ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

অর্জন কোন পথে

আহমদ রফিক

প্রকাশিত: ২২:৩১, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

অর্জন কোন পথে

বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে প্রধানত বিত্তবান নব্যধনিক ও বণিক শ্রেণি

বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে প্রধানত বিত্তবান নব্যধনিক ও বণিক শ্রেণি, উচ্চস্তরের আমলা ও অনুরূপ পেশাজীবী শ্রেণি এবং তাদের প্রতিনিধি রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্র। সামরিক আমলাতন্ত্রও এর বাইরে নয়। এদের সমর্থনেই রাজনীতিকদের দেশ শাসন। এদের সঙ্গে রয়েছে সামরিক আমলাতন্ত্র ও পেশাজীবী শ্রেণির সমর্থন

আমাদের ভাষিক আচরণে বাঙালিয়ানার প্রকাশ ঘটে গতানুগতিকতার ঐতিহ্য মেনে। এর প্রধান প্রকাশ বাংলা একাডেমিতে প্রবন্ধ পাঠের অনুষ্ঠানমালায় এবং বইমেলার আয়োজনে এবং সন্ধ্যায় কথিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অর্থাৎ সংগীত পরিবেশনে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এ মাসে বিশেষ তৎপরতায় সক্রিয় হয়ে ওঠে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যমূলক তৎপরতায়।
এ উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গে বিশেষত কলকাতার শিক্ষিত মহলে আমাদের মান ইজ্জত অনেক উঁচু তারে বাধা। ‘ওরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে’ ইত্যাদি প্রশংসাসূচক বাক্যের উচ্চারণে তারা সর্বদাই আমাদের চিত্তরসসিক্ত করে রাখে। গর্ব ও অহংকারের জায়গাটা স্ফিত হয়ে ওঠে। এমনকি স্বদেশের পরিম-লেও একটি মাস আমাদের অহংবোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতি সেখানে সুগন্ধী ফুলের পাপড়ি ছড়ায়। 
কিন্তু এসবে নিহিত বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতার দিকগুলো, বিশেষ করে অর্জনের পাশাপাশি বিসর্জন নিয়ে আমরা কেউই ভাবি না। ব্যাখ্যা বিচারে পটু কলকাতার বিদগ্ধজন কাউকে সেদিকে তর্জনি নির্দেশ করতে দেখা যায় না। কেউ লেখেন না বা বলেন না ‘স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলা স্বীকৃতি পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিসর্জিত। যেমন উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে এবং উচ্চ আদালতে ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজীরই একচেটিয়া প্রাধান্য। কই, রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে তো সেখানে দেখা যায় না।’
আর আমাদের স্বদেশে ফেব্রুয়ারিতে এই বৈপরীত্য নিয়ে মাঝে মধ্যে টিভির টকশোতে আলোচনা এবং পত্রিকায় প্রবন্ধাদি লেখা হলেও এগুলোর প্রভাব হাওয়ায় উড়ে চলে যায়। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি এসব সমালোচনা বা দাবি-দাওয়া উড়িয়ে দেয়। উচ্চশিক্ষিত শ্রেণি এবং শিক্ষায়তনিক এলিট শ্রেণি ভাষাভিত্তিক সমালোচনা কানে নিলেও মাথার ভেতরে নেয় না। গতানুগতিকতায় ও আনুষ্ঠানিকতায় গর্ব ও অহংকারের মধ্যে একুশের মাসটি বিদায় নেয় বছরের পরবর্তী ১১ মাস ঘুমিয়ে কাটাবে বলে।

॥ দুই ॥
অথচ এই ভাষা আন্দোলন অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যে দিয়ে সংঘটিত হয়েছে, অনেক ত্যাগ অনেক নির্যাতন সহ্য করে এর পথচলা, কোথাও মৃত্যু বা জেল-জুলুমের সঙ্গী। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-এ আন্দোলনের জনক। আন্দোলনের মূল নেতা থেকে কর্মী পর্যায়ে অনেকের শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। উত্তরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে পশ্চিম প্রান্তের মেহেরপুরে আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট একাধিক ছাত্রের জীবন তেমন পরিচয়ই দেয়।

