ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

মা ও মেয়ের গল্প

অপরাজিতা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:৩৬, ৯ জুন ২০২৩

মা ও মেয়ের গল্প

মা  প্রত্যেক মানুষের জীবনে সবচাইতে আকাক্সিক্ষত ব্যক্তিত্ব

মা  প্রত্যেক মানুষের জীবনে সবচাইতে আকাক্সিক্ষত ব্যক্তিত্ব। মা শব্দটিই জগতের সেরা আবেদন। দশ মাস দশ দিন জঠরে ধারণ করে একজন উৎফুল্ল ও গর্বিত মা যখন সন্তানকে জগতের আলোয় নিয়ে আসেন তার চেয়ে মহৎ ও বৃহৎ কর্ম আর কোথাও আছে কিনা বলা মুশকিল। স্নেহে, মায়া, মমতায় মাতৃশৌর্যের অপার মহিমায় সন্তান বড় হয়। নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে মায়ের কোনো বিকল্প নেই নির্দ্বিধায় মানাই যায়। সেই চিরায়ত স্নেহ সুধায় মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক তাও এক অনন্য রূপকল্পই শুধু নয় গল্প কথারও অপরূপ নিয়ামক। প্রতিদিনের যাপিত জীবনের অনুক্ষণ কাটে স্নেহময়ী মায়ের আতিশয্য আর নৈকট্যে।

তেমনই এক মায়ের গল্প কাহিনী তার স্নেহম্পদ সন্তানের সঙ্গে। সন্তানও মায়ের জাত কন্যা। জাফরান ইসরাত তার মাকে নিয়ে বলে গেলেন মায়ের সঙ্গে কাটানো জীবনের পরিপূর্ণ মুহূর্তগুলো। অবলিলায় ভাগ করে নিলেন মাকে নিয়ে যত কথা, আনন্দ আর দুর্লভ সময়গুলো। শুধু কি নির্ভেজাল খুশির ফোয়ারা? বেদনাময় অনুভব, চরম বিপদ-বিপত্তিতেও মায়ের সঙ্গ যে কত বেশি জরুরি কোনো কিছুর হিসেবেও মেলে না। সেই স্মৃতিময় শৈশব থেকে আজ অবধি। জাফরানের মা ফরিদা ইয়াসমিন। বিয়ের আগেই স্নাতক সমাপ্ত করেছেন। পিতা সরকারি কর্মজীবী।  জাফরান বলতে লাগলেন-স্নেহময়ী মায়ের অনন্য জীবন কথা। যে জীবন শুধু সংসারকে র্ঘিরেই আবর্তিত। মা সুদক্ষ গৃহিণীও বটে। তবে শিক্ষক হিসেবেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

সংগত কারণে জাফরানের লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় মমতাময়ী মায়ের স্নেহছায়ায়। কন্যার শিক্ষার্থী জীবন কাটে রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুন নিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজে। তেমন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়াও অত সহজ ছিল না। প্রতিযোগিতায় নেমে টিকে যাওয়াও এক কষ্টকর বিষয় ছিল। জাফরান এখনো মনে করেন মায়ের জন্যই ভর্তি পরীক্ষায় স্বাচ্ছন্দ্যে অংশ নিতে পেরেছেন। কারণ শিক্ষক মাই তাকে তৈরি করেছেন ভর্তি পরীক্ষার জন্য। এমন একটি বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশের পর আর পিছন ফিরে তাকাতেই হয় না। তা ছাড়া প্রতিনিয়ত মায়ের সান্নিধ্য ও নিরবচ্ছিন্ন ছায়া তো পাশে ছিলই। কন্যা মায়ের সর্বধিক গুণ উল্লেখ করে নির্দ্বিধায় বললেনÑ মা কিন্তু খুব ভালো রাঁধতে পারেন। সঙ্গত কারণে মায়ের হাতেই রান্নারও হাতেখাড়ি।

