আমার বয়স যখন আঠারো থেকে বিশ বছর, তখন থেকে আমি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের ভীষণ অনুরাগী হয়ে পড়ি। আমার বিশ্বাস ভারতীয় সংগীত শিল্পীদের মধ্যে তাঁর মতো জাদুকরী মোহনীয় কণ্ঠস্বরের শিল্পী তাঁর আগে অথবা পরে আজ পর্যন্ত কেউ আসেনি।
তাঁর গাওয়া গান:
“যখন বাজবে বাঁশি,
তখন রাধা যাবে যমুনায়।
জ্বলে পুড়ে মরল রাধা,
যৌবনের জ্বালায়।”
অথবা
“ও আকাশ প্রদীপ-জ্বেল না,
ও বাতাস আঁখি মেল না,
আমার প্রিয়া লজ্জা পেতে পারে।”
অথবা
“হায় আপনা দিল তো আওয়ারা
...
বহুত তো সমজা এহি নে সমজা।”
এসব গান শুনলে আমার মনোপ্রাণে এমন এক অনুভ‚তির সৃষ্টি হতো যে, তা তো ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। ভালো গান শুনলে স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে মনে প্রশান্তি এনে দেয়। এজন্যই বাচ্চাদের গান শুনিয়ে শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। সম্প্রতি মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের লেখায় পড়েছি, গানের সুরালো-ধ্বনি ব্রেনের নিউরন ও কোষের উপর যে প্রভাব ফেলে তাতে মেধা এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়।
বহু বছর আমার ছোট আকারে একটি ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল। এর মঙ্গে আলাদা দু’টি স্পিকার এবং ছিল একটি হেডসেট।
কাঁধে ঝোলানোর মতো আমার একটা ব্যাগ ছিল। যখন ফ্লাইট নিয়ে বিদেশে যেতাম তখন হোটেলের রুমে থাকলে, স্পিকারদ্বয় ক্যাসেট প্লেয়ার সংযুক্ত করে হেমন্তকুমার বা কিশোরকুমারের গান শুনতাম। এছাড়া রবিশঙ্করের সেতার এবং ওস্তাদ আলাউদ্দিনের সরোধ শুনতাম। হোটেলের বাইরে গেলে, আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে ওই ক্যাসেট প্লেয়ার এবং হেডসেট নিয়ে বেরোতাম।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি দু’দফায় ছিলাম ভারতীয় ব্যারাকপুর বিমানঘাঁটিতে। ওই বিমানঘাঁটি কলকাতা শহর থেকে ছিল মাত্র দশ-বারো মাইল দূরে। তাই ডিউটি না থাকলে চলে যেতাম কলকাতা শহরে। ওখানে গেলে সবচেয়ে বেশি যেতাম প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী পৃতিশদে-র বাসায়। তিনি আমার চেয়ে প্রায় বিশ বছরের বড় ছিলেন। তবু আমাদের সম্পর্ক ছিল সমবয়সী বন্ধুর মতো। তখনো তিনি অবিবাহিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি মনিকা নামের একজন জার্মান মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন।
পৃতিশদে-র ডাকনাম ছিল, তান্তু। তান্তুদার মাধ্যমে আমি সত্যজিৎ রায়, পরিতোষ সেনদের মতো বিখ্যাত লোকদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম।
একাত্তর সালের নভেম্বর মাস। একদিন বিকেলে গেলাম তান্তুদার বাসায়। তাঁকে বললাম, আমার খুব ইচ্ছে হয় হেমন্তকুমারের সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু তাঁর বাসার ঠিকানা তো জানা নেই। তান্তুদা বললেন, তা, যাবি, তো, যা। তাঁর বাসা তো কাছেই। ওই যে মানসী-সিনেমা হলটা আছে, ওখানেই। সিনেমা হলটার কাছে গিয়ে যাকে জিজ্ঞেস করবি, সেই দেখিয়ে দেবে। হেমন্তকুমার বড় ভালো মানুষ। কোনো অহংকার নেই। যে কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারে।
হেমন্তকুমারের বাসায় গিয়ে তাঁর পদধূলি নিয়ে বললাম-আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বহুদিনের ইচ্ছা, একবার আপনার সঙ্গে দেখা করব। আমি যে মুক্তিযোদ্ধা সেটা প্রমাণ করার জন্য আমার আইডি কার্ড দেখালাম। ওই কার্ডে আমার ছবি এবং নাম লেখা ছিল, ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট এস এন বিশ্বাস।
