ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

১২ ডিসেম্বরের বোর্ড সভায় অনুমোদন

আইএমএফের কাছ থেকে ৬৯ কোটি ডলার মিলবে

এম. শাহজাহান

প্রকাশিত: ০০:৪০, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩

আইএমএফের কাছ থেকে ৬৯ কোটি ডলার মিলবে

আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ৬৯ কোটি ডলার পাচ্ছে বাংলাদেশ

ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ৬৯ কোটি ডলার পাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ১৩ ডিসেম্বর বিপুল পরিমাণ এই ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে যোগ হবে বলে আশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর আগে ১২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বোর্ড সভায় ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হবে। ডলার সংকট ও রিজার্ভ কমে যাওয়ার এই সময়ে আইএমএফের কাছ থেকে এই ঋণপ্রাপ্তি দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে তাদের পক্ষ থেকে ঋণ প্রদানে সংস্থাটির দেওয়া শর্ত পূরণে নজর দেওয়ারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ঋণ প্রদানের শর্ত পূরণে সতর্ক সরকার।

জানা গেছে, আইএমএফের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ইতোমধ্যে সংস্থাটি পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ঋণ প্রদানের কর্মসূচি থেকে বিরত রয়েছে। তবে ঋণ প্রদানে বাংলাদেশকে দেওয়া বড় ধরনের ৩০টি শর্তের বেশিরভাগ পূরণ হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এ দুটি শর্ত পূরণে সময় নিয়েছে সরকার। অর্থবিভাগ আশা করছে, জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী জুনের মধ্যে দুটো শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে। এ কারণে আইএমএফের শর্ত পূরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় সরকার, বরং সতর্কতামূলক বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

ঋণের দ্বিতীয় কিন্তি অনুমোদন হওয়ার পর বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক, জাইকা এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পাওয়া যাবে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে গেলে বিদেশী বিনিয়োগ এবং রেমিটেন্স আহরণ আরও বাড়বে। প্রবাসীরাও বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন।  
ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্প বিশেষ করে পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা রেলওয়ে, ঢাকার মেট্রোরেল, উড়াল সড়ক, কর্ণফুলী টানেল এবং ঢাকা কক্সবাজার রেলওয়েসহ অন্যান্য প্রকল্প থেকে রাজস্ব (রেভিনিউ) পাওয়া যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, নতুন বছরের শুরুতেই ঘুরে দাঁড়াবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। ইতোমধ্যে খাদ্যপণ্যের দাম কমে বাজার পরিস্থিতি সহনীয় হয়ে আসছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, আইএমএফ সবকিছু পর্যালোচনা করেই বাংলাদেশের অনুকূলে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় করবে।

রিজার্ভ কমে যাওয়ার এই সময়ে এই ঋণে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া ডলার সংকটও কাটবে। তিনি বলেন, আইএমএফের ঋণ পাওয়ার অর্থ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী যারা আছেন, তারাও তখন ঋণ প্রদানে এগিয়ে আসবে। বিশ্বে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে তবে এটাও ঠিক, সংস্থাটি ঋণ প্রদানে যেসব শর্ত আরোপ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।
১২ ডিসেম্বর বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদন হবে ॥ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত আইএমএফের প্রধান কার্যালয়ে আগামী ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য বোর্ড সভায় বাংলাদেশের ঋণ প্রদানের বিষয়টি এজেন্ডায় রাখা হয়েছে। ওই বোর্ড সভায় ঋণ প্রদানের বিষয়টি অনুমোদন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে গত ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সফররত আইএমএফ স্টাফ মিশনের প্রধান রাহুল আনন্দ ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের কথা জানিয়েছিলেন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছেছে।

তবে এটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করবে আইএমএফের বোর্ড সভা, যা ওয়াশিংটনের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণত বোর্ড সভা অনুমোদন করলে তার পরের দিনই ঋণের কিস্তি ছাড় করে সংস্থাটি। ইতোমধ্যে প্রথম কিস্তির ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। অনুমোদনের পরেই দিনই সেই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে যোগ হয়েছিল আইএমএফের ৪৭ কোটি ডলার। ওই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ১২ ডিসেম্বর বোর্ড মিটিংয়ে অনুমোদনের পর ১৩ ডিসেম্বর কিস্তি পাবে বাংলাদেশ। তবে এবার আরও বেশি অর্থ পাওয়া যাবে।

এদিকে বোর্ড মিটিংয়ে বর্ধিত ঋণ সুবিধা, বর্ধিত তহবিল সুবিধা এবং স্থিতিস্থাপকতা ও স্থায়িত্ব সুবিধার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হতে পারে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে আইএমএফ নির্ধারিত বড় ধরনের ছয়টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বাংলাদেশ দুটি অর্জন করতে পারেনি। ইতোমধ্যে ওই দুটি শর্ত পূরণের ব্যাপারে সময় নিয়েছে সরকার। আশা করা হচ্ছে, রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর মতো দুটি বিষয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্জন করা সম্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন- আশা করছি, বাংলাদেশের ঋণ প্রস্তাব আইএমএফ বোর্ড অনুমোদন করবে। এই সময়ে ঋণ পাওয়ার বিষয়টি স্বস্তি আনবে অর্থনীতিতে।

এদিকে, বাংলাদেশ যেসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি, সেগুলোর একটি হলো- গত জুন শেষে ন্যূনতম ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ রাখা। জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের দাম পরিশোধে সরকারকে রিজার্ভ থেকে খরচ করতে হয়েছিল বলে লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার কমেছে। এ ছাড়া ন্যূনতম কর-রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা যায়নি। 
২০২২-২৩ অর্থবছরে কমপক্ষে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা কর-রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজন ছিল। অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তিন লাখ ২৭ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা কম। উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ বোর্ড বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে। দ্বিতীয় কিস্তি চলতি মাসের মধ্যে পাওয়ার পর বাকি আরও পাঁচ কিস্তি পর্যায়ক্রমে পাওয়া যাবে। ঋণের শর্ত হিসেবে বেশ কিছু আর্থিক ও নীতি সংস্কারে মধ্য দিয়ে যেতে হয় বাংলাদেশকে।

এর মধ্যে ছিল বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারমুখী করা, ব্যাংক ঋণে সুদ হারের নয় শতাংশের সীমা তুলে দেওয়া, ব্যাংক ঋণের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের তথ্য প্রকাশ, রিজার্ভের হিসাব আইএমএফ স্বীকৃত পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী করে প্রকাশ, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ইত্যাদি। প্রথম কিস্তির অর্থ ব্যবহারের অগ্রগতি দেখে পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের জন্য আইএমএফের আর্টিকেল-ফোরের অধীনে রিভিউ মিশনের প্রতিনিধি দলটি গত ৪ অক্টোবর সর্বশেষ বাংলাদেশে আসে। 

×