শহর থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে বাঙালী নদীর তীর ঘেঁষে সোনাদীঘি বাজার। রবিবার ও বুধবার সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে এখানে। এছাড়া প্রতিদিন বিকেলে ছোট্ট বাজার বসে। দুটি চায়ের দোকান, একটি দর্জি ঘর আর তিনটি সেলুনসহ বিশ/পঁচিশটি স্থায়ী দোকান আছে। পুরাতন বটগাছটার তলায় টিনসেড পাকা ঘরে টিপটপ সাজানো ধীরেণ শীলের সেলুন। নাম দিয়েছে ‘স্বাধীন বাংলা হেয়ার ড্রেসার’। সাটার লাগানো ছোট্ট রুমটির সামনে গøাস লাগানো। বারান্দার খুঁটির পাশে মাটির টবে একটা তুলসী গাছ, অন্যটিতে পাতাবাহার। দরজায় লাল, নীল, সবুজ, হলুদ জরি ঝুলানো। রুমের ভেতরে একটা চেয়ার আর একটা বেঞ্চ। ঘরের দেয়ালের সঙ্গে তিন দিকেই বড় আয়না লাগানো। দরজার সামনে ঝুলানো মরিচবাতি। বেচারা অনেক সৌখিন ও পরিপাটি। সকালে দোকান খুলে ঝাড়-ঝাটা দিয়ে আগরবাতি জ্বালিয়ে ব্যবসার কাজ শুরু করে। বয়স চল্লিশের কোঠায়। মোবাইল চালু করে সারাদিন গান বাজায়। বাজারে আরও দুটি সেলুন থাকলেও, ধীরেণ শীলের দোকানে সব সময় কাস্টমারের ভিড় থাকে। চুল কাটার কাজও ভাল করে। উঠতি বয়সের ছেলেদের নানা ডিজাইন কাটিং দেয়। এজন্য এখানে তাদের ভিড় বেশি। বড়রাও আসে, তবে কম। বাজারে অন্য কোন দোকানের ভেতরে বসার সুযোগ না থাকার জন্য অনেক ছেলেরাই কাজ ছাড়াও ধীরেণ শীলের দোকানে বসে আড্ডা দেয় আর চা সিগারেট খায়। ধীরেণ শীল নিজেও সিগারেট খায়, তবে দোকানে থাকা অবস্থায় কিনে খায় না। কাস্টমারদের সঙ্গে গাল গপ্প করে তাদের কাছ থেকেই খায়। গাল গপ্পের জন্য ধীরেণ শীল পাকা বটে। কাঁচিতে ঘচাং ঘচাং আওয়াজ তুলে চুল কাটে আর গল্প করে কাস্টমারের সঙ্গে। ওর মাথায় সব সময় দেশ নিয়ে ভাবনা। কারও সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে প্রসঙ্গ ছাড়াই রাজনীতির আলাপ তোলে। মনে হয় কোন এক সময় এমপি প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করবে। গল্প ধরলে আর ছাড়ে না। তবে কাজ ফাঁকি দিয়ে না। জাতে মাতাল হলেও, তালে ঠিক আছে।
এলাকার ছোট বড় সবার সঙ্গে ধীরেণ শীলের চেনা জানা। সবাইকে সম্মান দিয়েই চলে। ওর একটাই বদ অভ্যাস, কথা বলে বেশি। নাপিতের কাজ করে, এমপি-মন্ত্রীদের খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করে। এমপি কত বেতন পায়, মন্ত্রী কত বেতন পায়, কার কত ক্ষমতা, এসব জানার আগ্রহ ওর বেশি। আদার ব্যাপারির জাহাজের খোঁজ নেয়ার মতো। দেশের বেশিরভাগ এমপি-মন্ত্রীর নাম ওর জানা। কার বাড়ি কোথায় এসব অনেক খবরই জানে। কথা বলার সময় এমন ভাব তার, যেন তাদের কত পরিচিত। বড়রা এসব আলাপে বিরক্তবোধ করলেও, কম বয়সীরা ওর সঙ্গে তাল দিয়ে চলে।
