২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

শহীদ কবি মেহেরুননেসা ॥ কথা সত্যকথন


কবি মেহেরুননেসা ছিলেন আমার কবি বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহযোদ্ধা। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৭ সালের গোড়ার দিকে। আমার অনেক বন্ধু ছিল কিন্তু মেহেরুননেসা ছিলেন ব্যতিক্রমী। তাঁর সঙ্গে আমার নিঃস্বার্থ একটা আন্তরিক যোগাযোগ ছিল। আমরা উভয়েই থাকতাম অবাঙালী অধ্যুষিত এলাকা মিরপুরে। সভা সমিতি মিছিল আন্দোলন সবকিছুতেই আমরা গভীরভাবে জড়িত ছিলাম। মানুষ হিসেবে তাঁর তুলনা হয় না। তাঁর ছিল না কোন উচ্চাভিলাষ কিংবা অহংবোধ। অত্যন্ত সহজ, সরল, সাধারণ, পরিশ্রমী কর্মী এবং সৎ মানুষ ছিলেন তিনি।

স্মৃতিতে মেহের আমার ঘনিষ্ঠ আলোক থেকে ঝরে পড়া পূর্ণচন্দ্র ভালবাসা। ছিমছাম একটা ছোট সংসার ছিল তাঁর, সেখানে তাঁর বাবা-মা ও দুই ভাইসহ তিনি থাকতেন। যে ঘরে কবি বাস করতেন সেখানে ছিল একটি ছোট্ট চৌকি, একটি বইয়ের সেল্্ফ, একটি চেয়ার ও একটি টেবিল। তাঁর অনেক অভাব ছিল, তবে দরিদ্রের মধ্যে থেকেও কবি কখনও হতাশ হতেন না। সব সময়ই ছিলেন আশাবাদী। তিনি বলতেন, ‘দারিদ্র্য মানুষকে দুর্বল করে দেয়, তাই দারিদ্র্যতাতে কখনই গুরুত্ব দেয়া ঠিক নয়।’ তাঁর ছিল অপরিসীম ধৈর্য ও সাহস। ক্যান্সারে আক্রান্ত পিতাকে দীর্ঘদিন সেবা-যতœ দিয়েছেন হাসিমুখে।

কবি মেহেরুননেসা কখনই স্কুলের পাঠ নেননি। লেখাপড়া যেটুকু শিখেছেন তা তাঁর মা ও বড় বোনের সহায়তায় বর্ণ পরিচয় ও আদর্শলিপির মাধ্যমে। তবে অদম্য সাহস ও দুর্দান্ত মানসিকতা নিয়ে মাটি, সমাজ ও মানুষ বিষয়ে কবিতা রচনা করতেন ওই কবি।

এবারে তাঁর সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠার পাতাগুলো একটু উল্টেপাল্টে দেখতে চাই। জনকণ্ঠের সাহিত্য সম্পাদক আমাকে স্মৃতিবিজড়িত মেহেরুননেসার কথা ভিন্নমাত্রায় আলোকপাত করার অনুরোধ করেছেন। আমি বন্ধুর কথা নিয়ে শব্দ সাজাচ্ছিÑউচ্চারণ করছি।

মেহের মানে আমার কাছে আন্দোলন। মেহের মানে আমার কাছে সত্যের পথে পা বাড়ানো। মেহের মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ। মেহের মানে মানবিকতার প্রশ্নে আপোসহীন এগিয়ে যাওয়া। মেহের মানে শপথের অঙ্গীকারে নির্ভীক থাকা।

সেই মেহের যাঁর সঙ্গে রাত-বিরাতেও কাজ করতে কখনই পিছপা হইনি; ও যেন আমার সাহস ছিল। অবাঙালীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার কৌশল মেহেরই আমাকে শিখিয়েছিল। আমরা মিরপুরে ১৯৬৭ সালের দিকে এ্যাকশন কমিটি করেছিলাম। আমি সেই কমিটির সভাপতি ছিলাম। মেহের এবং মিরপুরের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্নজন সেই কমিটির সদস্য ছিলেন। পাকিস্তানী শোষকদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালীরা যখনই হরতাল করতে চেয়েছে অবাঙালীরা বাধা দিয়েছে। তারা দোকানপাট খুলে রেখেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রেখেছে।

ছোট্ট দুই-একটা ঘটনার কথা বলি। একদিক আমি ও মেহের গরুর হাটের দিকে এ্যাকশন কমিটির একটি সভায় যোগ দেয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলাম। একটু দূরে একটি দোকানে একটি ছোট্ট ছেলে পান-বিড়ি বিক্রি করছিল। কয়েকজন অবাঙালী সেখানে গিয়ে দোকানটি ভেঙ্গে ফেলল। ছেলেটিকে মেরে রাস্তায় ফেলে দিল। আমরা দুজনে ছেলেটির কাছে যেতেই হাউমাউ করে ও কেঁদে উঠল। আমরা সান্ত¡না দিলাম, সাহায্য দিলাম। মেহের শুধু বলল, ছেলেটির অপরাধ কীÑ শুধু বাংলায় কথা বলা!

