ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯

অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্যে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে : ফখরুল

প্রকাশিত: ১৫:৫৬, ১৭ আগস্ট ২০২২; আপডেট: ১৬:৫৮, ১৭ আগস্ট ২০২২

অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্যে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে : ফখরুল

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

বুধবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। 

তিনি বলেন, সরকারের কিছু সুবিধাভোগী দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী চক্রের হাতে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা জিম্মি হয়ে আছে।

ফখরুল বলেন, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম এবং সরকারের অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের যাঁতাকলে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এ সরকারের জনগণের কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা জনগণের কল্যাণের তোয়াক্কা না করে নিদারুণভাবে নিষ্ঠুর ও নির্দয় হয়ে পড়েছে। দেশের মানুষ এ সরকারের দু:শাসন থেকে মুক্তি চায়। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই সরকারকে রাজপথের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশে সত্যিকার অর্থে জনমানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। 

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমানে নিত্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র আমরা সবাই জানি। আমরা যতটা তিক্তভাবে বাজারের মুল্যবৃদ্ধি অনুভব করতে পারি, তা সরকার কখনওই অনুভব করতে পারবেন না। আর পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে সরকারের মদদপুস্ট সিন্ডিকেটকারীদের ভূমিকার কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। মূল্যবৃদ্ধির এই দুর্নীতিবাজ চক্রের সম্পর্ক রয়েছে সরকারের লোকজনের সঙ্গে। আর বর্তমান সরকারকে মূলত চালাচ্ছেই এক ধরনের স্বার্থান্বেষী অর্থপিপাসু বণিক সমাজ। কিন্তু সরিষায় ভূত থাকলে ভূত তাড়াবে কে? রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তখন যা হবার তাই হচ্ছে দেশে। এবারের বাজেটের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। 

তিনি বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাবে এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল ও ভোগ্যপণ্যসহ সকল পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় ভোক্তারা যখন দিশেহারা তখন হঠাৎ করে বিনা নোটিশে রাতের অন্ধকারে জ্বালানি তেলের দাম নজিরবিহীন বৃদ্ধি মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। কারণ, এর প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম আরও বেশি বেড়ে গেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি। এত বেশি মূল্যবৃদ্ধি এর আগে আর কখনও হয়নি।  

মির্জা ফখরুল বলেন, জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সারাদেশে আগুন জ্বলছে। জ্বালানির মূল্য যদি বাড়াতেই হতো সরকার তা সহনীয়ভাবে ধাপে ধাপে বাড়াতে পারতো। হঠাৎ করে রাতের আঁধারে একবারে এত বেশি দাম বৃদ্ধিতে জ্বালানি ব্যবহার সংশ্লিষ্ট সকলেই হতচকিত হয়ে পড়েছে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম যখন ১৩০ ডলার থেকে ৯০ ডলারে নেমে এসেছে এবং আরো কমে আসছে। আর বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্য এক লাফে এত বেশি বৃদ্ধি করা হলো। মূলত এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আসায় জ্বালানি তেলের দর বাড়ানোর টেকনিক নিয়েছে সরকার। তবে এক লাফে এত বেশি মূল্যবৃদ্ধি অযোক্তিক ও অমানবিক। অবিবেচক সরকারের বেপরোয়া দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অপরিণামদর্শিতার দায় পুরোপুরি সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হলো।  

বিএনপি মহাসচিব বলেন, গত ১২ বছর ধরে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে অলস বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর দায়ও এখন জনগণের ঘাড়ে। এ কারণে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে শতকরা ৫১ ভাগ বাড়ানো হয়েছে। আর জ্বালানি তেলের ওপর ভর্তুকি কমাতে ডিজেল চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। বিদেশে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বাড়াতে বন্ধ রাখা হয়েছে এলএনজি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বড় বড় শিল্প কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও হিমশিম খাচ্ছে ছোট ছোট শিল্প কারখানাগুলো। সবকিছু শেষ পর্যন্ত গিয়ে চাপছে উৎপাদিত পণ্যের ওপর। অর্থাৎ ভোক্তা পর্যায়ে। এ কারণে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ভোক্তাদের। অনেকে পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক মালিক লোকসান কমাতে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু করেছে। 

ফখরুল বলেন, বাজারে ডলারের দাম এখন কার্ব মার্কেটে ১১৪ টাকারও বেশি। তাও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের পণ্যের দামই বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। গত ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল শতকরা ৬ দশমিক শূণ্য ৫ ভাগ। সেখানে সরকারি হিসেবেই গত জুনে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ ভাগ। যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তাই অবশেষে অর্থমন্ত্রী নিজেও মূল্যস্ফীতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে গত এক বছর ধরে সব ধরনের পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে এবং বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের উপরে রয়েছে। চাল থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। ডিম বিক্রি হচ্ছে ডজন ১৬৮ টাকা ডজন যা গত সপ্তাহেও ছিল ১২০ টাকা। সরকার গরিবের চাল বলে খ্যাত মোটা চালের দামও ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা করেছে।

তিনি বলেন, ঊর্ধ্বমুখী বাজারে সাধারণ মানুষের কাঁধে ফের ব্যয়বৃদ্ধির ভার অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। 
কাঁচাবাজার থেকে একটি পরিবারে যা যা কিনতে হয়, তার প্রায় সবকিছুর দামই আরেক দফা বেড়েছে। এ তালিকায় যেমন চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা আছে, তেমনি রয়েছে সবজি, ডিম ও মুরগির দাম। পিছিয়ে নেই মাছ ব্যবসায়ীরাও। তাঁরাও দাম বাড়িয়েছেন। এই মূল্যবৃদ্ধি সেসব সীমিত আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি আঘাত, যাঁরা ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতিতে নাকাল। এবার বর্ধিত ট্রাকভাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। তাই জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানোর প্রভাব কাঁচাবাজারে পড়েছে। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ নানাভাবে ব্যয় কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। নিজের আয় দিয়ে আর চলতে না পারায় স্ত্রীকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে অনেকেই ফ্যামিলি বাসা ছেড়ে উঠেছেন মেসে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। 

এমএইচ