ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

এসএমই মেলা উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী

আরও শিল্প গড়ে তুলুন তবে বর্জ্য যেন নদীতে না পড়ে

​​​​​​​বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২:৪৮, ১৯ মে ২০২৪

আরও শিল্প গড়ে তুলুন  তবে বর্জ্য যেন  নদীতে না পড়ে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার জাতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপণ্য মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে দেশ জনগণকে বাঁচাতে এবং শিল্পায়নকে পরিবেশবান্ধব করতে শিল্প-কারখানা নির্মাণে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিল্প আমাদের গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সকলকে করতে হবে এবং সেটা মেনে নিতে হবে। সামান্য একটু কেমিক্যাল ব্যবহারের ওই পয়সাটা বাঁচাতে গিয়ে দেশের সর্বনাশ, সঙ্গে সঙ্গে নিজের সর্বনাশটা কেউ করবেন না- সেটা আমার অনুরোধ থাকল। যারা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন, অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন যেন শিল্পের বর্জ্য নদীতে না পড়ে।

পানি যেন কোনো রকম দূষিত না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে। রবিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে১১তম জাতীয় ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প পণ্য (এসএমই) মেলা-২০২৪এর উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশ ভৌগোলিক সীমারোখায় ছোট হলেও জনসংখ্যার দিক দিয়ে বড়। সেক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের দেশের পরিবেশ সবকিছু অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হওয়া উচিত। স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া উচিত। সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুর অভিঘাতে যেন আমরা ক্ষতিগ্রস্ত না হই, সেদিকে সকলকে দৃষ্টি দিতে হবে। আমরা আমাদের শিল্প খাতকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে চাই। কারণ শিল্প খাত একান্তভাবে পরিবেশবান্ধব হওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা যেখানেই কোনো শিল্প গড়ে তুলবেন, সেখানে অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন আপনার এই শিল্পের এই বর্জ্য যেন নদীতে না পড়ে, আমাদের পানিতে যেন কোনোভাবে দূষণ না হয়, মাটিতে দূষণ যেন না হয়। সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য আমি বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি খুব আনন্দিত কেননা আজকের এসএমই পণ্যমেলায় দেখা যাচ্ছে উদ্যোক্তা ৬০ শতাংশই নারী।

নারীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সমাজের একটা অংশকে বাইরে রেখে সেই সমাজ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। আমাদের দেশের নারী-পুরুষ সকলকেই যদি আমরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তা হলে দেশটা দ্রুত উন্নত হবে। এজন্য নারী উদ্যোক্তা আমাদের দরকার। যেহেতু শিল্প মন্ত্রণালয় এবং এসএমই ফাউন্ডেশন থেেেক নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে সেক্ষেত্রে পুরুষরা ঘরের নারীদের (স্ত্রী-কন্যা-বোন) নামে, তাদের সঙ্গে নিয়ে এখানে যুক্ত হতে পারেন। কেননা অন্যত্র তো আর শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে না। কাজেই পুরুষরা বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজ এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেন। কারণ আমরা চাই আমাদের শিল্প খাতে আরও উদ্যোক্তার সৃষ্টি হোক।

প্রধানমন্ত্রীজাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার-২০২৩বিজয়ী সাতজন মাইক্রো, ক্ষুদ্র মাঝারি এবং স্টার্ট-আপ উদ্যোক্তার হাতে ক্রেস্ট সনদ তুলে দেন। শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন . মো. মাসুদুর রহমান। ২০২৩ সালের জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী এসএমই উদ্যোক্তাদের পক্ষেরংপুর ক্রাফটসএর স্বত্বাধিকারী স্বপ্না রানী সেন অনুষ্ঠানে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় প্রণীত ২০২৪ থেকে ২০২৮ কর্মপরিকল্পনার ওপর রচিত একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানেএসএমই মেলা ২০২৪এর ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত  হয়। উদ্বোধনী পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

এবারের মেলায় অংশ নেওয়া সাড়ে তিন বেশি ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, যাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা। ছাড়া ৩০টি ব্যাংক, ১৫টি সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় বিজনেস ক্লাবসহ আরও প্রায় ৫০টি উদ্যোক্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণ করছে। আগামী ২৫ মে শনিবার পর্যন্ত চলমান এই মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

