ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

বহুমাত্রিক বোধের আয়না

প্রকাশিত: ০১:৪৪, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

বহুমাত্রিক বোধের আয়না

কবি অদ্বৈত মারুতের কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠে পরিমিত আবেগ, পরিশীলিত শব্দের ব্যবহার, প্রাতিস্বিক ভাবনা, ঐতিহ্য সচেতনতা এবং প্রতীকধর্মী স্বতন্ত্র চিত্রকল্পের উপস্থিতি। তার কাব্য যাত্রার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রকাশিত হয়েছে তিনটি কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থগুলো হচ্ছে- ‘নিস্তরঙ্গের বীতস্বরে’, ‘স্বরভাঙার গান’ এবং ‘জলমাতালের মুখ’। কিন্তু এ কবির একটি ভিন্ন কাব্যসত্তা উন্মিষিত হয়েছে ‘জলমাতালের মুখ’ শীর্ষক তৃতীয় কাব্য গ্রন্থে। পুথিনিলয় কর্তৃক প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থটিতে ঠাঁই পেয়েছে পঞ্চান্নটি কবিতা। গভীর জীবন দর্শন এবং শৈল্পিক সৌকর্যে ঋদ্ধ প্রতিটি কবিতা পাঠক চৈতন্যে ভিন্ন রুচি ও বোধের সঞ্চার করে। ‘জলমাতালের মুখ’ কাব্য গ্রন্থটির সূচনা হয়েছে ‘একা’ শীর্ষক কবিতার মাধ্যমে। এ কবিতায় নান্দনিক দৃশ্য কল্পের মধ্যদিয়ে নাগরিক জীবনের তীব্র যন্ত্রণা ও দহন, জীবনের অনিঃশেষ জটিলতা, আশা-নিরাশার দোলায়মানতা শৈল্পিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, কঠিন জীবন সংগ্রাম, বহমান জীবনে নির্মল ভালবাসার অপ্রাপ্তিবোধ জেগে উঠে এই পঙ্তিগুলোতে : ‘প্রগাঢ় রোদ্দুর ঠেলে ছুটে এলে নাগরিক বিষধর সাপ-/দহনের প্রজ্ঞাপনে মরে ফের জেগে উঠি কারও আশ^াসে/অন্তঃপুর- জটিলতায় তবু হয় না মাছ -সংলাপ/অথচ নদীর পাশে থাকি আঁকাআঁকি করি সবজিতে ; ঘাসে...।’ ‘জলমাতালের মুখ, কাব্য গ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় ফুটে উঠেছে মনস্তাত্তি¡ক বিশ্লেষণ এবং কবির বিস্ময়কর অন্তর্দৃষ্টি। মানুষের মধ্যে ক্ষমতার লোভ সবসময় কাজ করে। অনুক‚ল পরিবেশে অবচেতন মনের গভীরে ক্ষমতা লাভের স্বপ্ন বীজের অঙ্কুরোদগম হয়। এ কবির ‘বাঘবন্দি খেলা’ কবিতায় এ সত্যটি অভিনব উপেক্ষার ব্যবহারের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এ কবিতায় ‘চারপাশে-বনের বাঘ মনে এনে আমরা কথায় কথায় বাঘ সাজি; হুংকার দিই/ আজানু কম্পনে’। এ উক্তিতে ক্ষমতা লাভের জন্যে মানুষের তীব্র মোহ ও আকর্ষণের বিষয়টি রূপাকাশ্রিত আবহে সুন্দরভাবে বিম্বিত হয়েছে। কালের প্রবাহে মানুষের দেহ থেকে লাবণ্য ঝরে পরে, ত্বকের উপর অসংখ্য ভাঁজ পরে কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে লালিত প্রেম চির সবুজ ও অমলিন হয়ে থাকে। প্রিয় মুখে লেগে থাকে ¯িœগ্ধতা ও তারুণ্যের আবির। এ কথাগুলো অধিক শ্রæত হলেও মারুতের ‘নীল খাম’ কবিতায় শেষের দুটো পঙ্ক্তিতে নতুন রূপে বাঙময় হয়েছে : ‘তবু বাহারি কচুখেতে, তার ভেতরে লতায় জড়ানো ডালিম মুখ/ আজও মুগ্ধ করে রাখে /নীল খামে ভরে পাঠিয়ে উড়ো ডাকে সেই দিয়েছিল প্রথম সুখ’ রূপকের আশ্রয় নিয়ে পাঠককে ভাবনায় নিমজ্জিত করে রহস্যের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন করার একটি অসাধারণ শক্তি আছে এ কবির। তার ‘বৃষ্টি আসুক’ কবিতার উদ্ধৃত পঙ্তিগুলোতে এ কথার স্বাক্ষর বহন করে : ‘বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে ক্ষত নাক ফুল; হ্যাঙারে ঝোলানো মন/ভিজে যাচ্ছে কপালের ভাঁজ- চৌকি কেঁপে উঠছে মুহুর্মহু /করতালিমুখর এই গভীর রাত কলকলিয়ে নেমে যাচ্ছে খাদে/অচেনা বন্দরে নোঙর ফেলে এক চিতল মাছ!’ আমার বিশ^াস অদ্বৈত মারুতের ‘জলমাতালের মুখ’ কাব্য গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা পাঠক চিত্তে ভিন্ন অনুভ‚তির আবেশ ছড়াবে। ভাবনার অতলান্তিকে নিয়ে যাবে পাঠককে। যদিও কয়েকটি কবিতায় মেটাফোরের ব্যবহারে সামান্য ধূসরতা রয়েছে কিন্তু দৃশ্যকল্প ব্যবহারে নিজস্বতা, শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতনতাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নতুন কাব্য শক্তি হিসেবে অবির্ভূত হওয়ার অমিত সম্ভাবনা রয়েছে এই কবির।
×