মুজিব না থাকলে বাংলাদেশের কখনই জন্ম হতো না। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্বকে এভাবেই মূল্যায়ন করেছিল বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। যথার্থই মূল্যায়ন। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম-ত্যাগ-তিতিক্ষা আর দক্ষ নেতৃত্বের কারণেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে সগৌরবে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ নামক ভূখণ্ডটি স্থান করে নিয়েছিল। অথচ মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সেই নেতাকে সপরিবারে এদেশেরই আলো হাওয়ায় বেড়ে ওঠা কুলাঙ্গার সন্তানরা নৃশংসভাবে হত্যা করে এদেশের মানচিত্রে এঁকে দিয়েছিল কলঙ্কের তিলক। নোবেল বিজয়ী উইলি ব্রান্ট তাই বলেছিলেন, ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালীদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে।’ এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সোনার বাংলা পরিণত হয়েছিল অভিশপ্ত এক নরকপুরীতে, আর বিশ্ব হারিয়েছিল এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে। ফিদেল ক্যাস্ট্রো তাই আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’ ব্রিটিশ এমপি জেমসলামন্ডের কণ্ঠেও ফুটে উঠে গভীর হতাশা। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কেবল বাংলাদেশই এতিম হয়ে যায়নি, বিশ্ববাসীও হারিয়েছে তার এক মহান সন্তানকে।’...
পৃথিবীতে যত বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, বর্বরতার দিক দিয়ে সেগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে পনেরোই আগস্টের হত্যাকাণ্ড। খন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান, ডেভিড ইউজিন বোস্টার, তাহেরুদ্দিন ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষী, শাহ মোয়াজ্জেমদের মতো ষড়যন্ত্রীদের ক্রীড়নক রশিদ-ফারুক গং ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িতে সেই রাতে মেতে উঠেছিল পিতৃবধের উল্লাসে। ভোরের আযানের আগেই তারা শুরু করে দিয়েছিল অঝোর ধারায় গোলাগুলি। ঐ সময় দোতলা থেকে নিচে নেমে এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল। আর মুহূর্তেই স্টেনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান তিনি। বঙ্গবন্ধু সিঁড়ির শেষ ধাপে আসতে না আসতেই গর্জে ওঠে নূর, মোসলেম উদ্দিনের রাইফেল। আঠারোটি বুলেটে বিদ্ধ হয়ে গড়িয়ে পড়েন সাদা পাঞ্জাবি আর চেক লুঙ্গি পরিহিত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাংলাদেশের স্থপতি, আমাদের পিতা; যিনি সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, ঊনসত্তর, সত্তর এবং একাত্তরসহ বিভিন্ন সময়ে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য মৃত্যুর দ্বার হতে বারে বারে ফিরে এসেছিলেন, সেই তাঁকেই পাকিস্তানী হায়েনারা যা করতে পারেনি, সেটাই করল তাঁরই দেশের পাপিষ্ঠ নরাধম কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক খুনী। এজন্য শামসুর রাহমান তাঁর ‘ইলেকট্রার গান’ কবিতায় লেখেনÑ ‘নন্দিত সেই নায়ক অমোঘ নিয়তির টানে/গরীয়ান এক প্রাসাদের মতো বিপুল গেলেন ধসে।/বিদেশী মাটিতে ঝরেনি রক্ত; নিজ বাসভূমে,/নিজ বাসগৃহে নিরস্ত্র তাঁকে সহসা হেনেছে ওরা।’ এ নিয়ে কবি রফিক আজাদ তাঁর ‘এই সিঁড়ি’ কবিতায় লেখেছেনÑ ‘এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,/ সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে,/ বত্রিশ নম্বর থেকে/ সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে/ অমল রক্তের ধারা বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেও ক্ষান্ত হলো না খুনীরা। বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের ঝাণ্ডাবাহকদের নির্মূল করতে জুড়ে দিয়েছিল হত্যার নৃত্য। বত্রিশ নম্বরের প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করে নিমর্মভাবে হত্যা করেছিল শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল, রাসেল, দুই পুত্রবধূ আর ভাই শেখ নাসেরকে। চারদিকে বীভৎস দৃশ্য। সেই বীভৎসতা, সেই নৃশংসতা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো বিশ্ববাসী। অন্নদা শংকর রায় তাই ব্যথিত হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে কবিতায় লেখেনÑ নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরও বড়/ করে যদি তাঁর পুত্রসম বিশ্বাসভাজন/ জাতির জনক যিনি অতর্কিতে তাঁরেই নিধন/নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরও গুরুতর।’
পনেরোই আগস্টের কলংকিত ইতিহাস আরও কলংকিত হয়ে উঠেছিল যখন বাঙালীর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতার হত্যাকারীদের বাঁচাতে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশে দুটি ভাগ। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রীমকোর্টসহ কোন আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোন আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। আর দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোন আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোন আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। এরপর ক্ষমতায় এসে জিয়া সেই অধ্যাদেশকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনী বৈধতা দেয়। এভাবেই ষড়যন্ত্রের বশবর্তী হয়ে মোস্তাক, জিয়া, সাত্তার, এরশাদ এবং খালেদা বঙ্গবন্ধুর হন্তারকদের রক্ষা করার ষোলোকলা পূর্ণ করে। শুধু কি তাই? তারা ঐ খুনী চক্রকে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে গুরুত্বপূর্র্ণ পদ অধিষ্ঠিত করে যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তাই আক্ষেপ নিয়ে আখতারুজ্জামান আজাদ তাঁর বাঙালী, একটি ফিনিক্সপাখি কবিতায় লেখেনÑ ‘পরাজিত শক্তি যখন হেঁটে বেড়ায় বিজয়ীর বেশে,/যখন ফুলেরা কাঁদে, হায়েনারা হাসে;/ যখন মানুষ ঘুমায়, পশুরা জাগে;/তখন আমার ঠিকানায় আসে সেই পুরনো পত্র,/ তখন আমার কানে ভাসে সেই পুরনো ছত্র/ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম!/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!/ জয় বাংলা!।’
বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে বুকে ধারণ করে দীর্ঘ একুশ বছরের সংগ্রাম শেষে ছিয়ানব্বইতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হলে শুরু হয়ে যায় অভিশপ্ততার হাত থেকে মুক্তির দুয়ার। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিভিন্ন দূতাবাসের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। বাতিল করা হয় ঐ কুখ্যাত ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশ, যার ফলে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার করতে আর কোন বাধাই থাকল না। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী প্রয়াত আ ফ ম মুহিতুল ইসলাম ধানমণ্ডি থানায় সেই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চব্বিশজন আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেন। চার আসামি মারা যাওয়ায় ঢাকার দায়রা জজ আদালতে বিশজনের বিরুদ্ধে ওই মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছিল সাতানব্বই সালে। দেড়শ কর্মদিবসের শুনানি শেষে এরপরের বছর দায়রা জজ গোলাম রসুল পনেরো জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। ওই রায়ের আপীল, শুনানি, দ্বিধাবিভক্ত রায় ইত্যকার নানা প্রক্রিয়া চলার মাঝেই ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু খুনের ষড়যন্ত্রকারী জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরিরা ক্ষমতায় চলে এসেছিল। আর স্বাভাবিকভাবেই স্থগিত হয়ে গিয়েছিল সেই বিচার প্রক্রিয়া। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘লিভ টু আপীলের’ শুনানি শুরু হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতির অভাবে বিচার প্রক্রিয়া থমকে দাঁড়িয়েছিল। নবম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অবশেষে খুলে গিয়েছিল সকল সমস্যার জট। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান আপীল বিভাগে চারজন বিচারপতিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপীল বিভাগে ঊনত্রিশ কর্মদিবসের শুনানি শেষে আসামিদের আপীল খারিজ করে বারো আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল। ঐ দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে পাঁচজনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছিল। কিছুটা কলঙ্কমুক্তির সেই তারিখটি ছিল ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি। রাত বারোটা এক মিনিটে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে আর্টিলারি কোরের অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মহিউদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর বজলুল হুদার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। রাত সাড়ে বারোটার পর ফাঁসি দেয়া হয় বরখাস্ত হওয়া কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানকে এবং সবশেষে ল্যান্সার ইউনিটের অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিনকে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল বাঙালী জাতির ললাটে আঁকা কলঙ্কচিহ্ন মুছে দেয়ার প্রক্রিয়া; কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছিল বাঙালীর মনে দাউ দাউ করে জ্বলা প্রতিশোধের আগুন। কিন্তু নিভে যায়নি তা পুরোপুরি। এজন্যই সৈয়দ শামসুল হক তাঁর পনেরো আগস্ট কবিতায় লেখেনÑ তোমার নিকটে ছিল যারা সেইসব তোমার খুনীরা/ তারা কি বাঙালী ছিল?/ না কি কোন ষড়যন্ত্রী দেশের সেবক?/ সাম্রাজ্যবাদের কাছে নিজেদের বিকিয়েছে যারা/ আমাদের ভাই নয় তারা/ আমাদের জাতিসত্তা প্রেম আর ঐতিহ্যের হাজারো কাহিনী/ ভুলে গিয়ে তারা সব বিদেশের সেবক হয়েছে!/ আমার সমস্ত ঘৃণা থুথু আর বুকের আগুন/ বাঙালী নামক সেই ঘৃণ্য সব খুনীদের প্রতি।/ তীব্র প্রতিশোধ আমি ছুড়ে দেই খুনীদের মুখে/ দ্যাখো, আগুন জ্বলছে আজ শুদ্ধ সব বাঙালীর বুকে/।
বাঙালীর বুকের এই আগুন নিভবে কেবল তখনই যখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য খুনীদেরও ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হবে। তখনই কেবল সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত হবে এদেশ। খুনীদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আজিজ পাশা জিম্বাবুইয়েতে মারা গেছে। বাকি ছয় আসামি এখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ পাকিস্তানে অথবা লিবিয়ার বেনগাজীতে, লে. কর্নেল নূর চৌধুরী কানাডায়, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম কেনিয়া, লিবিয়া অথবা পাকিস্তানে, রিসালদার মোসলেমউদ্দিন থাইল্যান্ডে বা জার্মানিতে, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল এম এ রাশেদ চৌধুরী আমেরিকায় এবং অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ কেনিয়ায় অথবা ভারতে অবস্থান করছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা। এই খুনীরা প্রতিনিয়ত জায়গা পরিবর্তন করে আত্মগোপনে থাকায় তাদের ধরা যাচ্ছে না। এদের গ্রেফতারের জন্য দেড় যুগ ধরে ইন্টারপোলে রেড নোটিস ঝুলছে। তবু চতুর এসব খুনীরা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার থেমে নেই। নানা বাধা-বিঘœ পেরিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এদের এদেশে ফিরিয়ে আনতে। এজন্য গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স কাজ করে যাচ্ছে। ল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। খুনীদের ছবি সংবলিত তথ্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এদের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াফত করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। এত কিছুর পরেও বাঙালীর ললাটে কলঙ্কের দাগ, রক্তের দাগ মুছে যায়নি। এখনও দেশের মানুষের তপ্ত হৃদয়ে বইছে ক্ষোভের বহ্নি শিখা। এদেরকে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড দিলেই কেবল সেই দাগ মুছবে, নিভবে ক্ষোভের বহ্নি শিখা এবং তখনই শোধ হবে রক্তঋণ।
লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