আমার আসল নাম আলমগীর সাত্তার। আমি ব্যারাকপুর ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে আছি বলে ওই নামে আমাকে আইডি কার্ড করে দিয়েছে। ওই বিমানঘাঁটি থেকে বাইরে আসতে-যেতে হলে ঘাঁটির প্রবেশদ্বারে ডিউটিরত বিমানবাহিনীর সিকিউরিটি বিভাগের লোকদের দেখাতে হয়। আমাকে যে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে সেটা সম্পন্ন করার জন্য নামের এই গোপনীয়তা রক্ষা করতে হচ্ছে।
হেমন্তদার বাসায় আধা ঘণ্টা অবস্থান করার পর তান্তুদার স্টুডিওতে ফিরে এলাম। তান্তুদার বাসার সামনের রাস্তার উল্টো দিকে ছিল তাঁর স্টুডিও ঘর। তাঁর ছবির মডেল যারা হতো সেসব সুন্দরী মেয়েদের দু’একজন প্রায়ই তাঁর স্টুডিওতে আসত। পানীয় পানের ব্যবস্থা ছিল। তাই ওই স্টুডিওতে দু’এক ঘণ্টা কাটিয়ে আমি ব্যারাকপুর ফিরে যেতাম।
দুই
লন্ডন। ১৯৭৭ সাল। ওই শহরে নিশিথ গাঙ্গুলি নামের আমার এক বন্ধু ছিলেন। তিনিও আমার চেয়ে দশ-বারো বছরের বড় ছিলেন। ছিলেন অবিবাহিত। ‘হেমন্ত-নিশিথ’ নামে ছিল তাঁর একটা ট্রাভেল এজেন্সি। হেমন্তদাকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে, নিজের মালিকাধীন ট্রাভেল এজেন্সির নাম রেখেছিলেন ‘হেমন্ত-নিশীথ ট্রাভেল এজেন্সি’। তখনো বাংলাদেশ বিমানের নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালু হয়নি। তাই লন্ডন-নিউইয়র্কের টিকিট কিনতে গিয়ে নিশিথদার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।
সারা রাত জেগে ফ্লাইট করেছি। সকালে হোটেলে পৌঁছে কিছু খেয়ে নিয়ে একটানা ঘুমিয়েছি। সন্ধ্যায় নিশিথদাকে টেলিফোন করলাম আজ সকালে লন্ডন এসেছি। তিনদিন থাকব। হাতে সময় থাকলে, আসুন না, আমার হোটেলে। একসঙ্গে কিছুটা পানীয় পান করা যাবে।
নিশিথদা বললেন, আজ আমি আসতে পারব না। বরং আপনিই আমার বাসায় আসুন না! হেমন্তকুমার এসেছেন। বেশ কয়েকজন অতিথিরা আসবেন। হেমন্তদা যে সবাইকে কিছু গান গেয়ে শোনাবেন, অতিথিরা তেমনটা অবশ্যই আশা করতে পারেন। এখানে পাঠকদের বলে রাখি, হেমন্তদা লন্ডনে গেলে নিশিথদার বাসাই অবস্থান করতেন।
সন্ধ্যা আটটায় নিশিথ গাঙ্গুলির বাসায় পৌঁছে দেখলাম, বাসার সামনে কয়েকখানা গাড়ি দাঁড় করে রাখা হয়েছে। এর চেয়ে বড় কথা হলো, নিশিথদার বাসার বসার ঘরের উজ্জ্বল আলোর মাঝে হেমন্তদাকে দেখে চিনতে পারলাম। তিনি উচ্চতায় ছিলেন প্রায় ছয় ফুট। তাই সবার মাঝে বসা থাকলেও তাঁকে চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না।
বসার বৈঠকখানা ঘরে আমি যখন প্রবেশ করলাম, দশটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও হেমন্তদা আমাকে চিনতে পারলেন। নিশিথদার আর আমাকে হেমন্তদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হলো না। কুশল বিনিময়ের পর হেমন্তদা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় বিমানবাহিনী আমার কি নামে যেন আইডি কার্ড করে দিয়েছিলেন। আমি বললাম, ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট এস এন বিশ্বাস। বাকিটা হেমন্তদাই সবাইকে বললেন।
অতিথিদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে নিয়ে হেমন্তদার পাশে বসিয়ে দিলেন। তারপর একখানা ছবি তুললেন। ছবিখানার একটা কপিও আমি অনেক চেষ্টা করে সংগ্রহ করতে পারিনি। যিনি ছবি তুলেছিলেন, তিনি লন্ডন শহর থেকে কিছুটা দূরে থাকতেন। তাঁকে টেলিফোন করে ছবির কথা জিজ্ঞেস করলে বলতেন, আমি নিশিথের কাছে পৌঁছে দেব।
তিন
১৯৮৭ সাল। আবার দশ বছর পর হেমন্তদার সঙ্গে দেখা হলো তাঁর মুম্বাইর বাসায়। এর আগে হেমন্তকুমারের একমাত্র কন্যা রানুর বাসায় একদিন গিয়েছিলাম। ওই সময় হেমন্তদার সঙ্গে দেখা না হওয়ার কারণ, তিনি তখন ছিলেন কলকাতায়।
