনার। তাঁর নের্তৃত্বে পরিচালিত এ সরকার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে যে উন্নতি অর্জন করেছে তা আগে ঘটেনি। ২০১২-১৩ এবং ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হার বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল যথাক্রমে ৫.০১ ও ৬.৬ শতাংশ। ২০১৪-১৫ সালে এই প্রবৃদ্ধির হার উন্নীত হয়েছে ৬.৫১ শতাংশে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশজ সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২২.৯ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় (দেশজ সঞ্চয়+বিদেশ থেকে শ্রমিক প্রেরিত আয়) হয়েছিল ২৯.২৩ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল জিডিপির ২৮.৫৮ শতাংশ। ২০১৪-১৫-তে তা বৃদ্ধি পেয়ে উঠে এসেছে জিডিপির ২৯.২ শতাংশে। এই বিনিয়োগে বিদেশী সহায়তার পরিমাণ কমে এসেছে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১.৮ শতাংশ।

কৃষি, শিল্প ও সেবা ক্ষেত্রে বিনিয়োগের এই হার অর্জন করা সম্ভব হয়েছে মূলত ৪টি কার্যক্রমের বলে : (১) বিদ্যুত উৎপাদন ও সরবরাহে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি, (২) সড়ক, রেল ও টেলিযোগাযোগের কার্যক্ষম বিস্তৃতি, (৩) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রসারিত কার্যক্রমের ফলে অধিকতর দক্ষ জনশক্তির উৎপাদনে প্রয়োগ এবং (৪) মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি অনুসরণ। এই ৪টি ক্ষেত্রেই যথার্থ পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেখিয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য-আয়ের দেশে শ্রেণীভুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অর্জিত সফলতার আলোকে এই ৪টি ক্ষেত্রেই ইতোমধ্যে অনুসৃত নীতি ও কার্যক্রমের অধিকতর সূক্ষ্ম ও সুচিন্তিত অনুবৃত্তি হিসেবে আরও সম্প্রসারিত কার্যক্রম হাতে নিতে ও বাস্তবায়িত করতে হবে। মূল কার্যক্রমের লক্ষ্য ও প্রকৃতির মধ্যে যেখানে সংশোধন ও সম্প্রসারণ প্রয়োজন সেদিকে যথা প্রয়োজন দৃষ্টি দেয়া সফলতার সূচক হবে।

প্রথমত কৃষি খাতে জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক গৃহীত নীতি অনুয়ায়ী অধিকতর বিনিয়োগ ও উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে অধিকতর দ্রুততার সঙ্গে সেচ প্রসারণ, যথাযথ সহায়কি দিয়ে উফশী বীজ ও সার বিতরণ, অধিকতর উফশী এবং খরা ও প্লাবন সহিষ্ণু ধান, গম, শাকসবজি ও ফলফলাদির বীজ উদ্ভাবন ও বিচ্ছুরণ, কৃষকদের মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফসলী ও মূলধন ঋণ বিতরণ এবং কৃষিপণ্য বিনিময়াগার স্থাপন ও কৃষিপণ্যের ভবিষ্যত বাজার বা ফিউচার মার্কেট প্রতিষ্ঠাকরণ। এসবের প্রয়োজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ইতোমধ্যে দেশে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানাধীন যন্ত্রীকরণ এগিয়ে গেছে। এই সময়ে উৎপাদনশীলতার নিরিখে এ লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে মূলধনী ঋণের প্রবাহ বাড়াতে হবে। কৃষি খাতে সহজ শর্তে অধিকতর ঋণ সরবরাহ যাতে খেলাপীর প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকে তার দিকে সচেতন নজর রাখতে হবে। সাম্প্রতিককালে কৃষিজাত পণ্যাদির উৎপাদন বৃদ্ধি মৌসুমভেদে মূল্য হ্রাস ঘটিয়েছে এবং ফলত অধিকতর উৎপাদনশীল কৃষক বর্ধিত উৎপাদনভিত্তিক ফিরতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কৃষিপণ্যের বাজার মূল্যে সময়ান্তরিক স্থিতিশীলতা আনা এবং এ কারণে অধিকতর কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ সংরক্ষণ ও বাড়ানোর জন্যে কৃষিপণ্য বিনিময়াগার ও কৃষিপণ্যের ভবিষ্যত বাজার সৃষ্টি করা প্রয়োজন হবে। এই দুটি ক্ষেত্রে এখনও তেমন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোকেন্দ্রিক পণ্য বিনিময়াগার ও ভবিষ্যত বাজারের সৃজন ও বিবর্তনের আলোকে এবং ভারতের মুম্বাইয়ে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত পণ্য বিনিময়াগার পরিচালনার পদ্ধতি অনুসরণে এ লক্ষ্যে সত্বর পদক্ষেপ নেয়া বাঞ্ছনীয় হবে।

চলবে...

লেখক : সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