ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

শফিক হাসান

বঙ্কিম রেখাচিত্রের অর্থনীতি

প্রকাশিত: ০১:৪৫, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

বঙ্কিম রেখাচিত্রের অর্থনীতি

অর্থনীতির জটিল বিষয়বস্তু প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন সহজ বিষয় নয়। একজন কুশলী লেখকের পক্ষেই তা সম্ভব। অর্থনীতিবিদ ড. শামসুল আলম কয়েক দশক যাবত এমন অসাধ্য সাধন করে আসছেন। দীর্ঘ অধ্যাবসায়, নিষ্ঠা ও সাধনার স্বীকৃতি হিসেবেই বোধকরি তিনি সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপরেখা বরাবরই সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করে আসছেন তিনি। অর্থনীতির ছাত্র-শিক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন সময়ের বিচিত্র চিত্র। ড. শামসুল আলমের সর্বশেষ বই ‘গতিময় অর্থনীতি : নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন (২০২১)’। নামকরণেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বইটির আলোচ্য বিষয়বস্তু। বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ ‘বাঙালী জাতির বিস্ময়কর উত্থানে বর্ণিল সুবর্ণজয়ন্তী’। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পথপরিক্রমায় আজকের বাংলাদেশ সুবর্ণজয়ন্তীতে পৌঁছেছে। এই যাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না মোটেও। নানামাত্রিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সোনালি সোপান। কোন কোন খাতে কীভাবে, কেন এই অগ্রগতি মজলিশে গল্প বলার ঢঙে উপস্থাপিত হয়েছে। শুধু সরাসরি অর্থনৈতিক বিষয়াবলিই নয়, যেসব বিষয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অর্থনীতির সঙ্গে সেসবও বাদ পড়েনি। ‘বড়াল নদ হত্যার ইতিকথা’ নিবন্ধ প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নদ-নদী কিংবা জলাশয় শুধু মাছ প্রাপ্তি উৎস নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জনজীবনের সুখ-স্বস্তি; অর্থনীতির সহজ-কঠিন বাঁক। কৃষি, পরিবেশ, প্রকৃতি, শিল্পায়ন সবকিছুই নদীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বড়াল নদ হত্যা তাই অনেক বড় ‘হত্যাকাণ্ড’। এটা শুধু নদ-হত্যাই নয়, অর্থনীতির জন্য বিধ্বংসী সঙ্কেতও বটে। প্রান্তের যে জনজীবন তার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত নদ-নদীকেন্দ্রিক বিস্তৃত অর্থনীতি। এমন নানা আয়োজনই লাখ লাখ মানুষের জীবনের চালিকাশক্তি। নদ-নদী নিজ বৈশিষ্ট্যে থাকলে যেমন স্বস্তিকর পরিবেশ বজায় থাকে, বিপরীত হলে ভোগান্তি ও দুর্ভোগের শেষ থাকে না। বড়াল নদ হত্যার নেপথ্য দিক তুলে ধরার পাশাপাশি লেখক সুপারিশনামা পেশ করেছেন- কীভাবে মৃতপ্রায় বড়াল পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে। ‘পানি ব্যবস্থাপনার সরেজমিন অভিজ্ঞতা’ প্রবন্ধেও উত্থাপিত হয়েছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার নানা অনুষঙ্গ। সরেজমিন অভিজ্ঞতা এবং লেখকের ভাবনা-নির্যাস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা বয়ে আনবে সুফল। কৃষিকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থনীতির বিকাশ কিংবা সংকোচন নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর উপর। জনসংখ্যা যখন জনশক্তি হয়ে ওঠে তখনই ঘটে ইতিবাচক বিস্ফোরণ। ‘উন্নয়নের কেন্দ্র হতে পারে কাম্য জনসংখ্যা নীতি’ নিবন্ধে লেখক তুলে ধরেছেন পূর্বাপর বিষয়। মাতৃমৃত্যু, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য, লিঙ্গ বৈষম্য ও সহিংসতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন দিকে চুলচেরা বিশ্লেষণে লেখক দেখিয়েছেন কুফল-সুফল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে মূল্যায়ন ও আলোকপাতধর্মী রচনা ‘এক বিশ^নেত্রীর উন্নয়ন উপাখ্যান’। আজকের বাংলাদেশ বিশে^ রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে, পরিচিতি পাচ্ছে এশিয়ান টাইগার হিসেবে; এসব উন্নয়ন ও অগ্রগতির নেপথ্য রূপকার বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ড. শামসুল আলম গতিময় অর্থনীতির ভাষ্য দিয়েছেন গতিময় লেখায়-রেখায়। প্রায় প্রতিটি লেখাই হয়ে উঠেছে দিকনির্দেশক। সমস্যার স্বরূপ ও সমাধান অন্বেষণ এ লেখকের বড় বৈশিষ্ট্য। বইটির নামরকরণে ‘২০২১’ সাল অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি। এমন নয়, আলোচ্য বিষয়গুলো শুধু ২০২১-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সন যুক্ত করার মধ্যে পাঠক টানার অভীপ্সা থাকতে পারে, তবে এর শৈল্পিক কিংবা আঙ্গিকগত ভিত কমই। ভ‚মিকায় লেখক জানিয়েছেন বিগত দুই বছরে বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত নিবন্ধ ও উপসম্পাদকীয়’র সংকলন বইটি। এটা আমলে নিলে ব্র্যাকেটে ২০-২১ ব্যবহার করা যেত। পাঠক হিসেবে আরেকটি জায়গায় অস্বস্তি বোধ করেছি। লেখকের তিনটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাসুম বিল্লাহ, জাহাঙ্গীর শাহ এবং এম এম মুসা। অন্তর্ভুক্ত হয়েছে লেখকের তিনটি বইয়ের চারটি আলোচনা। আলোচক মিল্টন বিশ^াস ও মাসুম বিল্লাহ। মিল্টন বিশ^াসের তিনটি লেখা, মাসুম বিল্লাহর একটি। সাক্ষাতকার ও গ্রন্থালোচনার সঙ্গে লেখক ওতপ্রোত জড়িত থাকলেও এসব মৌলিক সৃষ্টি নয়। অন্য লেখরে সম্পৃক্ততাও রয়েছে। সেক্ষেত্রে এসব রচনা প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে আলাদা বইয়েই স্থান পেতে পারত। এমন ছোটখাটো দুই-একটি বিষয় বাদ দিলে বইটি অনন্য। চলমান সময়ের নির্মোহ ও নির্মেদ ভাষ্য হয়ে উঠেছে। চমৎকার অর্থবহ প্রচ্ছদ করেছেন শতাব্দী জাহিদ। করোনাকালেও অর্থনীতির উর্ধমুখী সূচক ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে বইয়ের দামটা বেশিই মনে হল। চাইলে আরেকটু সহনীয় করা যেত বোধকরি। লেখক, প্রকাশক, শিল্পী তিন পক্ষকেই মুগ্ধ পাঠকের পক্ষ থেকে সাধুবাদ!
×