আমরা দু’জনে আইসক্রিম ফ্যাক্টরি, লোহার ফ্যাক্টরি, গ্লাস ফ্যাক্টরিতে গিয়েছি। চেষ্টা করেছি সেখানে এক-দু’জন বাঙালী কর্মচারী নিয়োগ করার, কিন্তু পারিনি। আমরা বাজারের দোকানগুলোতে যেতাম সেখানে যেন এক-দু’জন বাঙালী কর্মচারী নিয়োগ করা যায়Ñ পারিনি। প্রতিনিয়ত প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে বসবাস করেছি আমরা।

এ্যাকশন কমিটি বাড়িয়ে দিলাম। অনেক ধরনের অত্যাচার অবিচার সহ্য করতে থাকলাম আমরা। কবি তখন অনেক প্রগতিশীল এবং জ্বালাময়ী কবিতা লিখলেন। লিখলেনÑ‘জনতা জেগেছে’, যার কিছুটা উচ্চারণ এরকমÑ‘মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা/দুরন্ত দুর্বার/সাত কোটি বীর জনতা জেগেছে/এ জয় বাংলার।’

এলো ১৯৭১ সাল। ৭ মার্চ। রেসকোর্সের ময়দান। বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানÑ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আমরা অভিভূত হলাম। বিমোহিত হলাম। বিস্মিত হলাম। বিশ্বস্ত হলাম। আমিও মেহেরের সঙ্গে সে দিনের অগণিত উপস্থিতি শিহরিত হয়েছিলাম। রক্তের ভেতর ছুঁয়ে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল। ঐতিহাসিক সেই জনসভা সে দিন একটি মূর্তিমান অঙ্গীকারের ভূমিকা নিল। ওই দিন মিরপুরে ফিরে আসার পর আমরা লক্ষ্য করলাম অবাঙালীদের ভিন্ন ধারার কর্মতৎপরতা।

মনে পড়ে, ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ মিরপুরে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। কবি মেহেরুননেসা তাঁর বাড়িতেও স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে ছিলেন। ওই পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে অবাঙালীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিবাদে জড়িয়ে পড়েন বাঙালীরা। শুরু হয় হানাহানি, কাটাকাটি, জ্বালাও-পোড়াও অভিযান, রক্তারক্তি ইত্যাদি বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। কবি মেহেরুননেসা ও তাঁর পরিবার তখন থেকেই বিশেষভাবে অবাঙালীদের টার্গেটে পরিণত হন। অন্যান্য অনেক বাঙালীই তখন থেকেই অবাঙালীদের রোষানলে পরিণত হয়।

মনে পড়ছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সকালের এ্যাকশন কমিটির উদ্যোগে শেষ চেষ্টা নেয়া হয় সুষ্ঠু সুন্দরভাবে থাকা সম্ভব কিনা। না, সেটা সম্ভব হলো না। বিকেল ৩টার দিকে মেহেরের বাড়িতে খবর দেয়া হলোÑ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু দুই ভাই ও মাকে ফেলে রেখে তিনি কিছুতেই সরে যেতে পারলেন না।

২৫ মার্চের রাতে বাংলার মাটিতে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মিরপুরে শুরু করেছে অবাঙালীরা। বাঙালী হত্যার নারকীয় ঘটনা। ২৭ মার্চ সকালে বেশ কয়েকজন অবাঙালী মাথায় সাদা ও লালপট্টি বেঁধে হাতে রামদা, তলোয়ার এবং চাকু ছুরি নিয়ে মেহেরুননেসার বাড়ি আক্রমণ করল।

আমি তখন সেখানে ছিলাম না। শুনেছি, মেহেরুননেসা কিংবা তাঁর মা বুকে কোরআন চেপে বলেছিলেনÑ ‘আমরা তো মুসলমান, কলমা জানি, আমাদের মারবে কেন?’ ওরা শোনেনি কবির দুই ভাই, তাঁর মা এবং কবিকে ওরা জবাই করেছিল। ওদের অপরাধ ওরা বাঙালী। ওদের প্রত্যয়ী উচ্চারণ ও বীভৎসতা দেখে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিলেন, ‘জীবনে কোনদিন এমন নৃশংসতা ও নির্মমতা দেখিনি। মেহেরুননেসার মস্তকবিহীন দেহ কাটা মুরগির মতো ছটফট করেছে। আমি দীর্ঘদিন ভাত খেতে পারিনি।’

এ সব কথা যখনই আমি শুনেছি, মাটি ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলামÑ আমি কি কোনদিন এর প্রতিবাদ করতে পারব না! যে মেহেরের হাতে মেহেদী পড়েনি তাঁর কথা বিবৃতিতে জানতে পারব না!

মেহের, তোমার স্মৃতির কথা উচ্চারণ করতে গিয়ে আজ বলতে পারিÑ স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আমরা সে সুযোগ পেয়েছি। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল পেয়েছি। মামলা রুজ্জু করতে পেরেছি, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পেরেছি, বিচারের রায় বাস্তবায়ন করতে পেরেছি।

মেহের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে আমি সাক্ষী দিয়েছি কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে তোমার পক্ষ নিয়ে। অপরাধী শাস্তি পেয়েছে মৃত্যুদ-। আমি জানি, সকল শহীদের আত্ম শান্তি পেয়েছে। মেহের, তোমার আত্মা, তোমাদের আত্মা সকলের আত্মার সঙ্গে আমি একাত্ম হয়ে আছি।