১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

অদ্ভুত দাঁড়কাক ॥ সায়েন্স ফিকশনে খ্যাতিমান ডায়না চেবিয়ানো


আর্জেন্টিনার গর্ডোশায়ার, স্পেনের ইলিয়া বার্সেলো এবং কিউবার ডায়না চেবিয়ানো এই তিনজনকে লাতিন আমেরিকার কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের ত্রিরতœ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই ত্রিরতেœর মাঝে ডায়না চেবিয়ানোর খ্যাতি শুধু কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের রচিয়তা হিসেবেই নয়, ঔপনাসিক, ছোট গল্পকার এবং কবি হিসেবেও। প্রথমে সায়েন্স ফিকশনের জন্য নিজ দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, পরে উপন্যাস ও ছোট গল্প লিখে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিকভাবে। তাঁর লেখার ধরন, স্টাইল, থিম এবং লেখার বিষয়বস্তুর অভিনবত্বই তাঁকে খ্যাতিমান একজন সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করে।

তাঁর অসামান্য কীর্তি মিথ এবং সায়েন্স ফিকশনের অভূতপূর্ব সম্মিলনে। মিথের অলৌকিক ক্ষমতা এবং সায়েন্স ফিকশনে বিজ্ঞানের শক্তি, এই দুইকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি একের পর এক ফিকশন রচনা করেছেন। সেই ফিকশনগুলোতে তিনি আবার ইতিহাসকেও নিয়ে এসেছেন। কারণ তিনি মিথ, বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের মাধ্যমে কিউবার সমাজ ব্যবস্থার হালচিত্রই শুধু দেখাতে চাননি। চেয়েছেন কিউবার অতীত ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যত পথ পরিক্রম সম্ভাবনাকেও দেখাতে। এক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন। অর্জন করেছেন বহুমাত্রিক জনপ্রিয়তা। তিনি কিউবান সাহিত্যের কয়েকজন বেস্ট সেলিং লেখকদের মধ্যে অন্যতম একজন।

খ্যাতিমান এই লেখিকা ১৯৬০ সালে কিউবায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পড়া জুলভার্ন, চার্লস প্যারেলট এবং ব্রাদার্স গ্রিমের বইগুলো তাঁকে সেই শৈশবেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহী করে তোলে। মাত্র নয় বছর বয়সেই তার লেখালেখির হাতেখড়ি। কাঁচা হাতে অনেক লেখাই লেখেন। সেসব লেখা প্রকাশিত না হলেও সেগুলোর মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হতে থাকে চেবিয়ানোর সৃজনশীল প্রতিভা। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে যখন লেখাপড়া করছিলেন তখন কিউবায় সায়েন্স ফিকশন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে সেখানে তিনি তাঁর লেখা কয়েকটি ছোট গল্পের সমন্বয়ে রচিত বই ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস আই লাভ’ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। বইটি প্রথম পুরস্কার জিতে নেয়। সেই সঙ্গে চেবিয়ানে লাভ করেন সেরা সায়েন্স ফিকশন রচিয়তার মর্যাদা। এই পুরস্কার লাভ তাকে পুরো কিউবায় জনপ্রিয় করে তোলে। তিনি কিউবান পাবলিক রেডিও এবং টেলিভিশনে সায়েন্স ফিকশনের প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন যা তাঁকে কিউবান শিশু-কিশোরদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে।

হাভানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যের ওপর ¯œাতক অর্জন করার পর তিনি কিউবাতে সায়েন্স ফিকশন লিটারেরি ওয়ার্কশপের আয়োজন করেন। এটি ছিল দেশটিতে আয়োজিত প্রথম কোন সায়েন্স ফিকশন লিটারেরি ওয়ার্কশপ। এই ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তিনি কিউবান সাহিত্যে ধারায় সায়েন্স ফিকশনকে জনপ্রিয় একটি ধারায় পরিণত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কিউবায় তিনি যতদিন ছিলেন ততদিন একের পর এক সায়েন্স ফিকশনধর্মী ছোট গল্পের বই, উপন্যাসিকা, উপন্যাস এমনকি ফিল্মের স্ক্রিপ্ট রচনা করেন। তাঁর রচিত প্রতিটি বই-ই কিউবায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং তিনি কিউবার অন্যতম খ্যাতিমান সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। কিন্তু ১৯৯১ সালে তিনি চিরতরে কিউবা ত্যাগ করেন। মাতৃভূমি ত্যাগ করার পেছনে তাঁর মূল যুক্তি ছিল লেখার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অভাব। লেখক হিসেবে তিনি যা বলতে চান তা বলতে না পারার বেদনা তাঁকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। কিউবায় লেখকদের লেখা সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ আরোপিত। অর্থাৎ সরকার কর্তৃক লেখাকে সেন্সর করা হয় এবং লেখার বিষয়বস্তুতে সরকারের নীতিবহির্ভূত কোন কিছু থাকা নিষেধ। লেখার এই বন্দিত্ব মেনে নিতে পারেননি চেবিয়ানো। যে লেখকরা সমাজের অসঙ্গতিকে লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরতে চান, তাঁদের পক্ষে লেখনীর বন্দিত্ব মেনে নেয়া শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও। চেবিয়ানোও পারেননি। পাড়ি জমান আমেরিকায়।

