২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বায়োনিক ট্রাউজার


বায়োনিক শব্দটা শুনলে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর নানা দৃশ্য এসে উদয় হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের বিকাশ আজ এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যখন বায়োনিক ব্যাপারগুলোকে আর কল্পকাহিনী মনে করার উপায় নেই। এগুলো রীতিমতো বাস্তব হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা আজ বায়োলজি তথা মানবদেহের সঙ্গে প্রকৌশল ও রোবোটিক্সকে যুক্ত করে আগামী দিনের মানুষের জন্য অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। চলৎশক্তিহীনদের সাহায্য করার জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে বায়োনিক এক্সোস্কেলিটন। বৃদ্ধদের হাঁটাচলার সহায়তার জন্য তৈরি হয়েছে বায়োনিক পাওয়ার ট্রাউজার। অবশ্য এগুলো সবই রয়েছে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে।

আমাদের বায়োনিক ভবিষ্যতের জন্য যে জিনিসটা একান্তই প্রয়োজন তা হলো অভিযোজন বা খাপ খাইয়ে নেয়া। আমাদের প্রয়োজন এমন বায়োনিক সাজসরঞ্জাম তৈরি করা যা আমাদের শরীরের সঙ্গে ও আমাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। সেটির জন্য আমদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো দরকারÑ সেন্সিং বা অনুধাবন, কম্পিউটেশন বা পরিগণন এবং একচুয়েশন বা সক্রিয়করণ।

অনুধাবনের কাজটা সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে করা যায়। সেন্সর আমাদের মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও পেশির ক্রিয়াকলাপ সরাসরি রেকর্ড করে থাকে বিদায় সেন্সর দিয়ে ওই কাজটি করা যায়। তাছাড়া শরীরে সংযোজিত সরঞ্জামাদি ব্যবহার করলেও করা যায়। যেমন এক্সেলেরোমিটার যা আমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের চলাচল পরোক্ষভাবে পরিমাপ করে। এরপর কম্পিউটার এই তথ্যকে মানব আচরণের বিভিন্ন মডেলের সঙ্গে যুক্ত করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে কম্পিউটার দ্বারা এক সেট পাওয়ার একচুমেটর সক্রিয় হয়ে উঠে আমাদের পরিবর্তনশীল শরীর ও পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে অহরহ খাপ খাইয়ে নেয়।

বর্তমানে বেশিরভাগ বায়োনিক সহায়তা সরঞ্জাম ধাতব ও প্লাস্টিকের মতো কঠিন পদার্থ দিয়ে তৈরি এবং সাধারণ মিটার ও গিয়ারবক্স দিয়ে চালিত। এই প্রযুক্তিগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে এগুলোর কাঠিন্য ও অনমনীয়তার কারণে মস্ত অসুবিধা হতে পারে। প্রকৃতিতে মাংসপেশি ও গাত্রচর্মের মতো নমনীয় ধরনের বস্তুরই প্রাধান্য এবং মানুষ হিসেবে আমরা নরম পদার্থেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

তবে ‘নরম রোবোটিক’ তৈরির নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হচ্ছে যা প্রচলিত কঠিন বায়োনিকের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠার সম্ভাবনা ধারণ করে আছে। এখানে নরম ও নমনীয় পদার্থ ব্যবহার করা হয় যা মানবদেহের সঙ্গে অধিকতর স্বাভাবিক উপায়ে কাজ করে। যেমন কঠিক ধাতব পদার্থ ও প্লাস্টিকের পরিবর্তে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ইলাস্টিক উপকরণ, রবার ও জেল। মোটর ও গিয়ারবক্সের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে আরও উন্নততর উপকরণ ও সরঞ্জাম যেগুলো বিদ্যুতের দ্বারা উদ্দীপ্ত হলে বাঁকে, পাক খায় ও টানে। এগুলো জীবদেহের মাংসপেশির সঙ্কোচনের অনুকরণ করতে পারে। এগুলোকে অনেক সময় কৃত্রিম মাংসপেশি বলেও অভিহিত করা হয়। এসব অগ্রগতি অর্জিত হওয়ার ফলে বিজ্ঞানীরা এখন সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরনের বায়োনিক সরঞ্জাম তৈরির অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্মার্ট বায়োনিক ট্রাউজার।

কী লাভ হবে এই স্মার্ট বায়োনিক ট্রাউজারে?