সকাল থেকে রাত দশ-এগারোটা পর্যন্ত ধীরেণ শীলের দোকান খোলা থাকে। বাড়ি ফেরার সময় দোকান পরিষ্কার করে রেখে যায়। সকালে এসে আবার ঝাড়-ঝাপটা দিয়ে কাজ শুরু করে। করোনাকালে কঠোর লকডাউনের সময় বাজারে লোকজনের সমাগম বেশ কম। কাস্টমার নাই বললেই চলে। ধীরেণ শীল বারান্দার কোনায় সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে লোকজনের সাথে রাজনীতির আলাপ করে। ধীরেণ শীলের আরেকটা অভ্যাস, কথা বলার সময় মাঝে মাঝেই বলবেÑ কি কন বদদা (বড় দাদা) অথবা কি কও ছোটদা (ছোট দাদা)। এটা ওর স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। লোক হিসেবে খারাপ না। এই বাজারের কোন দোকানে ওর কোন বাকি নেই। লেনদেন ভাল। কারও সঙ্গে বেতাল কোন কথাও বলে না। সবার সঙ্গেই তেল দিয়ে চলে। মুখে মধু আছে বটে। করোনাকালীন সময়ে লোকজন চায়ের দোকানে খুব একটা বসে না। ধীরেণ শীলের দোকানের বারান্দায় এখন বাজারের লোকজনের আড্ডা। তাদের রাজনীতির আলাপের মাঝে ধীরেণ শীলও সুযোগ মতো ঢুকে পড়ে। এতে করে কেউ কেউ বিরক্তও হন।
সারাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় শহরের পাশাপাশি গ্রাম এলাকাতেও এখন প্রশাসনের টহল চলবে, এমন কথা বাজারে বলাবলি হচ্ছে। দোকানদাররা দোকান খোলে ভয়ে ভয়ে। কেউ কেউ দরজা লাগিয়ে গোপনে ভেতরে থাকে। কাস্টমার এসে ডাক দিলে ভেতর থেকে জিনিসপত্র দেয়। ধীরেণ শীলও ভয়ে এখন দোকানে গান বাজাচ্ছে না। মনে মনে সব সময় প্রস্তুত, কোনোভাবে প্রসাশনের লোকজনের আসা টের পেলেই দোকানের সাটারটা লাগিয়ে দৌড়াবে। কাজ কম, তাই লোকজনের সঙ্গে গল্প করে, বলে বদদা আপনারা থাকতে আমার চিন্তা নাই। ধীরেণ শীল আসলে বোঝে না, এখানে এসব লোকজনের করার কিছু নেই।
আষাঢ় মাস, মুহূর্তের মধ্যে আকাশ মেঘে ভরে যায়। মেঘের ডাকাডাকি আর বিদ্যুত চমকানি প্রবল হয়। শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। ধীরেণ শীলের বারান্দা আর দোকান মিলে জনা বিশেক লোক দাঁড়িয়ে আর বসে। বৃষ্টি ছাড়ার কোন লক্ষণ নেই। বিড়ির ধোঁয়ায় ছোট্ট ঘরটি অন্ধকার হয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় প্রশাসনের কোন লোকজন আসবে না ভেবে, ধীরেণ শীল সাউন্ড বক্সে গান দেয়। এরই মধ্যে একজন বলে, এই ব্যাটা গান থামা। অন্য একজন বলে, গান বাজুক তোর সমস্যা কি? দুজনের মধ্যে দু-এক কথা হতে হতেই তর্কাতর্কি শুরু হয়। ক্রমশ তর্কাতর্কি ছড়িয়ে পড়ে কয়েকজনের মধ্যে। এরপর তর্কাতর্কি রূপ নেয় হাতাহাতিতে। ধীরেণ শীল যথেষ্ট চেষ্টা করে থামানোর জন্য। তাতে ধীরেণ শীলকেই কয়েক ঘা খেতে হয়। হাতাহাতি থামলেও কথা কাটাকাটি চলছে। বৃষ্টির গতি বেড়ে যায়।
হট্টগোলের শব্দ শুনে বাজারের লোকজন ভিজতে ভিজতে এইদিকে আসতে শুরু করে। বেশি লোকজন জড়ো হওয়ায় মারামারি নতুন করে শুরু হয়। ক্রমশ মারামারি জটিল আকার ধারণ করে। দেখতে দেখতে ধীরেণ শীলের দোকান ভেঙ্গে চুরমার। একজন উচ্চ গলায় বলে ওঠে, শালার নাপিতের বাচ্চাকে আগে ধর। এ কথা বলেই রড নিয়ে লাফিয়ে এসে ধীরেণ শীলের মাথায় কষে একটা পিটন দেয়। এক পিটনেই ধীরেণ শীল লুটে পড়ে বারান্দায় রাখা তুলসী পাছের টবের উপর। টবসহ গড়ে পড়ে বারান্দার নিচে। বারান্দায় রাখা ‘স্বাধীন বাংলা হেয়ার ড্রেসার’ লেখা স্ট্যান্ড সাইনবোর্ডটি ধীরেণ শীলের মুখের ওপর পড়ে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যায় ধীরেণ শীলের তাজা রক্ত।