আসলে ভাষা আন্দোলন, বিশেষ করে ১৯৫২ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন এমন এক জাতীয় চরিত্রের আন্দোলন যা পূর্ববঙ্গের তৎকালীন জেলা শহর, মহকুমা শহর হয়ে থানা-ইউনিয়ন, এমনকি গ্রামের শিক্ষায়তন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। এর ব্যাপকতা শাসকশ্রেণির কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। সরকারি দমননীতি এর দূর প্রান্তিক অবস্থানকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিতে পারেনি।
এর সূচনা শিক্ষায়তনকেন্দ্রিক ছাত্রসমাজ থেকে শিক্ষিত সমাজে প্রসারিত হয়েই নিশ্চল থাকেনি, অন্তত স্পর্শ করেছে দূরগঞ্জ ও গ্রাম-গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে। আর সে কারণেই দু’বছর পর দেখা যায় প্রাদেশিক সাধারণ নির্বাচনে শাসক শ্রেণির লজ্জাজনক পরাজয়, পূর্ব বাংলার মাটি থেকে স্বৈরাচারী শাসক মুসলিম লীগের উচ্ছেদ।
রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এ আন্দোলন শুধু দেশের ছাত্রসমাজকেই উদ্দীপ্ত করেনি, গোটা প্রদেশব্যাপী জনমানসকেও স্পর্শ করেছে মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধে, উদ্দীপ্ত করেছে জাতীয়তাবাদী চেতনা যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে সহায়ক হয়েছে। গঠিত হয়েছে ভাষিক জাতিরাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। চরিত্রবিচারে ১৯৫২ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন একটি বিশাল গণজাগরণ যেন।
এ বিশালত্ব ছিল শ্রেণি নির্বিশেষ, অর্থাৎ ছাত্রসমাজের হাতে আন্দোলনের সূচনা হলেও এতে অংশ নিয়েছে কমবেশি সব শ্রেণির মানুষ, এমনকি নিম্নবর্গীয় ও শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ। মিছিলে মিছিলে ছাত্রদের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘সর্বস্তরে বাংলা চাই’ সেøাগানের লক্ষ্য ছিল নিম্নবর্গীয় মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ। ছিল তাদের শিক্ষার অধিকার সম্পর্কিত দাবি যা তাদের অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নতির সহায়ক হতে পারে। শিক্ষা ব্যতিরেকে আর্থ-সামাজিক উন্নতি যে অসম্ভব এ সত্য সবাই বোঝে, বিশেষ করে শিক্ষিত শ্রেণি।

॥ তিন ॥
বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, মূলত সাধারণ জনশ্রেণির দুর্ভাগ্য যে ভাষা আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন সবই পরিচালিত হয়েছে শিক্ষিত শ্রেণির হাত ধরে। রাজনীতির দড়িদড়া, তার শক্তি-সামর্থ্য সবই পূর্বোক্ত শিক্ষিত শ্রেণি তথা ভদ্রলোক শ্রেণির হাতে। তাই একুশ এবং একাত্তরের অর্জন ও সুফল সবই এই শ্রেণি বিশেষের স্বার্থই পূরণ করেছে এবং করে চলেছে। কথিত অমৃতের ভোগে এদেরই একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে প্রধানত বিত্তবান নব্যধনিক ও বণিক শ্রেণি, উচ্চস্তরের আমলা ও অনুরূপ পেশাজীবী শ্রেণি এবং তাদের প্রতিনিধি রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্র। সামরিক আমলাতন্ত্রও এর বাইরে নয়। এদের সমর্থনেই রাজনীতিকদের দেশ শাসন। এদের সঙ্গে রয়েছে সামরিক আমলাতন্ত্র ও পেশাজীবী শ্রেণির সমর্থন। শ্রেণি বিভাজনের রাজনৈতিক নিয়ম মেনে একই যাত্রায় দলীয় স্বার্থে বিভাজিত সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী বৃহত্তর অর্থে বুদ্ধিজীবী তথা শিক্ষিত উপশ্রেণির সদস্য তথা লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী প্রমুখ। এরাই সমাজের প্রভাবক শ্রেণি। এদের স্বার্থেই রাষ্ট্রিক স্বার্থের প্রকাশ।