লাভ হবে এই যে এর সাহায্যে বিকলাঙ্গ ও বৃদ্ধ লোকেরা তাদের সচলতা ও চলাফেরার স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবেন। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো কাজগুলো তাদের পক্ষে সম্ভব ও সহজতর হবে। স্মার্ট ট্রাউজার ব্যবহারকারী ব্যক্তির অভিপ্রায় পরিবীক্ষণ করতে এবং যখনই প্রয়োজন তাকে স্বয়ংক্রিয় শক্তির সহায়তা দিতে সক্ষম হবে। যেমন ধরুন চেয়ার থেকে উঠা কিংবা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়। অবশ্যই এটা স্রেফ প্রযুক্তির ব্যাপার নয়, বরং তার চেয়ে বেশি কিছু। নরম রোবোটিক পোশাকটিকে হতে হবে আরামদায়ক, সহজ পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্যসম্মত ও স্টাইলিশ।

ভবিষ্যতে স্মার্ট ট্রাউজার মানবদেহের সঙ্গে আরও বেশি করে একাত্ম হয়ে যেতে পারে। তখন হয়ত চামড়ার নিচে সেন্সর সংযোজন করে দেয়া হবে। এই সেন্সর স্নায়ুর সঙ্কেত সরাসরি পরিবীক্ষণ করতে পারবে যার ফলে ব্যবহারকারীর অভিপ্রায় সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। এতে পরিধানকারীর সঙ্গে ভবিষ্যতের সরঞ্জামগুলো আরও বেশি স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

এমন কৌশল যে বেশ সম্ভাবনাময় সেটি ভিয়েনার এক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক কাজেই দেখা গেছে। সেখানে হাতে মারাত্মক জখন পাওয়া তিন ব্যক্তি তাদের হাত কেটে বাদ দিয়ে সে জায়গায় প্রসথেটিক হাত লাগিয়ে নিতে রাজি হয়। যে হাত তাদের নিজস্ব স্নায়ু সঙ্কেত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। প্রসথেটিক হাত লাগানোর পর দেখা যায় যে তারা এই হাত লাগানোর আগে দৈনন্দিনের জিনিসপত্র নিয়ে যেভাবে কাজ করতে পারত তার চেয়ে অনেক ভালভাবে কাজ করতে পারছে। নতুন নতুন এসব প্রযুক্তি আমাদের দুর্বল ও ভগ্ন শরীরের পুনর্বাসনের পরিধানযোগ্য বায়োনিক পোশাক বা নরম রোবোটিক সরঞ্জামের এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

‘বায়োনিক’ শব্দটা শুনলেই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর নানান ছবি এসে উদয় হয়। কিন্তু আজ বায়োনিক ব্যবস্থাটি উত্তরোত্তর বাস্তব হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে বায়োনিক ব্যবস্থা বলতে বোঝায় বায়োলজি তথা মানবদেহের সঙ্গে প্রকৌশল ও রোবোটিক্সকে যুক্ত করা। বুড়ো হলে পায়ে আগের মতো জোর পাওয়া যায় না হাঁটতে গেলে টালমাটাল ভাব হয়। এমন মানুষের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে বায়োনিক এস্কোস্কেলিটন। সেটা আজ সম্ভবসাধ্য হয়ে উঠছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে অসুবিধা হচ্ছে? একজোড়া বায়োনিক পাওয়ার ট্রাউজার পরে একটা করে দেখতে পারেন। তবে এ মুহূর্তে এক সাইজের এক্সোস্কেলিটন অথবা বায়োনিক ট্রাউজারে সবার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তা নয়। কাজেই সর্বত্র প্রযোজ্য এ ধরনের বায়োনিক ব্যবস্থা তৈরির পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা হলো নানা ধরনের পরিস্থিতিতে সেগুলো ব্যবহার করতে চাওয়া এবং মানুষের শরীর ও আচরণে বড় রকমের পার্থক্য থাকা।

সূত্র : সায়েন্স ডেইলি