আওয়ামী লীগের রাজনীতির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী) আসনে নীরবে এক রাজনৈতিক বাঁক বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিএনপি নেতা সেলিমুজ্জামান সেলিম। কোনো সংসদীয় পদে না থেকেও শুধুমাত্র তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা, সেবামূলক কার্যক্রম এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা জেলার চিরাচরিত রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সেলিমুজ্জামান সেলিমের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ বিদ্যমান। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির (ফরিদপুর বিভাগীয়) সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক এই কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কর্মসূচিকে।
সংকটে ও সম্ভাবনায় জনগণের পাশে
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটে সেলিমুজ্জামান সেলিমের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। করোনা মহামারি চলাকালীন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাদ্য, অর্থ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে তিনি ছুটে গেছেন মুকসুদপুর ও কাশিয়ানীর প্রত্যন্ত গ্রামে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, সাম্প্রতিক বন্যা এবং শীতেও তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ব্যাপক ত্রাণ ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়, যা দল-মতের ঊর্ধ্বে সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে।
শুধু দুর্যোগেই নয়, এলাকার সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি একজন সক্রিয় সংগঠক। এলাকার যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতেও তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
মাঠের চিত্র: যা বলছে সাধারণ মানুষ
তার এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠে ভেসে ওঠে গভীর আস্থা ও ভালোবাসার সুর। মুকসুদপুরের প্রবীণ কৃষক হায়দার আলী শেখ বলেন, "আমার এই জীবনে বহু নেতাকে দেখেছি, কিন্তু সেলিম ভাইয়ের মতো এমন দরদি মানুষ দেখিনি। বিপদের দিনে তিনি কখনও দল দেখেন না, মানুষ দেখেন। আমার ছেলের অসুস্থতার সময় তিনি যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।"
আশ্চর্যজনকভাবে, এই শ্রদ্ধাবোধ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমর্থকদের মধ্যেও দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক কর্মী অকপটে স্বীকার করেন, "রাজনৈতিকভাবে আমরা ভিন্ন আদর্শের হতে পারি, কিন্তু সেলিম ভাইয়ের ব্যক্তিগত সততা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডকে প্রশংসা না করে পারা যায় না। তিনি আমাদের দুর্গে হানা দিয়েছেন অস্ত্র দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে।"
আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকরা বলছেন, গোপালগঞ্জের মতো একটি আসনে, যেখানে আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য কোনো দলের রাজনীতি ঐতিহ্যগতভাবে কঠিন, সেখানে সেলিমুজ্জামান সেলিম সেবা ও সংগঠনকে মিলিয়ে এক নতুন মডেল তৈরি করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার গুরুত্ব বহুমাত্রিক।
তাকে ঘিরে বিএনপি ও তার জোটের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, গোপালগঞ্জ-১ আসনে তিনিই হতে পারেন তাদের তুরুপের তাস। তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও দল-মত নির্বিশেষে গ্রহণযোগ্যতা ভোটের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যেখানে প্রথাগতভাবে বিরোধী দলের প্রার্থীরা তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারেন না, সেখানে সেলিমুজ্জামান সেলিমের প্রার্থিতা আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তার গুরুত্ব কেবল একজন প্রার্থী হিসেবেই নয়; তিনি বিএনপির জন্য একটি অনুপ্রেরণার প্রতীকও। যদি তিনি এই আসনে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেন বা অপ্রত্যাশিত কোনো ফলাফল অর্জন করেন, তবে তা সারা দেশে দলের কর্মীদের জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং, আসন্ন নির্বাচনে তার ভূমিকা শুধুমাত্র একটি আসনের জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি গোপালগঞ্জের রাজনৈতিক দুর্গ এবং জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের একটি সূচক হয়ে উঠতে পারে।
নোভা








