ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে

গম নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়ায় আগ্রহী আমদানিকারকরা

প্রকাশিত: ২৩:১৪, ২৪ মে ২০২২

গম নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়ায় আগ্রহী আমদানিকারকরা

হাসান নাসির, চট্টগ্রাম ॥ বৈশি^ক শস্য বাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের দখলে। যুদ্ধে বন্দর অবরুদ্ধ থাকায় ইউক্রেন থেকে গম রফতানি বন্ধ। অপরদিকে, রাশিয়ার গম রফতানি বন্ধ নেই। দেশটি তার নোভোরসস্কি বন্দর দিয়ে তুরস্ক, মিসর, লিবিয়া, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গম রফতানি অব্যাহত রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক লেনদেন সংস্থা ‘সুইফট’ থেকে বাদ পড়ায় মূল্য পরিশোধ নিয়ে রয়েছে ঝামেলা। রাশিয়ার ‘অবন্ধু’ তালিকায় বাংলাদেশ নেই। এক্ষেত্রে সরকার যদি একটা বোঝাপড়ায় আসতে পারে তাহলে গমের সমস্যা হবে না, এমনই মনে করছেন আমদানিকারকরা। এদিকে, বাজারে এখনও সঙ্কট নেই বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সঙ্কট না থাকলেও মূল্যের উর্ধগতি কেন, এ প্রশ্নেরও কোন যৌক্তিক উত্তর নেই। ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জের বড় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে গমের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কারণ অর্থবছরের প্রথম দশমাসেই প্রায় সারা বছরের গম চলে এসেছে। অনেক গম পাইপ লাইনে রয়েছে। ভারত রফতানি বন্ধ করলেও যে এলসিগুলো এর মধ্যে খোলা হয়ে গেছে সেগুলোর বিপরীতে গম আসবে। তাছাড়া জরুরী প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশকে গম সরবরাহ করা হবে বলে ভারতের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে গত এক সপ্তাহে ভারত থেকে এসেছে ১ লাখ ২ হাজার মেট্রিক টন গম। এরমধ্যে গত শনিবার আসে ৫২ হাজার টন এবং গত সপ্তাহে আসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন। আরও একলাখ টন গম নিয়ে আসছে দুটি জাহাজ। গমের বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থবছর হিসেব করলে আগামী জুন মাস পর্যন্ত গমের সঙ্কট হওয়ার কথা নয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যে শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে গমের বাজারে। অর্থাৎ আগামী দুমাস পর গমের প্রাপ্যতা এমন থাকবে কিনা তা নিয়ে চিন্তায় অনেকেই। নানা পরিপ্রেক্ষিতে এরমধ্যে গমের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খুচরা পর্যায়ে আটা ও ময়দার ওপর। উৎস থেকে গমের জোগান ঠিক থাকবে, এই নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা গেলে দাম আর বাড়বে না, বরং নিম্নমুখী হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের মধ্যেও রাশিয়া বরং আগের বছরের চেয়ে রফতানি বাড়িয়েছে। রাশিয়া থেকে গম, ভুট্টা, তেল বীজসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য গত এপ্রিল মাসে যে পরিমাণ রফতানি হয়েছে তা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। ইউক্রেনের বন্দর অবরুদ্ধ থাকায় রাশিয়া থেকে রফতানি বেড়েছে। র‌্যাপিড ক্লিপের আওতায় এই খাদ্য রফতানি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, রাশিয়া এবার রেকর্ড পরিমাণ খাদ্য রফতানির টার্গেট নিয়েছে। ব্যবসায়ীদের অন্যতম শীর্ষ সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে ইউরোপে কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে তা যথেষ্ট নয়। তাই হাত গুটিয়ে থাকা ঠিক হবে না। বিশে^র প্রায় সকল দেশই বিকল্প পথ খুঁজছে। আমাদেরও ভাবা উচিত। রাশিয়ার কাছে গম রয়েছে, দেশটি রফতানিও করছে। উৎপাদিত গম তারা বিভিন্ন দেশে রফতানির পথ খুঁজছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও সে দেশ থেকে আমদানি অব্যাহত রেখেছে। রাশিয়ার দূতাবাসের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে বাংলাদেশকে অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সরকার বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। জরুরী খাদ্যপণ্য হিসেবে গম আমদানির বিষয়টিও ভাবা দরকার বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। ব্যবসায়ী সমাজের এ নেতা বলেন, আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, প্রয়োজন হলে রুবল বা বিকল্প মুদ্রায় আমদানি করতে হবে। কারণ, খাদ্যের চেয়ে জরুরী আর কিছু হতে পারে না। প্রতিবেশী দেশ ভারত এমনকি বৈরী প্রতিপক্ষ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও যদি রুবলে আমদানি করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না। তবে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, তা একান্তই সরকারের বিষয়। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বার্ষিক গমের চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ টন। সে হিসেবে প্রতিমাসে ৬ লাখ টনের কিছু পরিমাণ বেশি গমের প্রয়োজন হয়। অর্থবছরের প্রথম দশমাসে ৫৬ হাজার টন গম এসে গেছে। দেশে উৎপাদন হয় ১০ থেকে ১২ লাখ টন। ভারত গম রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও পাইপ লাইনে থাকা গম এবং এলসি না হলেও চুক্তিপত্র সম্পন্ন হয়ে গেছে এমন চালানগুলো নিশ্চিত করা গেলে সঙ্কট থাকবে না। আমদানিকারকরা বলছেন, এক্ষেত্রে আসল ভূমিকাটা সরকারকেই নিতে হবে। রাশিয়া থেকে গম আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য পরিশোধ কোন পদ্ধতিতে হবে সে এখতিয়ার একান্তই সরকারের। দেশটির পক্ষ থেকে জ¦ালানি তেল কেনার যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সেটি গমের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ফল আনতে পারে, এমনই আশা আমদানিকারকদের। যেহেতু খাদ্য একটি অপরিহার্য পণ্য, সেহেতু যে কোন উপায়েই হোক একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।