আমেরিকার মিয়ামীতে গাড়েন নতুন আবাস। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। সেই সঙ্গে অনুবাদকেরও কাজ করেন। মিয়ামীতে যাওয়ার পর থেকে চেবিয়ানোর মাঝে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন এসেছিল তা হলো, যে সায়েন্স ফিকশনের ধারা তাঁকে কিউবায় জনপ্রিয় করে তুলেছিল, সেই ধারা থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। সায়েন্স ফিকশনের পরিবর্তে তিনি গল্প, উপন্যাস ও কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি ‘ম্যান, ওম্যান এ্যান্ড হাঙ্গার’ বইটির জন্য স্পেনের এ্যাঝোরিন প্রাইজ লাভ করেন যা ছিল তাঁর সাহিত্যে রচনার প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এটি ছিল চেবিয়ানো প্রকাশিত দ্য অকাল্ট সাইড অব হাভানা সিরিজের প্রথম বই। সিরিজের অন্য বইগুলো হলো প্লে হাউস, এনক্লোজড ক্যাট এবং দ্য আইল্যান্ড অব ইটারনাল লাভ। এই সিরিজটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই সিরিজটিকে কিউবানদের ভাগ্যের উত্থান-পতন এবং সমাজ মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগযোগ্য উপলব্ধি প্রকাশের সবচেয়ে সৃজনশীল উপন্যাসভিত্তিক প্রোজেক্ট হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সিরিজের সবচেয়ে জনপ্রিয় বই অবশ্য ‘দ্য আইল্যান্ড অব ইটারনাল লাভ।’ বইটি বিশ্বের পঁচিশটি ভাষায় অনূদিত হয়। এটি ছিল কিউবান কোন সাহিত্যিকের সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত একটি বই।

গ্রীক, রোমান, মিসর, প্রাক কলম্বিয়ান এবং আফ্রো-কিউবান পৌরণিক আখ্যান তাঁর লেখনীকে প্রভাবিত করে। গিলগামেসের মহাকাব্য, মহাভারত, গুয়েতমালার দ্য পপল ভু মিথ, ওডেসির মতো মহান রচনাগুলোর প্রভাব চেবিয়ানোর লেখাতে বিদ্যমান। এছাড়া তাঁর লেখাতে মার্গারেট এ্যাটউড, মিলান কুন্ডেরা, আরসুলা কে.লে গুইন, রে ব্রাডবারি, উইলিয়াম শেক্সপিয়ার প্রমুখের লেখার প্রভাব দেখা যায়। তাঁর লেখায় এঁদের প্রভাব থাকলেও তিনি স্বতন্ত্রতা হারাননি। লেখনীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং শক্তির কারণেই খ্যাতিমান হয়েছেন তিনি। চেবিয়ানোর লেখার স্টাইলে কাব্যিক ঢঙের উপস্থিতি দেখা যায়। সায়েন্স ফিকশন, রিয়েলিজম, ম্যাজিক রিয়েলিজম যাই লেখুন না কেন, এমনভাবে তিনি বইয়ের কাহিনীকে উপস্থাপন করেন পাঠকের মনে হবে সে বই পড়ছে না, সিনেমা দেখছে।

ডায়না চেবিয়ানোর সাহিত্যেকর্মকে কিউবায় থাকাকালীন সাহিত্যে কর্ম এবং কিউবার সাহিত্যে কর্ম এই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেখানো যায়। কিউবায় থাকাকালীন তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য সাহিত্যে কর্মের মধ্যে ছোট গল্পের বই ‘দি ওয়ার্ল্ডস আই লাভ’ (১৯৮০), ‘লাভিং প্ল্যানেট’ (১৯৮৩) এবং ‘দ্য ট্রাফ অব দ্য ডায়নোসর’ (১৯৯০), উপন্যাস ‘ফেইরি টেইলস অব এ্যাডাল্টস’ (১৯৮৬), ‘ফ্যাবলস অব এ্যান এক্সট্রাটেরিনসিয়াল গ্রান্ডমাদার’ (১৯৮৮) এবং ফিল্ম স্ক্রিপ্ট ‘দ্য এ্যানানসিয়েশন’ (১৯৮৯) অন্যতম। কিউবায় থাকাকালীন চেবিয়ানো রচিত প্রতিটি বই সায়েন্স ফিকশনধর্মী। এই বইগুলোতে তিনি বিজ্ঞান আর পৌরণিক কাহিনীর সম্মিলনের মধ্যে দিয়ে সমকালীন কিউবার সমাজ বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার এক অপূর্ব রূপায়ণ ঘটে সেই সময়কার সাহিত্যে কর্মে।