সরকার প্রধান বলেন, ২০০৭-০৮ অর্থবছরের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ১৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সুচকে বাংলাদেশ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মাথাপিছু আয় হাজার ৭শ৯৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা বিএনপির শাসনামল ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৫শ৪৩ মার্কিন ডলার। কোভিড-১৯ অতিমারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং একে ঘিরে স্যাংশন পাল্টা স্যাংশনের বিরূপ প্রভাবে বিশ^ অর্থনীতির মন্দাভাবে মূল্যস্ফীতি না ঘটলে এটাকে আরও উন্নতি করা যেত বলেও তিনি অভিমত দেন। এর সঙ্গে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর সরকার চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মান করায় আজকে পদ্মার ওপারেও বিশাল কর্মক্ষেত্রে উন্মুক্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মার ওপারে যে জেলা বা ইউনিয়নগুলো রয়েছে সেখানকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। সেখানেও বিনিয়োগের বিরাট সুযোগ এসে গেছে। এসব এলাকায়এসএমই’ (ফাউন্ডেশন) আরও বেশি কাজ করতে পারে এবং এখানে অনেক উদ্যোক্তার সৃষ্টি করতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী শিল্পক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমরা আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবকে মাথায় রেখে আমাদের আরও উদ্যোক্তা এবং কাজের লোক প্রয়োজন পড়বে। আমাদের দেশের মানুষকে কাজ দিতে হবে। আমরা যখন পদক্ষেপ  নেব সে সময় বিশেষ করে শিল্প মন্ত্রণালয় এসএমই ফাউন্ডেশনকে খেয়াল রাখতে হবে যে শ্রমঘন শিল্প যেন আমাদের দেশে গড়ে ওঠে।

তাঁর সরকার বছরহস্তশিল্পকে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে উল্লেখ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হস্তশিল্পের ব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে সুপ্ত মেধা বিকশিত হওয়ার একটি সুযোগ লাভ করে। সেজন্যই তাঁর সরকার একে বেশি সুযোগ দিচ্ছে। বিদেশে এর আলাদা কদর রয়েছে। কাজেই রপ্তানি বহুমুখীকরণের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার যাতে সৃষ্টি হয়Ñ সেজন্য দারিদ্র্য বিমোচন করে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি রেখে তাঁর সরকার অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়ন  করে যাচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, এসএমই খাতের উন্নয়নে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের পাশাপাশি উন্নত বিশে^ ভোক্তাদের চাহিদানুযায়ী শতভাগ রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনে আরো মননিবেশ করতে হবে। কেননা এখন ইকোনমিক ডিপ্লোমেসির যুগ। সেভাবেই বহির্বিশ্বে আমাদের দূতাবাসগুলোকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। যে যেখানে অবস্থান করছেন সেখানকার চাহিদানুযায়ী পণ্য উৎপাদন বাজারজাত করার প্রচেষ্টা এবং বিনিয়োগ নিয়ে আসার প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন তিনি।

আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই এসএমই পণ্য মেলার মাধ্যমে দেশের মানুষ আরও জানতে পারবে এবং উৎসাহিত হবে। আরও উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং এই মেলার মাধ্যমেই আমাদের এসএমই ফাউন্ডেশন আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। ফলে বিদেশে পণ্য রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে এবং দেশেও আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বিশ্বা দেশীয় এসএমই শিল্পের উন্নয়নে এই মেলা ক্রমান্বয়ে আন্তর্জাতিক মাত্রা পাবে এবং এরফলে দেশীয় পণ্যের প্রসারও ঘটবে। নতুন নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখবে বলেও আমি বিশ্বা করি। আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যারা তাদের প্রতিই আমি মনে করি বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ তারাই এক সময় বড় শিল্পে পরিণত হবে।

শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, শ্রমিকদের বিষয়ে সকলকে আন্তরিক হতে হবে। আপনি যদি বেশি কাজ চান তা  হলে তাদের সেই কর্মপরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। শুধু হুকুম দিয়ে হয় না। হুকুম দিয়ে যা অর্জন করতে পারবেন, ভালোবাসা দিয়ে পারবেন তারচেয়ে অনেক বেশি। আস্থা-বিশ^াস অর্জন করে আরো বেশি আপনি কাজ করিয়ে নিতে পারবেন। সেদিকে অবশ্যই সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা যে সুবিধাগুলো দিচ্ছি সেটা তাদের (নারী) গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের নারীদের আরও বেশি উদ্যোক্তা হতে হবে। বিশেষ করে যাতে সকলে (নারী-পুরুষ) যৌথভাবে কাজ করতে পারে সে ব্যবস্থাটা আমাদের করতে হবে।

×