ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩২

লবণাক্ত মাটিতে সবুজ বিপ্লব

শাহরিয়ার কবির,পাইকগাছা (খুলনা) 

প্রকাশিত: ১৬:১৩, ২০ মার্চ ২০২৬

লবণাক্ত মাটিতে সবুজ বিপ্লব

উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমি যেখানে দীর্ঘদিন ধরে কৃষকের হতাশার কারণ, সেখানে পাইকগাছার এক কৃষকের হাত ধরে দেখা মিলেছে আশার আলো। পরীক্ষামূলক বার্লি চাষে মিলেছে সফলতা, যা পুরো এলাকার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

রবি মৌসুমে উপকূলীয় বাংলাদেশের অনেক জমিই লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি পড়ে থাকে। সূর্যের তীব্রতা, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা নোনা পানি এবং পর্যাপ্ত সেচের অভাব—সব মিলিয়ে কৃষকদের জন্য চাষাবাদ হয়ে ওঠে কঠিন চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় পাইকগাছার কপিলমুনি ইউনিয়নের কাজীমুছা গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম দেখিয়েছেন ভিন্ন পথ।

মাত্র ১৬ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বার্লি চাষ করে তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো এলাকার কৃষকদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। তার খেতে এখন সবুজ বার্লি গাছ আর দুলছে শীষ, যা স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, “শুরুতে মনে হয়েছিল, এই লবণাক্ত মাটিতে কিছুই হবে না। কিন্তু এখন ফলন দেখে আমি নিজেই অবাক। আশেপাশের কৃষকরাও খেত দেখতে আসছেন, অনেকেই আগামী মৌসুমে চাষ করার পরিকল্পনা করছেন।”

তার খেতে চাষ করা হয়েছে বার্লির দুটি উন্নত জাত—বারি বার্লি-৭ এবং বারি বার্লি-১০। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বারি বার্লি-১০ লবণাক্ত জমির জন্য অধিক উপযোগী। বারি বার্লি-৭ সাধারণত ৯০ থেকে ১০৫ দিনে পরিপক্ব হয়, আর বারি বার্লি-১০ মাত্র ৮০ থেকে ৮৬ দিনের মধ্যেই পাকতে শুরু করে। ফলনও আশাব্যঞ্জক—হেক্টরপ্রতি প্রায় ২ থেকে ২.৪ টন।
এই সফল পরীক্ষামূলক চাষ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)। বৈজ্ঞানিক সহকারী জাহিদ হাসান জানান, “বার্লি এমন একটি ফসল, যা লবণাক্ত ও অনুর্বর জমিতেও ভালো জন্মায়। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম এবং সেচের প্রয়োজনও তুলনামূলক কম। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প ফসল।”

বিএআরআই-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, “পাইকগাছার পাশের কয়রা উপজেলায় গত ছয় বছর ধরে বার্লির বিভিন্ন জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। বিদেশি উৎস থেকে আনা বীজ দিয়ে প্রায় ১৫০টি নতুন লাইন তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সহনশীল ও ফলনশীল জাতগুলো বাছাই করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।”

খুলনা অঞ্চলের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় কৃষিতে নতুন ফসলের বিকল্প খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “বার্লি শুধু খাদ্যশস্য নয়, এটি পশুখাদ্য এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়ভাবে এর উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং কৃষকদের আয় বাড়বে।”

মনিরুল ইসলামের এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। প্রতিদিন অনেক কৃষক তার খেত পরিদর্শনে আসছেন এবং চাষাবাদের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন। স্থানীয় কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, “আগে ভাবতাম এই জমিতে কিছুই হবে না। এখন নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস হচ্ছে—লবণাক্ত মাটিতেও ভালো ফলন সম্ভব।”

বার্লি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে প্রোটিন, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও এটি পশুখাদ্য ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের কাঁচামাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইকরামুল হোসেন বলেন, “এই প্রাথমিক সফলতা যদি বড় পরিসরে বিস্তৃত করা যায়, তাহলে পাইকগাছা ও আশপাশের এলাকার লবণাক্ত জমির উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।”

মনিরুল ইসলামের এই ছোট উদ্যোগ এখন বড় সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। যেখানে একসময় লবণাক্ততা ছিল কৃষির প্রধান বাধা, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা এবং একটি টেকসই কৃষি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।

 

রাজু

×