ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

আজ গাসিক নির্বাচন ॥ ইসির অগ্নিপরীক্ষা

সবার দৃষ্টি গাজীপুরে

শরীফুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান টিটু ও নুরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৩:০২, ২৪ মে ২০২৩

সবার দৃষ্টি গাজীপুরে

ভোটকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে নির্বাচনী সামগ্রী

আজ বৃহস্পতিবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রে কেন্দ্রে গণনার পর ফল ঘোষণা করা হবে। এরপর সব কেন্দ্রের ভোটের হিসাব যোগ করে রিটার্নিং কর্মকর্তা মেয়র ও কাউন্সিলর পদে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করবেন। এবারের গাসিক নির্বাচনে সব কেন্দ্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হবে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ নির্বাচন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য অগ্নিপরীক্ষা। তাই সবার দৃষ্টি এখন গাজীপুরে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট করতে ইসির নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা জোরদার করেছে। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে সমগ্র সিটি করপোরেশন এলাকা। কেন্দ্রে কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে বিশাল স্ক্রিনে ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে ইসি। এ পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশ প্রত্যাশা করছেন গাজীপুরের সর্বস্তরের মানুষ।
এদিকে রাজধানীর অদূরে অবস্থিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফল কি হয় তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দেশের সর্বস্তরের মানুষ। রাজনৈতিক দলসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহলও এ নির্বাচনের দিকে তীক্ষè দৃষ্টি রেখেছে। এ নির্বাচনের ভোট কেমন পরিবেশে হয় তা পর্যবেক্ষণ করছেন ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও। এ নির্বাচন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে এমন ভাবনা থেকেই সবাই এ নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। 
অভিজ্ঞ মহলের মতে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রেস্টিজ ইস্যু। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন হলে এবং এ নির্বাচনে দলের মেয়র ও অধিকাংশ কাউন্সিলর প্রার্থীরা বিজয়ী হলে দেশ-বিদেশে সরকার ও আওয়ামী লীগের ইমেজ এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আর তা না হলে নানামুখী প্রশ্নের সম্মুখীন হবে সরকার ও আওয়ামী লীগ। তাই আওয়ামী লীগ চাচ্ছে যেন সুষ্ঠু ভোটে তারা বিজয়ী হতে পারে। আর রাজপথের বিরোধী বিরোধী দল এ নির্বাচনে অংশ না নিলেও তারা তলে তলে বিকল্প মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে।

এ জন্য বিএনপির বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খানের প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের পক্ষে কাজ করছে। এছাড়া বিএনপির আরেকটি অংশ দল সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থী সরকার শাহ নূর ইসলামের পক্ষে কাজ করছে। তবে শেষ মুহূর্তে দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে এ দুজনের যে কোনো একজনকে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দিলে ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে। আর দলের পদধারী ২৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে বহিষ্কার করলেও বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীরা তাদের পক্ষে কাজ করছেন। 

এদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের অনুসারী আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ও দলের মহানগর সভাপতি আজমত উল্লা খানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও পরে মেয়র পদে জাহাঙ্গীর আলমের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর প্রথমে তার মায়ের পক্ষে অবস্থান করলেও একপর্যায়ে হাইকমান্ডের নির্দেশে আস্তে আস্তে মূল ধারায় ফিরে আসে। তাই শেষ মুহূর্তে এসে আজমত উল্লা খানের নৌকার পাল্লা ভারী হয়েছে হলে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।

তবে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে কম গেলে এবং বিএনপি সমর্থক ভোটাররা শেষ মুহূর্তে একাট্টা হয়ে কোনো প্রার্থীকে একচেটিয়া ভোট দিলে ফলের মোড় ঘুরে যেতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। তাই এ নির্বাচনে কে হচ্ছেন নগর পিতা (মেয়র) তা দেখার জন্য ভোটের ফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। 
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের অনিয়ম প্রতিরোধে কেন্দ্রে কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে একাধিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মোট ৪ হাজার ৪৩৫টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এই সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে বিশাল স্ক্রিনে ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ অন্য নির্বাচন কমিশনার ও ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সাংবাদিকদেরও স্ক্রিনে ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সকল প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ৪৮০টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৩৫১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ তাই এই কেন্দ্রগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর ১২৯টি কেন্দ্র ঝুঁকিমুক্ত তাই এগুলোকে সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ভোট কেন্দ্রে থাকা সিসি ক্যামেরায় কোনো অনিয়ম দেখতে পেলে গাইবান্ধা নির্বাচনের চেয়েও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৫৭টি ওয়ার্ডে ২১ প্লাটুন বিজিবি টহল দেবে।