পরবর্তীকালে কিউবা ছেড়ে চলে গেলে সাহিত্যে রচনার ধারায় পরিবর্তন আনেন। মিয়ামী ছিল তাঁর কাছে নতুন এক পৃথিবী। সেই পৃথিবীর জীবন ধারা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন নিয়ে আসে। মিয়ামী ছাড়াও ঘুরে বেড়িয়েছেন ইউরোপের অনেক শহর। এই ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে দিয়েই চেবিয়ানো জগতকে চেনেন। জানেন বিচিত্র মানুষের বিচিত্র জীবনধারা। এগুলোর মধ্যে দিয়েই যোগাড় করেন লেখার রসদ। ফলে কিউবা পরবর্তী লেখনীতে মানুষ ও মানুষের বিচিত্র জীবনধারা, চাওয়া-পাওয়া এবং সম্পর্কের জটিলতা প্রাধান্য পেতে থাকে। কিউবা পরবর্তী তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে কবিতার বই ‘ইরোটিক কনফেশনস এ্যান্ড আদার স্পেলস (১৯৯৪), ছোট গল্পে বই ‘ল্যান্ড অব ড্রাগনস’ (২০০১) উপন্যাস ‘প্লে হাউস’ (১৯৯৯), ‘ এনক্লোজড ক্যাট’ (২০০১), ‘দি ওয়ার্ল্ডস দ্যাট মাস্টার’ (২০০৪), দি আই ল্যান্ড অব ইটারনাল লাভ (২০০৬) অন্যতম। এই বইগুলো সায়েন্স ফিকশনধর্মী নয়, তবে মিথের উপস্থিতি প্রণিধানযোগ্য।

মিথ, ম্যাজিক রিয়েলিজম এবং রিয়েলিজমের মাধ্যমে তিনি মানব প্রকৃতিকে বিশেষায়িত করে দেখিয়েছেন। সহজাত প্রবৃত্তির সঙ্গে আধ্যাত্মিকতা, অলৌকিকতার সংযোগ স্থাপন করেছেন। এক সাক্ষাতকারে তিনি যদিও বলেছেন ‘আমার ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই’, কিন্তু তাঁর বেশিরভাগ রচনাতেই ম্যাজিক রিয়েলিজমের বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এই বিষয়ে তাঁর যুক্তি, ‘আমি ফিকশন এবং মিথকে প্রাধান্য দিয়ে অতিপ্রাকৃতিক বিষয়কে লেখায় নিয়ে আসি তখন হয়ত তা ম্যাজিক রিয়েলিজমধর্মী হয়ে ওঠে, তবে তা ম্যাজিক রিয়েলিজম থেকে ভিন্ন।’ চেবিয়ানোর যুক্তি অনুযায়ী তাঁর লেখাগুলো ম্যাজিক রিয়েলিজমকেন্দ্রিক না হলেও সেগুলোতে ফ্যান্টাসি ও সুপার ন্যাচারিলিজমের প্রাধান্য সেগুলো ম্যাজিকেল রিয়েলিজমের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

চেবিয়ানো সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য ফ্লোরিডা বুক এ্যাওয়ার্ড, গোলিয়ারডস ফ্যান্টাসি ইন্টারন্যাশনাল এ্যাওর্য়াড, এ্যাজরিন প্রাইস, আন্না শেগারস এ্যাওয়ার্ড, দ্য গোল্ডেন এইজ ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড, ডেভিড ন্যাশনাল প্রাইজ ইত্যাদি পুরস্কার অর্জন করেন। তিনিই প্রথম কিউবান সায়েন্স ফিকশন সাহিত্যিক যিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়েছেন। চেবিয়ানো সায়েন্স ফিকশন ধারা থেকে সরে এলেও এখনও তিনি এর জন্যই সারাবিশ্বে বেশি জনপ্রিয় বেশি খ্যাতিমান। এক সাক্ষাতকারে চেবিয়ানো আবারও সায়েন্স ফিকশন ধারায় ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন যা তাঁর সায়েন্স ফিকশন পাঠকবৃন্দকে আশ্বান্বিত করছে।