মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

শত বছর পর স্বপ্নের মেলবন্ধন!

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫
  • মাহমুদা সুবর্ণা

অবশেষে শিরোপার দেখা পেল চিলি। বিশ্বফুটবলের শক্তিশালী দল আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জয়ের স্বাদ পেল টুর্নামেন্টের স্বাগতিকরা। রবিবার চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোর এস্টাডিও ন্যাসিওনালে অনুষ্ঠিত ৪৪তম আসরের ফাইনালে টাইব্রেকারে তারা ৪-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে কোপার চৌদ্দবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলায় এদিন গোলশূন্য থাকার পর পেনাল্টি শূট আউটে শেষ হাসি হাসে চিলি। আর আরেকবার শিরোপার কাছে পৌঁছেও স্বপ্ন-ভঙ্গের বেদনায় ডুবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।

দীর্ঘ ৯৯ বছরের ইতিহাসে এটাই চিলির প্রথম কোপা আমেরিকার শিরোপা। শুধু তাই নয়, দেশটির ইতিহাসে এটি প্রথম কোন বড় শিরোপা জয়। টুর্নামেন্টের যোগ্য দল হিসেবেই কোপার শ্রেষ্ঠত্ব নিজেদের করে নিয়েছে চিলি। ফাইনালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করে স্বাগতিকরা। চিলির ফুটবলাররা শতভাগ সফল হন, আর শুধু মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনার সবাই ব্যর্থ। যে কারণে আরেকবার চোখের পানি সঙ্গী হয়েছে দিয়াগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরিদের। চিলির হয়ে জয়সূচক স্পট কিকটি নিয়েছিলেন ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা আর্সেনাল স্ট্রাইকার এ্যালেক্সিস সানচেজ। প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরোকে বোকা বানিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৪৫ হজারেরও বেশি দর্শক বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে ফেটে পড়ে। টাইব্রেকারের প্রথম শটে চিলির মাটিয়াস ফার্নান্দেজ জোরালো শটে গোল করেন। আর্জেন্টিনার প্রথম শট নেন অধিনায়ক মেসি। ডান দিক দিয়ে নিচু শটে বল জালে জড়ান তিনি। আর্টুরো ভিদালের দ্বিতীয় শটে হাত লাগিয়েও ফেরাতে পারেননি আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক রোমারো। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় শট হিগুয়াইন অবিশ্বাস্যভাবে বারপোস্টের অনেক ওপর দিয়ে মারেন। চিলির চার্লস আরানগুইজ তৃতীয় শট থেকে সহজেই গোল করেন। আর আর্জেন্টিনার এভার বানেগার দুর্বল শট চিলি গোলরক্ষক ক্লাউডিও ব্রাভো সহজেই রুখে দেন। আর্জেন্টিনা টানা দুই শট থেকে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় চিলির সামনে সুযোগ আসে চতুর্থ শটেই গোল করে শিরোপা জয়ের। রোমারোকে বোকা বানিয়ে সেই কাজটি অবলীলায় করেন সানচেজ।

শিরোপা জিততে না পারার বেদনায় ‘পাথর’ বনে যান মেসিরা!

কোপা আমেরিকার ফাইনাল জয়ের ফলে আর্জেন্টিনার সঙ্গে একটি পুরনো হিসেবও চুকিয়ে ফেলল চিলি। ১৯৫৫ সালে নিজ মাটিতে এ আসরের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে অশ্রুজলে বুক ভাসাতে হয়েছিল চিলি দলকে।

৬০ বছর পর সেই মাটিতে সেই একই প্রতিপেক্ষর সঙ্গে লড়াইয়ের পর আবারও কাঁদল তারা। তবে এবার সে কান্না জয়ের! পাঁচবার ফাইনাল খেলে এটা চিলির প্রথম কোপা শিরোপা। রানার্সআপ হয় ১৯৫৫, ৫৬, ৭৯ ও ৮৭ সালে। আর রেকর্ড ২৭ বার ফাইনাল খেলে ও ১৪ বার শিরোপা জিতে কোপায় এ নিয়ে দ্বাদশবারের মতো রানার্সআপ হলো আর্জেন্টিনা। দু’দলের মধ্যে এটা ছিল ৮১তম সাক্ষাত। চিলির জয় ৭ ম্যাচে। আর কোপায় এটা ছিল দু’দলের ২৫তম দৈ¦রথ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আর্জেন্টিনা ১৮ ম্যাচে জিতলেও এবারই প্রথম জয় পেল চিলি! ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনা ৩ এবং চিলি ১৯ নাম্বারে থেকে ফাইনালে খেলতে নামে। হেড টু হেড পরিসংখ্যানেও স্পষ্টই এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। অথচ ফাইনালে দেখা যায় অন্য চিত্র। আক্রমণে, আধিপত্যে, বল নিয়ন্ত্রণে-সবকিছুতেই দাপট দেখিয়েছে চিলিয়ানরা। বলের নিয়ন্ত্রণ তাদের ছিল ৫৭ শতাংশ। তাদের খেলা ছিল পরিকিল্পত, গোছাল এবং আক্রমণাত্মক। নিজেদের মাঠে পরিপূর্ণ দর্শক সমর্থন নিয়ে খেলেছেও তারা বীরের মতো। পক্ষান্তরে আর্জেন্টিনার খেলা ছিল এলোমেলো, রক্ষণাত্মক, বিরক্তিকর এবং কাউন্টার এ্যাটাকনির্ভর। তাদের মাঝমাঠের দুর্বলতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দলের প্রাণভোমরা মেসি ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ! যে কারণে আরেকবার ফাইনালে হারের জ্বালায় জ্বলতে হয়েছে তাদের।

