ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

নতুন ভূমিকায় সফল ঋতুপর্ণা

রুমেল খান

প্রকাশিত: ০০:৫৮, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩

নতুন ভূমিকায় সফল ঋতুপর্ণা

জাতীয় দলের কৃতী ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা

শুধু রূপই নয়, গুণও আছে তার। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২০ বছর পূর্ণ হবে এই তন্বী তনুলতার। নাম তার ঋতুপর্ণা চাকমা। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের আক্রমণভাগের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন তিনি। এর আগে খেলেছেন অনূর্ধ্ব-১৭ এবং অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে। জাতীয় দলে অভিষেক ২০২১ সালে। দেখতে দেখতে এ পর্যন্ত খেলে ফেলেছেন ১৮টি ম্যাচ। গোল করেছেন ৪টি, যার দুটিই করেছেন গত সোমবার, ফিফা প্রীতি ম্যাচে, সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে, যা তার ক্যারিয়ারে এই প্রথম। এর আগে ঋতুপর্ণা খেলতেন বদলি হিসেবে। কেননা ফরোয়ার্ড লাইনে সাবিনা, স্বপ্না, কৃষ্ণা, মৌসুমী, তহুরার মতো খেলোয়াড়রা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।

ফলে সেখানে প্রথম একাদশে সুযোগ করে নেওয়াটা খুবই কঠিন ছিল রাঙ্গামাটির মেয়ে ঋতুপর্ণার জন্য। আগের ১৬ ম্যাচেই বদলি হিসেবে খেলে দুটি গোলও করেছিলেন। সেগুলো ২০২২ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তান ও ভুটানের বিরুদ্ধে। এবার সিঙ্গাপুরের সঙ্গে দুটি ম্যাচেই প্রথম একাদশে খেলতে দেখা গেছে ঋতুকে। সেই সঙ্গে নতুন ভূমিকাতেও দেখা গেছে এই সুদর্শনাকে। সেটা হলো নিখাদ স্ট্রাইকার পজিশনে। আগে খেলতেন লেফট উইঙ্গার হিসেবে। মূলত আরেক ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকারের ইনজুরির কারণেই ঋতুপর্ণাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন কোচ সাইফুল বারী টিটু।

দ্রোণাচার্যের এই আস্থার প্রতিদান বেশ ভালোভাবেই দিয়েছেন তিনি। দুই ম্যাচে করেছেন দুই গোল এবং করেছেন দুটি এসিস্টও। ঋতুপর্ণার খেলা দর্শকদের বেশ মুগ্ধ করেছে। বল নিয়ে ড্রিবলিং বা আক্রমণ করার সময় গ্যালারি থেকে দর্শকরা তার নাম ধরে ডেকেছে, যা ছিল ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। বিষয়টা ঋতুপর্ণাও বেশ উপভোগ করেছেন। খেলা শেষে গ্যালারির দর্শকদের অনুরোধে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে তাদের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন! দিন দিন ক্রমেই বেড়ে চলেছে ঋতুপর্ণার ভক্ত-সমর্থক-অনুরাগীর সংখ্যা। সেই সঙ্গে নিজেকে আরও শাণিত করছেন, অপরিহার্য হয়ে উঠছেন জাতীয় দলের জন্য। সোমবারের ম্যাচে অবশ্য হ্যাটট্রিক করতে পারেননি।

কিন্তু তাই বলে কোনো আক্ষেপ নেই তার। বরং দল জিতেছে বলেই চিত্তসুখ পেয়েছেন বেশি। কদিন আগেই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন ঋতুপর্ণা। ফুটবল খেলা ছাড়াও আরেকটা বিষয়ে বেশ জনপ্রিয় এই পাহাড়ীকন্যা। সেটা হচ্ছে তার বাহারি চুলের স্টাইল! জেঠিমা নিলোবানু চাকমা বাংলা সিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করতেন। ভারতের কলকাতার নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তার অন্ধভক্ত তিনি। ২০০৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর যখন তার ভাইয়ের একটি ফুটফুটে মেয়ে হলো, তিনি তখন মায়াকাড়া চেহারার ওই শিশুকন্যার নাম রাখলেন ঋতুপর্ণা চাকমা।

জেঠিমার হয়তো সুপ্ত বাসনা ছিল- একদিন তার ভাতিজি নামকরা নায়িকা হবে। সময়ের পরিক্রমায় ঋতুপর্ণা নামকরা হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নায়িকা নয়, ফুটবলার! তা ছাড়া ঋতুর নিজেরও নায়িকা হওয়ার কোনো বাসনা নেই। সিনেমার জগৎ তার একদমই ভালো লাগে না। তা ছাড়া নায়িকা হলে তো এখানে (ফুটবল জগতে) আর থাকতেন না।

বাবার উৎসাহেই ফুটবল জগতে আসা ঋতুর। যখন খেলা শুরু করেন, তখন ঋতুর এলাকার লোকজন তার ফুটবল খেলা নিয়ে নেতিবাচক কথা বলত। এদিকে অভাব-অনটনের সংসার। তবে কৃষক বাবা বরজ বাঁশি চাকমা মেয়েকে সমর্থন-উৎসাহ দিতেন। মেয়েকে ধার করে খেলতে যাবার যাতায়াত ভাড়া এনে দিতেন অনেক কষ্টে। বাবার স্বপ্ন ছিল, মেয়ে একদিন জাতীয় দলে খেলবে। ঠিকই খেলেছে তার মেয়ে। কিন্তু সেটা তিনি দেখে যেতে পারেননি। ২০১৫ সালে মারা যান তিনি। এই আক্ষেপে এখনো আছে ঋতুর! ২০১২ সালের ঘটনা। পড়েন তৃতীয় শ্রেণিতে। বয়স মাত্র ৯। ওই বয়সেই মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে খেলে ফেললেন বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল। সেবার তার স্কুল রানার্সআপ হয়েছিল।

এর পরের দুবছরও খেলেন। ২০১৩ আসরে তার স্কুল হয়েছিল তৃতীয়। ভালো খেলার সুবাদে ২০১৭ সালে জাতীয় অ-১৫ দলে ডাক পান। এরপর অ-১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ দলে খেলেন। গৃহিণী মা বোজপুতি চাকমার ৪ মেয়ে, ১ ছেলের মধ্যে ঋতু চতুর্থ। তার প্রিয় ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো, থিয়াগো সিলভা, সাবিনা খাতুন ও মনিকা চাকমা ও মারিয়া মান্দা। বাঁ পায়ের ফুটবলশৈলীতে সবাইকে মুগ্ধ করা ঋতুর লক্ষ্য জাতীয় দলের হয়ে আরও শিরোপা জেতা। কৃষ্ণার পরিবর্তে নতুন পজিশনে সুযোগ পাওয়া এবং প্রথম একাদশে জায়গা করে নেয়া নেয়া ঋতুপর্ণা আগামীতে কেমন খেলেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

×