ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত খরচ

ভোক্তার ঘাড়েই বোঝা

এম শাহজাহান

প্রকাশিত: ২৩:২৮, ৭ আগস্ট ২০২২

ভোক্তার ঘাড়েই বোঝা

গণপরিবহন সঙ্কটের কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী যাত্রীরা

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি ভোক্তাকেই বহন করতে হবে। এই বাড়তি দামের কারণে দেশে প্রায় সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। তবে শেষ পর্যন্ত কেউ লোকসানে পণ্য কিংবা সেবা বিক্রি করবে না। জ্বালানি তেলের সঙ্গে পণ্যমূল্য সমন্বয় করবেন ব্যবসায়ীরা। ফলে খরচের বোঝা এখন ভোক্তার ঘাড়েই। কৃষি কিংবা শিল্প খাতের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবচেয়ে বেশি বাড়বে ভোগ্যপণ্যের দাম। চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, মাছ-মাংস এবং মসলাপাতির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে কষ্ট বাড়বে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের। মহামারী কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে তিন কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছিলেন। কোভিড পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নসহ নানা কর্মসূচীর কারণে কিছুটা কম ছিল দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। কিন্তু এখন অতিরিক্ত ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সেই সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের কৃষি, শিল্প  ও পরিবহন খাত। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য নিরাপত্তা বলয় ভেঙ্গে পড়তে পারে, অন্যদিকে রফতানি পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শিল্প খাতের সক্ষমতা হ্রাস পাবে। পরিবহন খাতের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোগ্যপণ্যসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বহুলাংশে বেড়ে যাবে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে। এতে করে সমাজে দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা ও বৈষম্য বাড়বে। কমবে শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা।

এর পাশাপাশি আমদানি পণ্যের খরচ বেড়ে গেলে সব খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন,  জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। বিশেষ করে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে সারা পৃথিবীর অর্থনীনিতে অস্থিরতা রয়েছে। বাংলাদেশও সেই সঙ্কট থেকে মুক্ত নয়। এ অবস্থায় একবারে এতটা বাড়ানো ঠিক হয়নি। ধাপে ধাপে করা গেলে ভাল হতো। তবে বাজেটে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী রয়েছে। এ ধরনের মানুষকে বাড়তি খরচের চাপ থেকে স্বস্তি দিতে ভাতা ও ভাতাভোগীর সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। নিম্ন মধ্যবিত্তদের কিভাবে রক্ষা করা যায় সেটিও এখন সরকারকে ভাবতে হবে।

তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও এ খাতে সরকারের ভর্তুকি কমবে। ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। বাড়তি দামে তেল বিক্রি করে এক বছরে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ সরকার ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করবে। এতে করে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বড় অঙ্কের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়নে কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে সরকার। বাজেটের ব্যয় মেটানো সহজ হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়ার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ পেতে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যাবে। এদিকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের যে সাশ্রয় হবে, সে অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীগুলোর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষকে সরাসরি দেয়ার প্রস্তাব করেছেন। তারা নিম্ন আয়ের বয়স্ক, বিধবা, অন্তঃসত্ত্বা এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্যও সরকারের খরচ বাড়ানোর কথা বলছেন।
তাদের মতে, সাশ্রয়ী দামে খাদ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে, যেখানে গ্রাম ও শহরের নিম্ন আয়ের সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নইলে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি পরিস্থিতির বড় অবনতির শঙ্কা রয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের রেকর্ড বাড়তি দামের কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। করোনা পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পণ্য ও সেবার দাম অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে অনিবার্যভাবে কৃষিসহ নানা ধরনের ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন বাড়বে। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এফবিসিসিআই থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাড়তি খরচ দিন শেষে ভোক্তাকেই বহন করতে হবে। পরিবহন ব্যবসায়ী লোকসান দিয়ে গাড়ি চালাবে না, কিংবা রফতানিকারক লোকসান দিয়ে অর্ডার গ্রহণ করবে না। আবার, মুদি দোকানদার মুনাফা করেই চাল, ডাল, আটা কিংবা অন্যান্য পণ্য ও সেবা বিক্রি করবেন। কিন্তু আয় না বাড়লেও জীবনের তাগিদে একজন ভোক্তাকে বাড়তি খরচ করে এসব পণ্য ও সেবা কিনতে হবে। এ কারণে উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সরবরাহ চেনে কেউ যেন বাড়তি সুবিধা নিতে না পারে, তা সরকারকে নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনটি। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মোঃ জসিম উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, জ্বালানি তেলের বাড়তি এই দামের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বেই। যে কোন উৎপাদনে ডিজেল কিংবা অন্যান্য জ্বালানির প্রয়োজন হয়। ডিজেলের দাম বাড়ানোর ফলে পরিবহন খরচ অবধারিতভাবে বাড়বে। ফলে পণ্যমূল্যও বৃদ্ধি পাবেÑ এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ধীরে ধীরে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করতে পারলে ভাল হতো।
কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে ॥ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে আসছেন। এতে করে প্রতিটি বাজেটে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সার, ডিজেল ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ আমদানিতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এবার ৫০ শতাংশের ওপর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিরূপ প্রভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ইউরিয়া সার। কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, এক বিঘায় গড়ে ধান উৎপাদন হয় ২৫ মণ। এ ধান উৎপাদনে বর্তমানে ডিজেলে সেচ বাবদ খরচ হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। জ্বালানির দাম ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে এখানে খরচ বাড়বে ১ হাজার ৪৮৭ টাকা। এক বিঘা জমি তৈরিতে ট্রাক্টর বাবদ খরচ ১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৪২৫ টাকা। ৬০০ টাকার ধান মাড়াইয়ে বাড়বে ২৫৫ টাকা। সব খরচ যোগ করলে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে শুধু জ্বালানি বাবদ খরচ বাড়বে ৮৮ টাকা। এরপর ধান থেকে চাল হবে, বাড়তি পরিবহন খরচ দিয়ে সেই চাল আসবে বাজারে। এদিকে, ধান-চালসহ যে কোন পণ্য পরিবহনে ট্রাক-পিকআপ ভাড়ার ৪০ শতাংশ ধরা হয় জ্বালানি বাবদ। এখানে খরচ বাড়বে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে।