ভোটের অনিয়ম প্রতিরোধে ৭৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবেন। সঙ্গে থাকবেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও। সেখানে র‌্যাবের ৩০টি টিম এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পুলিশের ১৯টি এবং মোবাইল টিম হিসেবে ৫৭টি টিম থাকবে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ ও সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন করে ফোর্স থাকবে। এভাবে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে থাকছে ত্রিস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয়। ইতোমধ্যেই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে গোটা নির্বাচনী এলাকা। 
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৬ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৬২ জন এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৬ জন।

এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৮ জন। ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকবেন ৪৮০ জন প্রিসাইডিং অফিসার, তিন হাজার ৪৯৭ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, ছয় হাজার ৯৯৪ জন পোলিং অফিসারসহ ১০ হাজার ৯৭১ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা। এ নির্বাচনে ভোটাররা একজন মেয়র ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের জন্য ৫৭ জন কাউন্সিলর এবং ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের জন্য ১৯ জন নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত করবেন। এ নির্বাচনে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ফয়সাল আহমেদ সরকার ইতোমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। 
গাসিক নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ৮ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৪৬ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মেয়র পদের প্রার্থীরা হলেন, নৌকা প্রতীকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. আজমত উল্লা খান, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির এমএম নিয়াজ উদ্দিন, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গাজী আতাউর রহমান, মাছ প্রতীকে গণফ্রন্টের আতিকুল ইসলাম, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির মো. রাজু আহাম্মেদ, স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী টেবিল ঘড়ি প্রতীকে জায়েদা খাতুন, হাতি প্রতীকে সরকার শাহনূর ইসলাম ও ঘোড়া প্রতীকে মো. হারুন-অর-রশীদ। 
উৎসবমুখর পরিবেশে গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) নির্বাচনের ভোট সম্পন্ন করতে আগেই সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। রাজধানী ঢাকার অতি নিকটে হওয়ায় এই সিটির নির্বাচনের দিকে সারাদেশের মানুষের দৃষ্টি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ নির্বাচন এখন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ না নিলেও এতে কেমন ভোট হয় সেদিকে তীক্ষè নজর রাখছে। কারণ, এ নির্বাচনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে তাদের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও এ নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে। এ ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও এ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। 
কাউন্সিলর আজিজুরের প্রার্থিতা বাতিল ॥ গাসিক নির্বাচনের কাউন্সিলর প্রার্থী ৪০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আজিজুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। ‘নৌকা ছাড়া কেউ কেন্দ্রে আসবে না’ বলে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগে বুধবার নির্বাচন কমিশনে শুনানির পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, এ প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এবং তা স্বীকার করার প্রেক্ষিতে লাঠিম প্রতীকে কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়া মো. আজিজুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

আজিজুর রহমান ২২ মে সন্ধ্যা ৭টায় পুবাইল এলাকার কলেরবাজারে মিছিল ও পথসভা করেন। এ সময় নৌকা ছাড়া কাউকে ভোট কেন্দ্রে আসতে দেবেন না বলে ভীতি প্রদর্শনমূলক বক্তব্য দেন, যা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশক্রমে এ বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
ইসি সচিব জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের উপস্থিতিতে চার নির্বাচন কমিশনারের সামনে ব্যাখ্যা দেওয়ার পর প্রার্থী ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তা গৃহীত হয়নি। পরে কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কাউন্সিলর প্রার্থী মো. আজিজুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইভিএমে ভোটের ব্যালটে আর এ প্রার্থীর প্রতীক থাকবে না।
শুক্রবার ভোর পর্যন্ত গাজীপুরে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ ॥ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে গাজীপুর এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার ভোর পর্যন্ত গাজীপুরে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ। মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে এই নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার ভোর ৬টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। এছাড়া বুধবার মধ্যরাত থেকে বন্ধ হয়েছে ভারী যান চলাচলও। তবে নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত পরিচয়পত্রধারী দেশী-বিদেশী সাংবাদিক, নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন-শৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য, নির্বাচনের বৈধ পরিদর্শক এবং অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডাক ও টেলিযোগাযোগে ব্যবহৃত যানবাহনকে নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করব- জিএমপি কমিশনার ॥ গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেছেন, নিñিদ্র নিরাপত্তার মাধ্যমে যেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নাগরিকদের সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারি সেটা নিশ্চিত করব। ভোট কেন্দ্রের আশপাশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মোবাইল ফোর্স, স্ট্রাইকিং ফোর্স, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে। এটা একটা সমন্বিত প্রয়াস। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করব। বুধবার দুপুরে শহরের শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ব্রিফিং অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা। জনগণ আসবে, সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে ভোট দিয়ে চলে যাবে। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই পুরো গাজীপুরসহ সারা বিশ্বের লোকজন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, আমরা যেন একটি ভালো ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারি।
নির্বাচন সামগ্রী বিতরণ ॥ সকাল ৮টা থেকে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে দেশের সর্ববৃহৎ গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তৃতীয় নির্বাচনের ভোট। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো মহানগরী। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, এপিবিএন ও আনসার ভিডিপি সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ১৩ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ইতোমধ্যেই ৪৮০টি ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে ইভিএম মেশিনসহ ৪৬ আইটেমের নির্বাচন সামগ্রী বুঝিয়ে দিয়ে বিতরণ করেছে নির্বাচন কমিশন। 
ভোট কেন্দ্রে ইভিএম সিসি ক্যামেরা ॥ গাজীপুর সিটি নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এইচএম কামরুল ইসলাম জানান, নির্বাচনে ভোট গ্রহণের জন্য ৪৮০টি ভোট কেন্দ্রে তিন হাজার ৪৯৭টি ভোট কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ব্যবহার করার জন্য পাঁচ হাজার ২৪৬টি ইভিএম মেশিন রাখা হয়েছে। প্রতি কেন্দ্রে একজন করে ৪৮০ জন ট্রাবল শ্যূটার, প্রতি দুই কেন্দ্রে একজন করে মোট ২৪০ জন (ভ্রাম্যমাণ) টেকনিক্যাল এক্সপার্ট, ১৪ জন সহকারী প্রোগ্রামার এবং ৪ জন থাকবেন প্রোগ্রামার। যাতে কোনো ইভিএম মেশিনে সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত সমাধান করা যায়। প্রতি কেন্দ্রে একটি এবং প্রতি কক্ষে একটি করে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসন কার্যালয় চত্বর, শহরের কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ এবং জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় থেকে বুধবার দুপুর ১টা থেকে প্রতি কেন্দ্রের জন্য একযোগে ইভিএম মেশিন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ভেসেলিন, মখমলের কাপড়, টিস্যু, বুথ কক্ষ নির্মাণের জন্য কাপড়, অমোছনীয় কালি, ভোটার তালিকা, স্ক্রু-ড্রাইভার, মাল্টিপ্লাগসহ ৪৬ আইটেমের সামগ্রী বিতরণ করা হয়। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারগণ এসব সামগ্রী বুঝে নেন। 
রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, আমাদের কাছে সবগুলো ভোট কেন্দ্রই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ভোট কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৬ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এরমধ্যে পুলিশ ৪ জন, আনসারের একজন করে প্লাটুন কমান্ডার ও সহকারী প্লাটুন কমান্ডার এবং আনসার ও ভিডিপির ৬ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের একজন সদস্য বাড়িয়ে মোট ১৭ জন নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। 
সরঞ্জাম বিতরণ ॥ বুধবার ভোট গ্রহণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। মহানগরীর ৫টি ভেন্যু হতে এসব সরঞ্জাম প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের নিকট বুঝিয়ে দেওয়া হয়। দুপুরে জয়দেবপুর দারুসসালাম (গোরস্তান) ফাজিল মাদ্রাসা ও এতিমখানায় গিয়ে দেখা গেছে, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিকট থেকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ইভিএমসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম বুঝে নেন। পরে তারা এবং কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ভ্যান, রিক্সা বা পিকআপ যোগে স্ব স্ব কেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা দেন।