প্রথমবারের মতো কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে ইতিহাস রচনা করে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসছেন ভিদাল-সানচেজরা। আনন্দের জোয়ারে ভাসছে গোটা চিলি। প্রায় এক শতাব্দীর সাধনার ফল অবশেষে হাতে ধরা দিয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবেই আবেগকে চেপে রেখেছেন চিলির কোচ সাম্পাওলি। কোপার শিরোপা জিতেও পা মাটিতে রাখছেন এই আর্জেন্টাইন কোচ। চিলির ইতিহাসের বিশাল এই সাফল্যও যেন ছুঁতে পারেনি তার আবেগকে। বরং আরও কঠিন হচ্ছেন সাম্পাওলি। লক্ষ্য আরও বহুদূর। জানিয়ে দিলেন, শুধু কোপা জিতলেই হবে না। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের কঠিন চ্যালেঞ্জও যে মোকাবেলা করতে হবে চিলিকে।

তবে কোচের আবেগ নিয়ন্ত্রিত হলেও উচ্ছ্বাসে ভাসছেন তার শিষ্যরা। চিলির ৯৯ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে সানচেজ-ভিদালরা প্রমাণ করে দিলেন তারাই এই উপাধির যোগ্য দাবিদার। ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে চিলির তারকা আর্তুরো ভিদাল জানান দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে তাদের। তবে এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে তাদের কঠোর পরিশ্রম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল। এজন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি আমরা।’ দলের আরেক সেরা তারকা এ্যালেক্সিস সানচেজ। দীর্ঘদিন ধরে খেলেছেন আর্জেন্টিনার সেরা তারকা লিওনেল মেসির সঙ্গে। স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সিলোনাতে। এবার সেই বার্সার সাবেক সতীর্থের দেশকে হারিয়ে রোমাঞ্চিত সানচেজ। এ বিষয়ে চিলির তারকা ফুটবলার জানান ব্রাজিল বিশ্বকাপেই তিনি সতীর্থদের বলে রেখেছিলেন যে কোপাতে শিরোপা নিজেদের করেই রাখবেন। এ বিষয়ে আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর তিনি বলেন, ‘এটা ব্রাজিলেই বলেছিলাম যে, আমরা শিরোপা জিততেই কোপা আমেরিকায় খেলতে যাচ্ছি। এই প্রজন্মটা আসলেই দুর্দান্ত। আমরা যোগ্য দল হিসেবেই শিরোপা জিতেছি।’ শিষ্যদের অসাধারণ পারফর্মেন্সে মুগ্ধ চিলির আর্জেন্টাইন কোচ জর্জ সাম্পালিও।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অসাধারণ সব খেলোয়াড় নিয়ে গড়া একটি দলের বিপক্ষে আমরা দুর্দান্ত খেলেই জিতেছি। ৯০ মিনিটের মধ্যেই আমাদের জেতা উচিত ছিল। কিন্তু যাই হোক শেষ পর্যন্ত সুবিচার পেয়েছি আমরাই।’ তবে কোপার শিরোপা জেতা চিলির কোচের চোখে এখন ২০১৮ বিশ্বকাপ। সাম্পাওলি ঠিক ওই দিকটাই সবার দৃষ্টি রাখতে বলেছেন। তাঁর মন্তব্য খুবই স্পষ্ট, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এই খেতাবের কোন গুরুত্ব নেই। তার তিনি বলেন, ‘যখন আপনি এত সম্মানজনক কিছু জয় করেন, তখন সবাই অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখতে শুর করে। কিন্তু বাছাইপর্বে এই জয়ের কোন প্রভাব পরবে না।’

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫

০৮/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: