মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

নির্দিষ্ট পরিমাণ জৈব কৃষি লাভজনক

প্রকাশিত : ৯ জুলাই ২০১৫

এমদাদুল হক তুহিন ॥ দেশে বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য বা অর্গানিক ফসল উৎপাদনের কোন বিকল্প নেই বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে কোনরূপ রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার ব্যতীত ফসল উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করলে খাদ্য দ্রব্যের উৎপাদন কমে আসবে। এমনকি তা খাদ্য সঙ্কটের কারণ হয়েও দাঁড়াতে পারে! তবে নিরাপদ স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা কমিয়ে আনার পক্ষে প্রায় সকলেই। খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের লক্ষে জৈব উপায়ে চাষাবাদের দিকে জোর দিচ্ছে কৃষি ও কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারী-বেসরকারী প্রতিটি সংগঠন। নির্দিষ্ট পরিমাণের জৈব কৃষির পক্ষে মত অনেকেরই। এটা লাভজনক। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও জৈব উপায়ে চাষাবাদের পক্ষে জোর প্রচারণা চালালেও বাস্তবতা বলছে তা শুধুমাত্র লোক দেখানো। প্রকৃতপক্ষে রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা কমিয়ে আনার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অর্গানিক উপায়ে চাষাবাদ পদ্ধতি। দেশে বাণিজ্যিকভাবে অর্গানিক ফসল উৎপাদনের প্রসার প্রায় অসম্ভব। পদ্ধতিটির প্রসারে উচ্চ কারিগরি মানসম্পন্ন জনবল দরকার, দেশে যার অনুপস্থিতিও রয়েছে অনেকাংশে। তবে অসংখ্য গবেষণায় ফলাফলে দেখা যায়, জৈব উপায়ে উৎপাদিত খাদ্য অধিক নিরাপদ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ।

বিশ্বের নানাপ্রান্তে অর্গানিক বা জৈব কৃষি নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের প্রচারণাই রয়েছে। তবে জৈব উপায়ে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের দাম চড়া হলেও অনেকে সুস্বাস্থ্যের আশায় অর্গানিক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। তাজা ফল ও সবজির দিকে ক্রেতাদের অকর্ষণ বরাবরই ঈর্ষনীয়। অনেকের দাবি রয়েছে দিন দিন জমজমাট হয়ে উঠবে অর্গানিক ফুডের ব্যবসা। বহির্বির্শ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সদ্য মধ্য আয়ের দেশ পা রাখা বাংলাদেশে জৈব উপায়ে চাষাবাদ হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে! এমনকি রয়েছে ইতিবচাক ও নেতিবাচক ধারণাও।

একাধিক কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণভাবে জৈব খাবার বা অর্গানিক ফসল বলতে সম্পূর্ণরূপে রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া উৎপাদিত ফসলকে বুঝায়। কৃষিব্যবস্থার সূচনালগ্নে এর সবটাই ছিল জৈব পদ্ধতির। কোনরূপ রাসায়নিক বা বালাইনাশক তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে প্রাকৃতি উপায়েই চলছিল চাষাবাদ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত মানব সমাজের প্রসার ঘটায় জ্ঞানের মহিমায় আবিষ্কৃত হয় রাসায়নিক চাষাবাদ। আর রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে শুরু করলে মানুষ আবারও পুরনো প্রথা নিয়ে কথা বলতে আরম্ভ করে। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনকে ত্বরান্বি^ত করা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে কৌশল হিসেবে অর্গানিক ফসল ফলানোর কথা বলে আসছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। কৃষিবিদরাও মনে করেন, পারিবারিক পর্যায়ে প্রতিটি পরিবারে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন আবশ্যক। একাধিক কৃষিবিদের ধারণা মতে বাণ্যিজিকভাবে অর্গানিক ফসল উৎপাদন শুরু করলে দেশে খাদ্য সঙ্কটের সম্ভাবনা দেখা দেবে। মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সীমিত পর্যায়ে পারিবারিক চাহিদা মেটাতে প্রতিটি পরিবারেই অর্গানিক বা জৈব উপায়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন করা উচিৎ।