এ ভেন্যু থেকে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ৫, ১০ ও ১১ নং ওয়ার্ড এবং সাধারণ কাউন্সিলর ১৩ হতে ১৫ এবং ২৮ হতে ৩৩ নং ওয়ার্ডের নির্বাচনী সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। এছাড়া মহানগরের চৌরাস্তা এলাকার চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ ও পশ্চিম চান্দনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ১, ২, ৩, ৪ ও ৬ নং ওয়ার্ড এবং সাধারণ কাউন্সিলর ১ হতে ১২ এবং ১৬ থেকে ১৮ নং ওয়ার্ড, কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ থেকে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ড এবং সাধারণ কাউন্সিলর ১৯ হতে ২৭ নং ওয়ার্ড, ধীরাশ্রমের গিরিজা কিশোর (জিকে) আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও ধীরাশ্রম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ১৩, ১৪, ১৫ ও ১৬ নং ওয়ার্ড এবং সাধারণ কাউন্সিলর ৩৭ হতে ৪৮ নং ওয়ার্ড এবং বোর্ডবাজারের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ১২, ১৭, ১৮ ও ১৯নং ওয়ার্ড এবং সাধারণ কাউন্সিলর ৩৪ হতে ৩৬ ও ৪৯ থেকে ৫৭ নং ওয়ার্ডের কেন্দ্রগুলোতে ইভিএম মেশিনসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোবাইল টিম ॥ রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত ৫৭টি ওয়ার্ডে নির্বাহী হাকিম থাকবেন ৭৬ জন, সঙ্গে বিচারিক হাকিমও থাকবেন। র‌্যাবের ৩০টি টিম থাকবে। বিজিবির থাকবে ২১ প্লাটুন। প্রতিটিতে ২০ জনের বেশি সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া থাকবে পুলিশের ১৯টি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও মোবাইল টিম হিসেবে ৫৭টি টিম। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য ১৭ ও সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন সদস্য থাকবেন। এছাড়াও প্রচুর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। যাতে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা না হয়। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে, তারা যে দলের বা যেই হোক না কেন তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। 
আমাদের কাছে সব ইলেকশনই সমান গুরুত্বপূর্ণÑ ইসি রাশেদা সুলতানা ॥ নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বলেছেন, আমাদের কাছে সব ইলেকশনই সমান গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের আলাদা কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। সব ইলেকশন (ছোট-বড়) আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানেই নির্বাচন হচ্ছে আমরা তা মনিটরিং করছি। আমাদের কাছে ইলেকশন মানে ইলেকশন। আর ইলেকশন মানেই তা গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই। আমাদের পক্ষ থেকেও কারও ওপর কোনো চাপ নেই। যার যার মতো সে সে নির্বাচনের কাজ করছে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। 
বুধবার বিকেলে গাজীপুর সার্কিট হাউসে নির্বাচন নিয়ে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দিতে এসে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি ওইসব কথা বলেন। এ সময় নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এ এইচ এম কামরুল ইসলাম, জাকির হোসেনসহ নির্বাচন কমিশনের অন্য কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 
নির্বাচনের আগের দিন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে কেন মতবিনিময় করবেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারণ একটাই, সেটা হলো নির্বাচনের দিন আচরণ বিধি কতটুকু ভঙ্গ হয় কি হয় না। কি অনিয়ম হয় এ বিষয়গুলো জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা সামারি ট্রায়াল করবেন। আমি তাদের সঙ্গে যদি ব্রিফিং করি তাহলে সবকিছুতেই সুন্দর একটা সমন্বয় হয়। এজন্য জুডিসিয়ারি ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে এসেছি। 
নির্বাচন কমিশন অভয় দিলেও বিভিন্ন হুমকিতে ভোটাররা আতঙ্কিত, এমতাবস্থায় ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে পারবে কিনা বা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে কিনা এ প্রশ্নে তিনি ভোটারদের নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা চাই ভোটারদের উপস্থিতি, অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ একটা ভোট  হোক। এটা নিয়ে আমাদের নির্বাচনের কমিশনের মেসেজ হলো- সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। এতে কোনো ধরনের ব্যত্যয় হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা এটাই করব, এটা করার জন্যই সচেষ্ট। অবশ্যই আপনারা (ভোটার) কেন্দ্রে নির্ভয়ে আসবেন। গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওনাকে আমি বলেছি, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ যাতে কোনোভাবেই বিঘিœত না হয়। উনি আমাকে নিশ্চিত করে বলেছেন, ভোটাররা যাতে সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পারেন এ পরিবেশ নিশ্চিত করব। নির্বাচন কমিশনের একটাই বার্তা সেটা হলো সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিয়ে তারা চলে যাবেন। তারা যেন বলতে পারেন যে আমরা আমাদের ভোটটা দিয়েছি। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে অবশ্যই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা কি হবে তা আপনারা দেখতে পাবেন। 
রাশেদা সুলতানা বলেন, নির্বাচনের দিন গাজীপুর সিটি নির্বাচনও মনিটরিং করা হবে। অলরেডি কেন্দ্রে কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়ে গেছে। মনিটরিংয়ে আমরা যদি কোনো অনিয়ম পাই, তাহলে সেটা আমরা অবশ্যই আমলে নেব। এটার বিষয়ে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করব না। নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে মিটিং শেষে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পুলিশসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়েছেন কিনা, মালামালগুলো ঠিকমতো কেন্দ্রে গেছে কিনা, সিসি ক্যামেরা ঠিকমতো সেট করা হয়েছে কিনা, কিভাবে ওই ক্যামেরা কাজ করবে, আবার ক্যামেরায় বুথের ভেতরে দেখা যাবে কিনা এসব বিষয়ে তিনি খোঁজ খবর নেন।

×