১৯৮৭ সালের কথা বলছি। বিকেল বেলা সলিল ঘোষ (দেশ পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক সাগরময় ঘোষের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ জন) মুম্বাই-এ আমার হোটেলে এলেন। তাঁকে বললাম, হেমন্তদার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। তিনি বললেন, চলুন, আমার সঙ্গে। আমি তো ওই দিকেই থাকি।
সলিলদার একখানা পুরানো গাড়ি ছিল। অর্ধেক পথ যাওয়ার পর, তাঁকে বললাম, আমরা কি অল্প সময়ের জন্য রানুর বাসা হয়ে যেতে পারি? সলিলদা বললেন, তা অবশ্যই যাওয়া যেতে পারে। রানুর বাসায় যাওয়ার ইচ্ছার কারণ ছিল, ওর স্বামী গৌতমের জন্য আমি এথেন্স থেকে এক বোতল ফাইভ স্টার ম্যাটেক্সা ব্রান্ডি এনেছিলাম, সেটা দিয়ে যাওয়া।
রানুর বাসায় যাওয়ার পর গৌতমকে ওই পানীয় বোতলটি যখন দিতে যাচ্ছিলাম, তখন সে বলল, রানুর কাছে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, আর কোনো দিন অ্যালকোহল স্পর্শ করব না। তখন সলিলদাকে বললাম তবে এটা এখন আপনিই গ্রহণ করুন।
রানুর সঙ্গে সলিলদাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললাম, আমরা হেমন্তদার বাসায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। তুই আমাদের সঙ্গে চল। রানুকে আমি ‘তুই’ বলে সম্বোধন করার কারণ ছিল ওকে আমি ছোট বোন বলে মনে করতাম।
এর মধ্যে চা এবং বিস্কুট এসে গেল। কথা প্রসঙ্গে রানু বলল, ১৯৭৩ সালে পিতার সঙ্গে সে যখন ঢাকায় এসেছিল, তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল।
রানুর সঙ্গে তার পিতার সম্পর্ক দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে ভালো যাচ্ছিল না। রানু প্রেম করে গৌতম মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে করেছিল। হিন্দুধর্মে একই পদবীধারীদের মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক হয় না। বিয়ে করতে হলে পাল্টি ঘর হতে হবে। এই কারণে গৌতমের সঙ্গে রানুর বিয়েকে হেমন্তদা মেনে নিতে পারেননি। এসব কথা আমার এমনকি সলিলদারও জানা ছিল। তবু রানুকে বললাম, আমার সঙ্গে চল। প্রথমে ও রাজি হচ্ছিল না। আমি যখন অনেক জোরাজুরি করলাম, তখন ও রাজি হলো।
রানুকে নিয়ে যখন হেমন্তদার বাসায় পৌঁছুলাম, তখন তিনি কেবল তাকিয়ে রইলেন। তারপর সোফায় বসা থেকে উঠে এসে রানুকে জড়িয়ে ধরলেন। পিতা এবং কন্যা দুজনেই চোখের জলে ভাসছিলেন। যখন আমাকে দেখলেন, তখন বুঝলেন, আমিই রানুকে জোর করে তাঁর বাসায় নিয়ে গিয়েছি। আর রানুকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বাসায় যাওয়ায় আমি হেমন্তদার একান্ত ভালোবাসা এবং স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছিলাম। ওই দিনের পর হেমন্তদা আর মাত্র তিন বছর বেঁচেছিলেন। ১৯৮৭ সাল থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত হেমন্তদার সঙ্গে আমার মাত্র তিনবার দেখা হয়েছে। দুবার মুম্বাইতে এবং একবার কলকাতায়। শেষবার দেখা হয়েছিল কলকাতায়। দিনটি ছিল পহেলা বৈশাখ। ফুল হাতে নিয়ে অনেক লোক আসছিল তাঁকে শুভাশিষ জানাতে।
চার
বিগত শতাব্দীর আশির দশকে হেমন্তদাকে ভারত সরকার ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করতে চেয়েছিল। তখন হেমন্তকুমার শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ শিল্পী এবং সুরকার হিসাবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন। যা জাতীয় পুরস্কারের সমান। হেমন্তকুমার আশা করেছিলেন, ‘পদ্মশ্রী’র চেয়ে উচ্চতর পুরস্কার তাঁকে দেওয়া হবে। তাই তিনি সরকারের দেওয়া ওই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। অবশ্য এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মান সূচক ‘ডিলিট ডিগ্রি’ দিয়েছিলেন।
হেমন্তকুমার আÍজীবনীমূলক ‘আনন্দধারা’ এবং ‘লিখিছিনু লিপিখানি’ নামের দু’খানা বই লিখেছিলেন। তিনি বই দু’খানা আমাকে উপহার হিসাবে দিয়েছিলেন। প্রথম পৃষ্ঠায় লিখেছিলেন ‘দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুবর আলমগীর সাত্তারকে’। বই দু’খানা আমার বড় ছেলে ডা. অঞ্জন সাত্তার আমেরিকায় নিয়ে গেছে। বই দু’খানা পেলে আবার হেমন্তকুমারের উপর আর একটি নিবন্ধ লেখার ইচ্ছে আছে।
আমার স্ত্রী-তাহমিনা তিন চার বছর যাবৎ উৎঁম জবংরংঃধহঃ য²া রোগে ভুগছিল। এর সঙ্গে ডায়াবেটিস এবং ছিল অ্যাজমাও।
১৯৯০ সালে আমার স্ত্রীর শরীর একটু ভালো দেখে আমি আমস্টারডামে ফ্লাইট নিয়ে গেলাম। আমস্টারডামে পৌঁছানোর পরের দিনেই বাংলাদেশ বিমানের ঢাকার হেড অফিস থেকে টেলিফোন পেলাম, আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমি যেন সরাসরি ঢাকায় চলে আসি। আমার স্থানে অন্য ক্যাপ্টেনকে পাঠানো হচ্ছে, ফ্লাইট পরিচালনা করে নিয়ে আসার জন্য।
আমি সরাসরি ঢাকায় চলে এলাম। বাসায় একটুও দেরি না করে স্ত্রীকে দেখার জন্য হাসপাতালে চলে গেলাম। দেখলাম, আমার স্ত্রীর অবস্থা মোটেই ভালো না। আমি তাঁর হাত ধরে বসে রইলাম। আমার স্ত্রী বলল, আলমগীর, আমি আজই মারা যাব। আমি প্রশ্ন করলাম, এমন কথা বলছ কেন? সে বলল, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। এই কয়েকটা কথা বলতেই তার খুব কষ্ট হলো।
বাসায় যখন খাবার খেতে এসেছিলাম, তখন ক্যাপ্টেন শাহাব টেলিফোন করে বলল, হেমন্তকুমার ঢাকায়, তা ততো জান? বললাম, জানি। তবে আমার বউয়ের শারীরিক অবস্থা এমন যে, যে কোনো সময় মারা যেতে পারে। দুপুর বেলায় হেমন্তদা ঢাকা থেকে কলকাতায় চলে যান। আর ওই রাতেই আমার স্ত্রীও মারা যায়। দিনটি ছিল ৫ নভেম্বর ১৯৯০ সাল। ঢাকা থেকে কলকাতায় যাওয়ার চৌদ্দ দিন পর হেমন্তদাও মারা যান।
আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমি পঁচিশ বছর ঘর-সংসার করেছি। তাই তার মৃত্যুতে যে দুঃখ পাব সেটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তিনি ছিলেন আমার তিন সন্তানের জননী।
স্ত্রীর মৃত্যুর বিশ দিন পর লন্ডন গেলাম ডিসি-১০ এরোপ্লেনের সিমুলেটর ট্রেনিং গ্রহণ করতে।
লন্ডন গিয়ে রাতের বেলায় যখন ঘুমুতে গেলাম তখন শিয়রের বালিশের নিচে আমার ছোট ক্যাসেট প্লেয়ারটি চালু করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
১৯৬৫ সালে আমি বিয়ের পর তেজগাঁওয়ের তেজকুনি পাড়ায় একটি কাঠের দোতলা ঘর ভাড়া নিয়ে বাস করছিলাম। রাতের বেলায় ক্যাসেট প্লেয়ারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ছিল ঐশ্বরিক।
সিমুলেটরের প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে রাতের বেলায় ক্যাসেট প্লেয়ার শিয়রের বালিশের নিচে চালু করে যখন ঘুমিয়ে গেলাম, তখন স্বপ্ন দেখলাম, আমি যেন তেজকুনি পাড়ার বাসায়। আমি আর আমার স্ত্রী পাশাপাশি শুয়ে হেমন্তদার গান শুনছি।
এমন সময় ঘুম ভেঙে গেল। বুঝতে পারলাম, আমি স্বপ্ন দেখছিলাম।
কিছু সময় কেটে গেল, পুরোপুরি বাস্তব জগতে ফিরে আসতে। আমার স্ত্রী তাহমিনা এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় দু’জনের কথা মনে করেই আমার কান্না পেয়ে গেল।
মনে পড়ে গেল, শেষবার কলকাতার বাসায় যখন হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়ের বাসায় যাই-হেমন্তদা, তাঁর স্ত্রী বেলা বৌদি এবং বাসার সবার সঙ্গে বসে গল্প করছিলাম তখনকার কথা।
আজ আমার স্ত্রী তাহমিনা এবং হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায় দুজনেই স্পর্শপরাহত অচিন জগতের বাসিন্দা।