এরাই একসময় অর্থাৎ আন্দোলন ও লড়াইয়ের সময় জাতিসত্তার নিরিখে ভাষিক চেতনা, জাতীয়তাবাদী চেতনা ধারণ করেছে। সর্বজনীন জাতীয়তার স্লোগান তুলে জনসসাধারণের সমর্থন আদায় করেছে। মাঠ-ময়দান গরম করেছে বাঙালি স্বার্থের পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে, সেøাগান দিয়ে। স্বার্থপূরণের পর সর্বজনীন স্বার্থের সেøাগান এদের কাছে অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
তাই সংবিধানে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা’ এই উচ্চারণ সত্ত্বেও এর তাৎপর্য বাস্তবায়নের অপেক্ষায় বসে আছে। স্বভাবতই জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষায় মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি। জীবিকার সঙ্গে মাতৃভাষার কোনো সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়নি। কাজেই বিশাল নিম্নবিত্ত ও নিম্নবর্গীয় মানুষ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতির বৃহত্তর অংশ যুক্তিহীনভাবে বঞ্চিত বলে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে; এমনকি উচ্চ আদালতে শিক্ষাহীন মানুষ নিজ স্বার্থ আদায় করে নিতে পারছে না। তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির ওপর। আর এই সুবিধাভোগী মধ্যশ্রেণি অশিক্ষিত শ্রেণির মাথায় হাত বুলিয়ে, তাদের শিক্ষাহীনতার সুযোগ নিয়ে তাদের শোষণ করছে। এ শোষণের মাত্রা কোনোদিক থেকে কোনো অংশে কম নয়।
এ শোষণের ধারা অব্যাহত রাখতে সুবিধাবাদী শ্রেণিগুলো ঔপনিবেশিক রাজভাষাকে শোষণের যন্ত্র হিসেবে রেখে দিয়েছে। আর সে সুযোগ কাজে লাগাতে বিত্তবান শ্রেণির সন্তানদের জন্য তৈরি করেছে দুর্মূল্য শিক্ষাব্যবস্থা যা নিম্নবিত্ত থেকে সর্বনিম্ন শ্রেণির সন্তানদের জন্য সোনার হরিণের মতোই। এভাবে অর্থনৈতিক ধারায় বাঙালি সমাজ বিভাজিত হয়ে পড়েছে। জাতীয় সংহতির বলিদান শ্রেণি বিভাজনের বাড়ি কাঠে।

অন্যদিকে শিক্ষার্থী সমাজ মোটাদাগে বাংলা মাধ্যম, আরবী মাধ্যম ও ইংরেজি মাধ্যমের ত্রিধারায় বিভাজিত। ব্যয়বহুল দুর্মূল্য ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষা শুধুই উচ্চমধ্যবিত্ত ও বিত্তবান শ্রেণি, বাংলা মাধ্যম মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মাদ্রাসা শিক্ষা দরিদ্র শ্রেণির সন্তানদের জন্য প্রায় ধরাবাধা বললে চলে। আর সে হিসেবে এদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠন।
এক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও বাংলা মাধ্যম ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। যদিও রাষ্ট্রিক বিচারে বাংলা প্রজাতন্ত্রে ভাষা হিসেবে স্বীকৃত কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে শক্তিমান ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণির আচরণে ও চাপে বাংলার অবস্থান ক্রমে দুর্বল হতে চলেছে। ইদানীং শিক্ষাক্রমে ইংলিশ ভার্সন, বাংলাকে শিক্ষাঙ্গনে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। 
এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো বর্তমান প্রেক্ষাপটে রীতিমতো কঠিন কাজ। রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রেণিগত পরিবর্তন ভিন্ন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সে পরিবর্তন ঘটাতে শ্রেণি সংগ্রাম একমাত্র উপায়। এর বাইরে দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা আছে বলে।

×