কয়েকজন কৃষিবিদ জনকণ্ঠকে জানান, দেশে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনকে ত্বরান্বি^ত করতে অর্গানিক ফসল ফলানোর কথা বলা হলেও বাণিজ্যিকভাবে এর প্রসার অসম্ভব। মূলত পেসটিসাইডকে নিরুৎসাহিত করতেই অধিকহারে অর্গানিক ফসলকে প্রচার প্রচারণায় আনা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উর্ধতন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অর্গানিক ফসল উৎপাদনের জন্য দেশে এখন পর্যন্ত সরকারীভাবে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। ক্ষুদ্র পর্যায়ে উৎপাদিত হওয়া ফসল বিক্রির জন্যে নেই কোন নীতিমালাও। অধিদফতরের কৃষি তথ্য সার্ভিস কেন্দ্রেও অর্গানিক ফসল নিয়ে তেমন কোন তথ্য নেই। তবে কর্মকর্তারা জনান, পুরো পৃথিবীজুড়ে অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের দাম খুব বেশি। এ পদ্ধতির ব্যবহারে ক্ষুদ্র পর্যায়ে বাংলাদেশেও ফসল ফলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ জৈব উপায়ে বালাইগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। পদ্ধতিটিতে কোনরূপ পেসটিসাইড বা রাসায়নিক সার ব্যবহার না করায় মোট উৎপাদন কমে আসবে। ফলে পদ্ধতিটি জনপ্রিয় নয় এবং জনপ্রিয় হওয়ার কোন সম্ভাবনাও নেই। তবে তারা এও জানান যে ক্ষুদ্র পর্যায়ে অর্গানিকভাবে শাকসবজি চাষাবাদ হচ্ছে। এমনকি অর্গানিক ফার্মিং নিয়ে কাজ করছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। তারা জানান, পদ্ধতিটি নিয়ে সরকারী পর্যায়ে কোন কাজ হয়নি; তবে ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ, মোটিভেশন নিয়ে কাজ চলছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে অর্গানিক ফুড বা প্রোডাক্ট নিয়ে কোন কাজ না হলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কোনভাবে পিছিয়ে নেই। তারা জৈব কৃষি নিয়ে কাজ করে এমন গবেষক, সম্প্রসারণকর্মী ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে; যা বাংলাদেশ জৈব কৃষি নেটওয়ার্ক নামে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জৈব কৃষি গবেষক ড. মোঃ নাজিম উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, বারি জৈব কৃষি উপায়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যা কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে। জৈব কৃষির প্রাণ হলো স্থানীয় জ্ঞান। বারি স্থানীয় জ্ঞান সংগ্রহ করছে ও অন্যান্য সুবিধাভোগিদের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর মাধ্যমে কাজ করে চলছে। বারি কৃষকদের মাঝে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য আদর্শ জৈব গ্রাম কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। এ পর্যন্ত নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও ধামরাইয়ের তিনটি গ্রামে এ কাজ হয়েছে। সেখানে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও জানানÑ কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক জৈব কৃষির প্রয়োগ প্রয়োগ পদ্ধতি মূলত চারটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। স্বাস্থ্য, পরিবেশ, স্বচ্ছতা ও তদারকির বা যতেœর ওপর ভিত্তি করে এ ধারনার উদ্ভব। প্রতিটি নীতিই অন্যটির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ও নির্ভরশীল।

কয়েকটি তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে দু’ভাবে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু আছে। প্রতিটি মানুষ নিজের খাদ্য বিশেষ করে ফল ও সবজি বাড়ির আঙ্গিনায় উৎপাদন করছেন, যার অধিকাংশে কোন রূপ রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার হয় না। আর সেসব শাকসবজি বা ফসলে বিন্দুমাত্র রাসায়নিকের অস্তিত্ব নেই, তাই জৈব ফসল। এছাড়া বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ হচ্ছে, এমনকি তারা নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্কভিত্তিক সংগঠিত হয়ে জৈব উপায়ে চাষাবাদ ত্বরান্বি^ত করছে। দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে চাষিরা নিজ উদ্যোগে অর্গানিক উপায়ে খাদ্যশষ্য উৎপাদন ও বিপণন করছেন। ঝিনাইদহ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, পাবনা, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, সিলেট, গাজীপুর জেলায় এ ধরনের কর্মকা- হচ্ছে। জানা যায়, প্রতিটি মানুষের বাড়ির অঙ্গিনায় উৎপাদিত সকল দ্রব্যই জৈব দ্রব্য। কয়েকটি সংগঠন জৈব উপায়ে চাষাবাদে সকলকে সচেতন করতে নানা কর্মসূচী গ্রহণ করছে, তার মধ্যে অন্যতম উন্নয়নধারা, হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড, একশন এইড, রাজশাহী কৃষি পাঠাগার, বারসিক, এএল্আরডি, কারিতাস প্রমুখ।

কৃষিবিদ, পরিবেশবাদী সংগঠন কিংবা সম্প্রসারণের মধ্যে মতবিরোধ যাই থাকুক না কেন একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে পরিবশের ভারসাম্য রক্ষায় জৈব উপায়ে চাষাবাদের বিকল্প নেই। তাদের মতে, সীমিত পরিসরে হলেও সর্বত্র জৈব চাষাবাদ বৃদ্ধি আবশ্যক। আর কৃষকদের সচেতন করে মাত্রতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার রোধ করার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিবিদদের বড় একটি অংশ।

অর্গানিক ফসলের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে জৈব কৃষি গবেষক ড. মোঃ নাজিম উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, সর্বত্র অর্গানিক ফসল উৎপাদনের বিষয়ে মনযোগ দেয়ার কথা বলছি না, বিশেষ কিছু অঞ্চলে বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে জৈব কৃষিকে সম্প্রসারিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সরকার ঘোষিত ভিশন-২০২১ এর মধ্যে দেশের অন্তত ১০ শতাংশ কৃষিকে অর্গানিকের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রকাশিত : ৯ জুলাই ২০১৫

০৯/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: