ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

অক্টোবরেও কমার লক্ষণ নেই

ডেঙ্গুতে সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ৩৯৬ জনের মৃত্যু

​​​​​​​স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ২৩:৫৪, ১ অক্টোবর ২০২৩

ডেঙ্গুতে সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ  ৩৯৬ জনের মৃত্যু

মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত মৃত্যুতে সর্বকালের রেকর্ড ভাঙল সেপ্টেম্বর মাস। পুরো মাসে ডেঙ্গুর তীব্রতা এত বেশি ছিল যে আক্রান্ত মৃত্যুর পরিসংখ্যানে আগের মাস আগস্টকেও ছাড়িয়ে যায়। পুরো সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৯৬ জনের। আর সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন। যা আগস্টে ছিল ৭২ হাজার ১৬ জন। আগস্টে মারা গিয়েছিল ৩৩২ জন। যা ২০২২ সালের সারা বছরের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মৃত্যু থেকেও বেশি। এমন পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন অক্টোবরেও হবে না বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরই মূলত ডেঙ্গুর ভর মৌসুম। মশা না মারতে পারলে অক্টোবরেও আক্রান্ত এবং মৃত্যুতে রেকর্ড ছাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।

চলতি বছরের শুরু থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট মারা গিয়েছে ৯৮৯ জন। এর মধ্যে শুধু আগস্টেই মৃত্যু হয়েছে ৩৩২ জনের। আর সেপ্টেম্বরে মৃত্যু হয়েছে ৩৯৬ জনের। ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ আক্রান্তের পরিসংখ্যানও হয়েছে মাসে। যা এর আগে একক কোনো মাসে হয়নি। শুধু রাজধানী নয় দেশের সব জায়গাতেই প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম হিসেবে স্বীকৃত অক্টোবরে পরিস্থিতি কী হতে পারে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে বিশেষজ্ঞদের মনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সর্বমোট ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২৮১ জন মারা যান। কিন্তু চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন দুই লাখ তিন হাজার ৪০৬ জন। এর মধ্যে ঢাকাতে ৮৩ হাজার ২২২ জন সারা দেশে (ঢাকা সিটি ব্যতীত) এক লাখ ২০ হাজার ১৮৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দুই সিটি করপোরেশনসহ সরকারের নানা দপ্তর সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করলেও প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মৃত্যু। আগস্টের চাইতেও সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। মশা না মারতে পারলে অক্টোবরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে উল্লেখ করে এর কারণ খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করছেন জাতীয় প্রতিষেধক সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, সবাই অনেক কাজ করছি।

তাও রোগ বাড়ছে, রোগী মারা যাচ্ছে।  কোথাও তো ঝামেলা আছে। সেই বিষয়টি নিয়ে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া খুব জরুরি। এডিস মশা নিয়ে গবেষণার জায়গায় একটা দুর্বলতা হচ্ছে, আমাদের দেশে মেডিক্যাল এন্টোমলজিস্ট আসলেই নেই। যারা কাজ করেন তারা হয় প্রাণিবিদ্যা অথবা কৃষি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। আমরা নিপসমের পক্ষ থেকে মেডিক্যাল এন্টোমলজির ওপর একটি প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগ তেমন ছিল না। তারপরে আমরা দেখেছি কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর, বরিশালের মতো কয়েকটা জেলায় ছিল। বছর  কোনো জেলা বাদ নেই। আমরা শহরাঞ্চলে এডিস এজিপ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এডিস এলবোপিকটাস বেশি থাকে সেটা নিয়ে আলোচনা হয় না। ঢাকার বাইরে যেসব জায়গায় সার্ভে হয়েছে সবখানেই এলবোপিকটাস বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে। এর চরিত্র এজিপ্টি থেকে একদমই আলাদা। আমরা প্রচার-প্রচারণা করি এজিপ্টি মাথায় নিয়ে। এলবোপিকটাস কিন্তু কচু গাছের পাতায় জমা পানিতেও হতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম সারা বছর জুড়ে চালাতে হবে। এই বছর আমরা গ্রামাঞ্চলে রোগী পেতে শুরু করেছি, আমি আসলে খুব ভীত যে আগামী বছর এই পরিমাণটা আরও বাড়বে কি না। বাড়লে আমাদের চিকিৎসা সক্ষমতার ওপর অনেক চাপ পড়বে। 

নিপসমের কিটতত্ত্ববিদরা জানান, মশার তিন ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যার ফলে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে সেসব প্রয়োগে কর্মীদের যথেষ্ট প্রশিক্ষিত হতে হবে। ওষুধ যদি শুধু ছিটিয়ে যায় পোকার সান্নিধ্যে না আসে, কোনো কাজে আসবে না। যতই কার্যকর ওষুধ হোক না কেন ইনসেক্টের কন্টাক্টে না আসলে কোনো কাজ হবে না।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ অক্টোবর মাসে কেমন থাকতে পারে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে চার থেকে ছয়দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হন। আবার ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটি ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে যায়। বৃষ্টি শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকবে। বছরের আবহাওয়ায় যেহেতু একটা বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেহেতু অক্টোবরেও যে বৃষ্টি হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি অক্টোবরেও সেপ্টেম্বরের মতো বৃষ্টি হয় তাহলে মাসেও দেশে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রাদুর্ভাব থাকবেই। এক্ষেত্রে মশা মারার বিকল্প নেই। সিটি করপোরেশনগুলোকে আরও বৃহৎ পরিসরে মশা মারার কর্মসূচি পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে বাড়াতে হবে জনসম্পৃক্ততা।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং কীটতত্ত্ববিদ . কবিরুল বাশার বলেন, এখন একটাই সমাধান। ডেঙ্গু মশা যেভাবে ছড়িয়েছে তাতে মশা মারা আমাদের জন্য কিছুটা কঠিন। তাই এখন আমাদের ডেঙ্গুর উৎস ধ্বংস করতে হবে। ডেঙ্গুর যে প্রজনন হচ্ছে সেগুলোকে যদি আমরা ধ্বংস করতে না পারি, তাহলে এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্পৃক্ত হতে হবে। প্রতিটি বাড়ির মালিককে নিশ্চিত করতে হবে তার বাড়ির কোথাও কোনো পানি জমে থাকবে না। এটা যদি আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে এডিস মশার বংশ কমে যাবে। বংশ কমে গেলেই ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, অন্যথায় এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হয়ে যাবে।

×