২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিএনপি সন্ত্রস্ত


বিএনপি সন্ত্রস্ত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ টানা তিন মাসের আন্দোলনে নাশকতার দায়ে খালেদা জিয়ার বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে বলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ভয় পেয়ে গেছে বিএনপি। এর আগে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল জামায়াতেরও একই অবস্থা হয়েছিল। তখন ভয় পেয়ে জামায়াতও আন্তর্জাতিক তদন্তের কথা বলেছিল। একইভাবে বিএনপিও জামায়াতের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। শনিবার বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপনও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশে আন্দোলন টানা অবরোধ চলাকালে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করা হয়েছে মর্মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে অভিযোগ তুলেছেন সে বিষয়ে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি করেছেন।

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ঘোষণায় ৬ জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী টানা ৯২ দিন অবরোধ কর্মসূচী পালন করে বিএনপি। দলের সিনিয়র নেতাদের মতামত না নিলেও জামায়াত ও লন্ডন থেকে দেয়া ছেলে তারেক রহমানের পরামর্শ নিয়ে কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই খালেদা হঠাৎ করে এত বড় একটি আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করে ফেলেন। শুধু টানা অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি খালেদা জিয়া। এ কর্মসূচী চলাকালে বাসা ছেড়ে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করে তিনি দফায় দফায় হরতাল ঘোষণা করেন। নেতিবাচক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচী চলাকালে পেট্রোলবোমাসহ নাশকতামূলক কর্মকা-ের শিকার হয়ে ১৫৩ জন লোকের প্রাণহানি ও শতাধিক লোক মারাত্মক আহত হন। আগুনে পুড়ে যায় সহস্রাধিক যাবাহনসহ অনেক স্থাপনা। এতে কিছু মিলিয়ে দেশের ক্ষতি হয় প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। দেশকে অচল করে দেয়ার জন্যই খালেদা জিয়া জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোকে নিয়ে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচী পালন করে বলে বিভিন্ন মহল থেকে খালেদা জিয়ার বিচার দাবি করা হয়।

এদিকে টানা অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল কর্মসূচী শুরুর পর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পেট্রোলবোমাসহ নাশকতা চালিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে অনেক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় খালেদা জিয়াসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীরা বলে আসছেন যারা আন্দোলনের নামে নাশকতার সঙ্গে জড়িত তাদের কাউকে ছাড়া হবে না। তাদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিচার নিশ্চিত করা হবে। আর সে বিচারের পরিণতির কথা ভেবেই খালেদা জিয়াসহ বিএনপির নেতাকর্মীরা ভয় পেয়ে গেছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনের নামে প্রেট্রোলবোমা নাশকতা চালিয়ে মানুষ হত্যার দায়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে করা হবে বলে ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সরকারী দলের অন্য নেতারাও বলেতে থাকেন আন্দোলনে নাশকতার দায়ে খালেদা জিয়ার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালেই হবে। এর পর এ নিয়ে সারাদেশে আলোচনার ঝড় ওঠে। খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা এ প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা শুনে বিএনপি যে ভয় পেয়েছে তা বিএনপি নেতাদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়।

শনিবার কুষ্টিয়ায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে ঈদের পর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঈদের পরই এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হচ্ছে। এই ট্রাইব্যুনালে প্রত্যেকটা মানুষ পোড়ানোর ঘটনার মামলা পাঠানো হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে আইনের উর্ধে কেউ নয়। খালেদা জিয়াও নন। খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তবে সম্প্রতি দেড় শতাধিক মানুষকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার কর্মকা-ের যে নেতৃত্ব তিনি দিয়েছেন, সেটা ১৯৭১ সালের গণহত্যার মতো একটি ঘটনা। ’৭১-এর গণহত্যায় যেমন রেহাই দেয়া হচ্ছে না, তেমনি মানুষ পোড়ানোর দায়ে খালেদা জিয়াও অভিযুক্ত। তাঁর নামে মামলা হয়েছে, তদন্ত শেষ হয়েছে। দু-একটা মামলায় অভিযোগপত্র হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে খালেদা জিয়া যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন তাহলে রাজনীতি করবেন, তা না হলে রাজনীতি থেকে ইস্তফা দিয়ে কারাগারে চলে যাবেন। এর বাইরে তাঁর অন্য কোন পরিণতি নেই।

সংবাদ সম্মেলনে রিপন বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। তাই বিএনপি সহিংসতায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু আন্দোলনের সময় যেসব সহিংসতা হয়েছে তার দায় বিএনপির ওপর চাপাচ্ছে সরকার। কিন্তু বিএনপি এর সঙ্গে জড়িত নয়। কারণ, নাশকতার নির্দেশ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দেননি বা এর সঙ্গে দলের কোন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততা নেই। তিনি দলের যেসব নেতাকর্মী কারাগারে রয়েছেন তাদের ঈদের আগে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, এর আগেও বিএনপি সরকারের আমলে পেট্রোলবোমা মারা হয়েছে। গানপাউডার দিয়ে ১১ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ মারা হয়েছে কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকার বলেনি যে শেখ হাসিনার নির্দেশেই এসব হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরানোর বিষয়টির ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

টানা তিন মাসের আন্দোলনে নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করতে আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করে রিপন বলেন, বিএনপির আন্দোলনের সময় নাশকতার সঙ্গে কারা জড়িত তদন্ত হলে বের হয়ে যাবে। তদন্ত না করে এ ব্যাপরে ঢালাও মন্তব্য করলে তা গণতন্ত্রের জন্য ভাল হবে না। তিনি বলেন, দফতর কেড়ে নেয়া আওয়ামী লীগের নিজস্ব বিষয়। তবে সৈয়দ আশরাফ মন্ত্রী হতে আগ্রহী ছিলেন না বলে জানি। গণমাধ্যমে দেখেছি, আশরাফ মন্ত্রণালয়ে যেতেন না। বছরের পর বছর দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দফতর কেড়ে নেয়ার পর যেভাবে জনগণকে কারণ জানানো হয়েছে, স্বচ্ছতার জন্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ব্যাপারেও সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে এ বিষটি জানানো উচিত বলে মনে করি।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে অশুভ শক্তি আসতে পারে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এমন বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে রিপন বলেন, এ বক্তব্যের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। অশুভ শক্তির উদ্ভব হবে কিনা জানি না, তবে বিকল্প শক্তির উত্থান হতে পারে। তখন কারও কিছু করার থাকবে না। আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত কোন নির্বাচন বয়কট করেনি সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এমন বক্তব্যের জবাবে রিপন বলেন, রাজনীতি সম্পর্কে সৈয়দ আশরাফুলের কম ধারণা রয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ ১৯৮৮ সালে নির্বাচনে যাননি এবং ২০০১ সালে বিএনপির অধীনে যে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও নির্বাচনে অংশ নেননি।

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একই বৃন্তে দুটি ফুল আখ্যা দিয়ে রিপন বলেন, তাদের দু’জনের একজন ঝরে গেলে আরেকজনও ঝরে যাবেন। এক জনের বিনাশ ঘটলে অন্য জনেরও বিনাশ ঘটবে। বিএনপির বিনাশ হলে আওয়ামী লীগেরও বিনাশ হবে। আর আওয়ামী লীগের বিনাশ ঘটলে বিএনপিরও বিনাশ ঘটবে। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা যদি রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে তবে বিকল্প শক্তি এসে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে না। এ জন্য ওয়ান-ইলেভেন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান, সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, সহ-দফতর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন প্রমুখ।

তরিকুল ইসলাম হাসপাতালে ॥ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাকে শনিবার সকালে রাজধানীর ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি ডাঃ রফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে বিএনপি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।