কারখানায়  ভোগ্যপণ্য উৎপাদনেও বাড়বে খরচ। আর দিন শেষে ভোক্তাকেই বহন করতে হবে সব বাড়তি ব্যয়ের বোঝা। কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হলে ডিজেলের ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ধান, চাল, ডাল, মাছ, মাংস, ব্রয়লার মুরগি, ডিম, শাক-সবজি এবং ডিমের উৎপাদন বাড়াতে হলে অবশ্যই কম মূল্যে কৃষক ও খামারিদের ডিজেল ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ ॥ কোভিড-১৯ পরিস্থিতির রেশ না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। গত দুবছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ভোগ্য ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে কষ্ট বেড়েছে বেশিরভাগ মানুষের। আয় না বাড়লে জীবন বাঁচাতে বেশি মূল্য দিয়ে খাদ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। এ অবস্থায় নতুন করে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও উস্কে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এ হার গত ৮ থেকে ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সর্বশেষ জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যসূচকে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। খাদ্যসূচকে গত বছরের একই মাসের চেয়ে বেড়েছে ৩ দশমিক ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট। আর জুলাইয়ে খাদ্যবহির্ভূত সূচকে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এ সূচকে এক বছরে বেড়েছে মাত্র ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। জ্বালানি তেল ও পরিবহন ভাড়া খাদ্যবহির্ভূত সূচকের মধ্যে পড়ে। ফলে এখন এ সূচকে বাড়তি চাপ তৈরি হবে, পাশাপাশি খাদ্যের দামও বাড়বে জ্বালানি তেলের কারণে। ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যদিও চলতি বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশের ঘরে মূল্যস্ফীতির হার রাখার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কিন্তু জ্বালানি তেল ও সারের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া এবং সামনের দিনগুলোতে বিদ্যুত ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আভাস সব মিলে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের ঘরে থাকবে না। এ ছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে সৃষ্ট বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে এমনিতে মূল্যস্ফীতির রের্কড সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। খাদ্য, পরিবহন ও বাসস্থান- এ তিনটি ছাড়া মানুষ চলতে পারে না।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। বাড়বে পরিবহন সেবার মূল্য এবং বাসস্থান ব্যয়ও। সব মিলে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়বে। এ প্রসঙ্গে বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব সবকিছুর ওপর পড়বে। পরিবহন খরচ ও পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে আগামী দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কয়েক দিন আগে সারের মূল্য বাড়ানো হয়। এতে কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি হবে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশে প্রায় সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাবে খরচ বাড়বে সাধারণ মানুষের। সড়ক ও নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে এবং কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুত উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে। এর ফলে বাস-লঞ্চ ভাড়ার পাশাপাশি তেলচালিত যানবাহনের খরচ বাড়বে। সেচে খরচ বাড়ায় শস্য ফলনের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় হবে কৃষকের। শিল্প এবং বিদ্যুত খাতে নতুন খরচ যোগ হওয়ার ফলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও বাড়বে। কোভিডের পর সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। বেড়েছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। বেসরকারী কয়েকটি গবেষণার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে করোনার কারণে গত দুই বছরে প্রায় ৩ কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। এমন অবস্থায় সীমিত আয়ের মানুষ শুধু মাসিক খরচই কমায়নি, সঞ্চয়ও ভেঙ্গে ভেঙ্গে খাচ্ছেন। চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন বা তাদের ঋণ বেড়েছে।
উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের সক্ষমতা হ্রাস পাবে ॥ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের সক্ষমতা হ্রাস পাবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানে নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৬৩ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬২ দশমিক ৯২ শতাংশ জ্বালানি ব্যবহৃত হয় পরিবহন-যোগাযোগ খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ তেল খরচ হয় কৃষিতে। বিদ্যুতে ১০ দশমিক ৩৫ এবং শিল্প খাতে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। বাসাবাড়িতে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। দেশে গত বছরও ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। এর বেশিরভাগই ডিজেল। যে খাতে তেলের ব্যবহার যত বেশি, সে খাতে এর প্রভাবও তত বেশি হবে। একটি পণ্যের দাম শুধু উৎপাদন নয়, পরিবহন ভাড়ার ওপরও নির্ভর করে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, চাহিদা মতো গ্যাস না পাওয়া, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে এমনিতেই উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার ওপর জ্বালানির দাম হঠাৎ এতটা বৃদ্ধির প্রভাবে উৎপাদন খাতের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান জনকণ্ঠকে বলেন, বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে, ঠিক তখন আমাদের দেশে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে হতবাক করেছে। এ সিদ্ধান্তের কারণে নিঃসন্দেহে চাপে পড়বে রফতানিমুখী শিল্প খাত। সার ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বড় ধরনের আঘাত করবে বোরো ধানের উৎপাদনকে। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। পাশাপাশি পণ্যবাহী পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে।
এদিকে, পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিজেলের নতুন দরের কারণে বাসের পাশাপাশি লঞ্চের ভাড়াও বাড়বে।

ট্রাক ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের খরচ বাড়বে আরও বেশি। রড, স্টিল, সিমেন্ট খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের উৎপাদন খরচ বাড়বে ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত। খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ও পরিবহন খরচ ১০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কাঁচামাল আনার সময় যেমন খরচ বাড়বে, প্রস্তুত পণ্য সরবরাহেও বাড়তি খরচ করতে হবে। এদিকে নিট পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ ও ওভেন পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর ঢাকা ও চট্টগ্রাম অংশ আলাদা আলাদা বিবৃতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উভয় সংগঠন দাবি করেছে, এ সিদ্ধান্তের কারণে চাপে পড়বে রফতানিমুখী শিল্প খাত। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, জ্বালানি তেলের দর পোশাক খাতে নতুন করে উদ্বেগ  তৈরি করেছে। উৎপাদন খরচ ব্যাপক হারে বেড়ে যাবে। ফলে নতুন করে রফতানি আদেশ নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, জীবন টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বল্প ও নিম্নআয়ের মানুষ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি কষ্টে থাকা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে কনজ্যুমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি তো বাড়ছে, এখন ১০ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি হবে। স্বাভাবিকভাবেই যাদের আয় সে হারে বাড়বে না, তাদের অবস্থার দ্রুত অবনতি হবে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, নির্ধারিত আয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীরা এ দুর্ভোগে পড়বে।