ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

চীনের বিচিত্র সৌরভের কাহিনী

প্রকাশিত: ২১:৩৬, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১

চীনের বিচিত্র সৌরভের কাহিনী

১৮০ বছর আগে ১৮৪০ সালে বাংলা সাহিত্যে প্রথম ভ্রমণকাহিনী লিখেছিলেন বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৮৭-১৯৪৯)। সাতাশ দিনে নৌপথে ‘কালনা থেকে রংপুর’ গিয়েছিলেন তিনি। সার্থক ভ্রমণকাহিনী ‘পালামৌ’ (১৮৮০) রচিত হলো এর ৪০ বছর পর সঞ্জিবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৪০-১৮৮৯) হাতে।) ‘পালামৌ’ সাধু ভাষারীতিতে লেখা হলেও এতে রয়েছে সাবলীল ও শৈল্পিক উপস্থাপনা। এর বর্ণনা নাটকীয়, রসাত্মক ও কৌত‚হলোদ্দীপ্ত। পাহাড়, নদী, গাছপালা, বিচিত্র জীবনযাপন, কুসংস্কার, কোল সম্প্রদায়ের বিচিত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরিবেশের অবস্থান ইত্যাদি এই আখ্যানে উঠে এসেছে তার সুনিপুণ কলমে। বাংলা-সাহিত্যে সৈয়দ মুজতবা আলী আর হুমায়ূন আহমেদের ভ্রমণকাহিনী আমার কাছে আলাদা স্বাদের মনে হয়। তাদের ভ্রমণকাহিনী উপস্থাপনশৈলী, রস ও হিউমারে ভরা। গত বইমেলায় প্রকাশিত সেলিম সোলায়মানের ভ্রমণকাহিনী ‘ফরাসী সৌরভের দেশে দিয়াঞ্চির তীরে’ পড়ে অপূর্ব ভাললাগার এক অনুভ‚তি জড়িয়ে রেখেছে আমাকে। এই গ্রন্থের নাম এবং সূচির ৩৩টি শিরোনাম থেকে গ্রন্থটির বিষয়বস্তু, ঘটনা ও কাহিনী বুঝতে পারা যায় সহজে। শিরোনামগুলোতে চোখ রাখলে সামনের ঘটনাগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে মনের আয়নায়। চমৎকার এসব শিরোনামে বিন্যস্ত এই ভ্রমণালেখ্যে চিন ভ্রমণের অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গ ভাষাগত বিভ্রাট নিয়ে নানা বিড়ম্বনার কথা এসেছে, তেমনি এসেছে তা নিয়ে পদে পদে আশঙ্কা গ্রস্ততার কথাও। গল্পের ভঙ্গিতে চিন আর বাংলাদেশের নানা সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বাতাবরণের তুলনামূলক চিত্রও পাওয়া যায় গ্রন্থে। বাদ যায়নি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যার বিষয়ে চীনের প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রসঙ্গটিও। ভোগবাদী অর্থনীতির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কথা, আর সে পথে হালে পা বাড়িয়ে সেই অর্থনীতির অনিবার্য প্রভাবে এক-কালের সমাজতান্ত্রিক চীনের মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যে বদলে গেছে দৈনন্দিন জীবনাচরণের সংস্কৃতি, তাও এসেছে ‘ফরাসী সৌরভের দেশে দিয়াঞ্চির তীরে’। আবার খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে নিজ দেশেরই প্রজন্মে প্রজন্মে ঘটে যাওয়া জেনারেশন গ্যাপের কথা, ঘটেছিল যা লেখকের সঙ্গে তার পিতার প্রথমে, অতঃপর ঘটছে এখন তার সঙ্গে তার পুত্রদের, যারা নাকি ডিজিটাল সময়ের প্রজন্ম। ক্ষণে ক্ষণে ব্যঙ্গ, রস আর কৌতুকের ঢঙ্গে উন্মোচিত হয়েছে আমাদের সমাজের, পরিবারের নানা সত্য। বাদ যায় না তাতে চিরাচরিত স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার অ¤øমধুর সম্পর্কের কথাও। বইয়ের ‘ফরাসী সৌরভের দেশে দিয়াঞ্চির তীরে’ কিন্তু এই ফরাসী সৌরভের দেশ ফ্রান্স নয়, চীন। চীনের দিয়াঞ্চির তীরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এর আখ্যান। লেখকের আলোচনায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কার, মালেশিয়া, তাইওয়ানসহ বহু দেশ। চীন দেশকে চেনে না এমন বাঙালী খুঁজে পাওয়া ভার। লেখক বিভিন্ন পর্বে তুলে ধরেছেন বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। যে কেউ পড়তে পড়তে হারিয়ে যাবে অজানা মনোমুগ্ধকর সব বিষয়ের মধ্যে। শতশত বছর আগের খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচয় ঘটবে। পরিচয় ঘটবে ফুল-ফল, প্রকৃতি, উঁচু পাড়, পরিবেশ, কসমেটিক্স, ড্রেস, ওষুধ ইতাদির সঙ্গে। সৌরভের দেশ হিসেবে ফ্রান্সকে সকলেই জানেন কিন্তু লেখক চীনকে চিনালেন অন্যভাবে। এই সৌরভের নেপথ্য কথাও জানা গেল এই গ্রন্থে। চীনের ভুবনবিখ্যাত জেসমিন ফুলের কাছে ফ্রান্স ঋণী। লেখক লিখেছেন, ‘শতশত বছর ধরে ফ্রান্সের উৎকৃষ্টমানের সোনার চেয়ে দামী সুগন্ধির সৌরভও কিন্তু ঋণী হয়ে আছে এই চায়নারই কানমিংয়ের জেসমিনসহ আর সব নানা ফুলের সৌরভের সম্ভারের কাছে। প্রতিটি পর্বের বর্ণনাও বেশি বড় না যে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। কাহিনীর বর্ণনার উপস্থাপন শৈলী হিসেবে লেখক প্রবন্ধ, গল্প ও কাব্যিকতার আশ্রয় নিয়েছেন। মাঝে মাঝে যেসব চরিত্র ও সংলাপ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভ্রমণকাহিনীতে লেখক উপস্থিত থাকেন বলে ভ্রমণকাহিনী উত্তম পুরুষে লেখা হয় সাধারণত, লেখক এখানেও মুনশিআনা দেখিয়েছেন। গ্রন্থের নামে তীর থাকলেও ভেতরের সব স্থানে লেক বা লেইক রয়েছে। বানান, শুদ্ধ শব্দ এবং শুদ্ধবাক্য ব্যবহারে কোথাও কোথাও একটু ছন্দপতন রয়েছে। বইটির মনকাড়া প্রচ্ছদ এঁকেছেন এ সময়ের খ্যাতিমান শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। গ্রন্থটি পাঠে অন্য এক ভুবনের বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবে পাঠক। (ফরাসী সৌরভের দেশে দিয়াঞ্চির তীরে, সেলিম সোলায়মান, উৎস প্রকাশন, ২০২১ মূল্য : ৩৫০) হাসান রাউফুন
×