কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী প্রকৃত অর্থেই প্রান্তিকজনের কথক। সাধারণ মানুষ যারা গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দা, তাদের নিয়েই তিনি লিখেছেন। তার শারীরিক উপস্থিতি যেখানে থাক না কেন, হৃদয় ও চেতনাজুড়ে প্রান্তিকজনের উপস্থিতি ছিল প্রবলভাবে। সবসময়। লেখক হিসাবে এসব সাধারণ মানুষের নিত্য জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা, টানাপোড়েন, স্বপ্ন ও স্বপ্নহীনতার কষ্টকে তিনি সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। সময়ের বিবর্তনে আজ সে গ্রামীণ জনজীবনের অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন কমবেশি আকাশ ছুঁতে চায়, চায় আধুনিকতার সমৃদ্ধিতে জীবনের রঙ পাল্টাতে। প্রগতি, উন্নয়নের পথ ধরে পেরুতে চায় অনন্য দিগন্ত। তাই সর্বত্রভাবে না হলেও প্রত্যাশার এ গণ্ডি বৃত্তাবদ্ধ থাকেনি। আধুনিককালে শহর, গ্রামীণ জীবনেও স্বাভাবিকভাবে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও শেকড় বিছিন্ন হয়নি গ্রামীণ জনপদ। মূল্যবোধ ও সংবেদের ক্ষেত্রে আসেনি আমূল পরিবর্তন। বুলবুল চৌধুরী তার সৃষ্টিতে সমকালের সে জীবনকে অনুসন্ধান করেছেন। সে চিত্র তুলে ধরেছেন তার অভিজ্ঞতা ও মৃত্তিকা মনন গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। একজন জীবনবাদী শিল্পী হিসেবে এ অন্বেষণ তাকে বার বার জনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। এ সম্পৃক্ততা ও মনোনিবেশ তার কথাসাহিত্যের প্রাণ প্রবাহ হিসাবে কাজ করেছে। এ বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তার সৃষ্টি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবন উপাখ্যানে পরিণত হয়েছে।
বুলবুল চৌধুরী তার সাহিত্য কর্মে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্মমূলের স্পন্দনকে তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন সবসময়। জীবনের অনেকগুলো দিন তিনি সে পথে হেঁটেছেন।
নিগূঢ়তম বাস্তবতা, অদৃশ্য গোপন হাহাকার, মানবীয় বোধের অব্যক্ত আর্তি সাহিত্যের সম্ভারে ব্যক্ত করেছেন। কালো অক্ষরে সেই সব মানুষের কথা, জীবন চিত্র পরম মমতায় ও নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। তার লেখায় চিরচেনা গ্রামীণ জীবন, নিত্য জীবনের দোলাচল, প্রেম-বিচ্ছেদ, আনন্দ, হাসি, গান চিরন্তন আবহে জীবন্ত হয়ে ওঠেছে। সেই সঙ্গে গ্রামীণ পরিবেশ ও প্রকৃতিকে বিস্ময়কর তমোহরে তিনি সজীব করে তুলেছেন। যেন বৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেছেন, সাঁতারের বর্ণনায় পাড়ি দিয়েছেন বর্ষা জলের নদী। তার দৃষ্টিতে সব সময় মিশেছিল বহমান নদী, শস্যভরা মাঠ, সাধারণ মানুষের দিনযাপনের চিত্র, উন্মোচিত স্বপ্নময় চোখ। এভাবেই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি হয়ে উঠেছেন সাধারণ তথা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রূপকার।
‘টুকাকাহিনী’ গল্পগ্রন্থের মধ্য দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। তার আগেই ‘টুকাকাহিনী’ গল্প লিখে তিনি সরব যাত্রার ইঙ্গিত দেন। পাঠক ও বোদ্ধা মহলের সতর্ক দৃষ্টিতে তিনি চলে আসেন। সাধারণের জীবনের যাপিত দিন- রাত্রির কাহিনী চলে আসে তার সাহিত্যে। চরিত্রের গভীরে সহজে প্রবেশ করেন তিনি। যেন নিজ চোখে সব দেখছেন। কাছে বসে সব শুনছেন। শুনছেন অনাদিকালের জীবনের ধ্বনি। নিত্যদিনের চাওয়া-পাওয়া, বেঁচে থাকার দুর্নিবার আকাক্সক্ষাকে তিনি সাহিত্যের প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত করেছেন। তার প্রতিটি লেখায় তার প্রতিফলন লক্ষণীয়। আঞ্চলিক ভাষা, শব্দাবলীর প্রয়োগ তার কথাসাহিত্যকে যেমন সাধারণের বোধ ও চিন্তাকে সহজবোধ্য করে তুলেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে এক সর্বজনীন সাহিত্যমূল্য। এটি তার লেখক সত্তার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এভাবে তিনি প্রান্তিকজনের একজন নিপুণ রূপকারে নিজেকে মেলে ধরেছেন। যেমনÑ ‘আবার মনে পড়ল, ঘরের কোণায় একটা কুনোব্যাঙ আছে। ঘরের বাইরে ফেলে দিয়েছিল সে। আবার ফিরে এসেছে। টুকা উঠতে চাইল। পারল না। শুনতে চাইল। শুনল না। ফালি চাঁদ ছিল আকাশে। এখনও কী তা জেগে আছে! (টুকা কাহিনী)।
সাধারণ মানুষের জীবন উপাখ্যানই কথাসাহিত্যে তার প্রধান প্রতিপাদ্য। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি এ পথে মগ্ন থেকেছেন। একে একে প্রকাশিত হয় তার গল্পগ্রন্থ ‘পরমানুষ, মাছের রাত, চৈতার বউ গো, উপন্যাস, ‘কহকামিনী, পাপপুণ্যি, ‘অপরূপ বিল ঝিল নদী, তিয়াসের লিখন, অচিনে আঁচড়ি, ‘এই ঘরে ল²ী থাকে, ‘মরম বাখানি’, ইতু বৌদীর ঘর ও দক্ষিণা বাও। শিশু কিশোরদের জন্য তার লেখা, ‘গাঁওগেরামের গল্পগাথা, ‘নেজাম ডাকাতের পালা’, ভালো ভ‚ত, ‘প্রাচীন গীতিকার গল্প’ প্রভৃতি। আত্মজৈবনিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তার ‘জীবনের আঁকিবুকি’ ও ‘অতলের কথকতা’।
কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার, জসীমউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার, ব্রাক ব্যাংক- সমকাল সাহিত্য পুরস্কার।
জন্ম : ১৬ আগস্ট ১৯৪৮,
মৃত্যু ২৯ আগস্ট ২০২১।
বুলবুল চৌধুরীর বিদায়ে আমাদের কথাসাহিত্যের এক অনন্য বিভা ব্যক্তিত্বকে আমরা হারালাম। গ্রামীণ সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনের রূপকার, সারল্যগাথার নিমগ্ন কথক আর কোনদিন কলমে সরব হয়ে উঠবেন না। তবে তিনি ধ্বনিত হবেন তার সৃষ্টির বৈভবে। আমাদের কথাসাহিত্য ও মননের পরিশুদ্ধ আবেগে।