আবার সেলাইতেও মায়ের কৃতিত্ব অসাধারণ। বিশেষ করে উলের বুনন। উলের বুননে সোয়েটার, মাফলারে কন্যা জাফরানও নিজের হাত পাকা করে নিয়েছেন। প্রতিদিনের কাজকর্মে মায়ের কিছু রুটিন থাকত। নিয়মের অধীন বিধিগুলো মানতে মা অনেক বেশি নজরদারিও করেন। ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও থাকেনি। সকালে নাস্তা খাওয়ার পর মা-ই নিয়ম করে পড়তে বসাতেন। এখানে কোনো ধররের অন্যথা মা সহ্যই করেন না। এভাবে স্কুল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলো খুব স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যায়। সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গণিত শাস্ত্রের দিকে তীক্ষè নজর দিলেন বাবা স্বয়ং।

মায়ের আকাক্সক্ষা ছিল বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে তৈরি করা। কিন্তু স্বাধীনচেতা বাবা চাইলেন মেয়ে যা পছন্দ করবে সেইভাবেই তার বিভাগ বিষয়ও নির্ধারণ হবে। জাফরান নিজেই বাণিজ্য বিভাগে পড়তে আগ্রহী। সেভাবেই নবম শ্রেণি থেকে পড়াশোনা এগিয়ে নিলেন। ফল হলো অসাধারণ। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে গোল্ডেন-৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হলেন। বিবিএ স্নাতক সম্পন্ন করলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন হলো একেবারে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তবে জীবন সব সময় স্বাভাবিক গতিতে চলেনি। বিপদ-আপদ-দুর্ঘটনা, মৃত্যু সব সময় ছায়ার মতো পাশেই থেকে যেত।

২০১৮ সালে মা এক পথ দুর্ঘটনায় পায়ে প্রচ- আঘাত পান। তেমন আঘাত চিরস্থায়ীভাবে মাকে অসহায় করে তোলে। স্ক্রাচে ভর দিয়ে মাকে এখনো চলাফেরা করতে হয়। তারপরেও সংসারের পালাক্রম কোনোভাবেই থেমে থাকেনি। সুখে, দুঃখে, আনন্দ আর বিষাদে চলমান জীবন বয়ে বেড়ানোও নিয়তির বিধি। সেটার নগ্ন বহির্প্রকাশ ঘটে ২০২১ সালে কর্মরত অবস্থায় বাবার অকাল মৃত্যু। দুঃখের সাগর অতিক্রম করে মা ও কন্যাকে এমন অসহনীয় যন্ত্রণা মেনে নিতে হয়েছে। এ ছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না। তবে অর্থনৈতিকভাবে কোনো ধরনের দুর্বিপাকে না পড়াও জীবনের স্বচ্ছন্দ গতি প্রবাহ। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর অসুস্থ মায়ের শরীরটা কখনো ভালো যায়নি।

বাবা মারা যাওয়ার পর পরই মাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। জীবনটা লড়াই-সংগ্রামের। সবাইকে তা প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হয়। অর্থ কষ্টে কখনো পড়তে হয়নি। কিন্তু এমন অনেক যন্ত্রণা জীবনটাকে ঘিরে ছিল স্বস্তি আর সুস্থির হওয়ার উপায় থেকেও থাকেনি। একদিকে বাবার মৃত্যু অন্যদিকে মায়ের রুগ্ন শরীর সব মিলিয়ে চলতে হয়েছে সমস্যা মোকাবিলা করেই। তবে থেমে থাকেনি জাফরান। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে কর্মজীবনেও অনুপ্রবেশ করা দৈনন্দিন যাত্রাপথের অবধারিত পালাক্রম।

এখন মা ও মেয়ে দুজনই ভালো আছেন। ভালো থাকার অঙ্গীকারও প্রত্যয় ধারণ করে সামনের সময়গুলো পার করার আকাক্সক্ষা ভেতরের বোধে অনুক্ষণ জিইয়ে থাকে। জাফরানের মা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাক-আর কন্যা নিজেই তার অনাগত ভবিষ্যতের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দুঃসাহসিক  মনোবলে এগিয়ে যাক-এমনই প্রত্যাশা শুভাকাক্সক্ষীদের। 
অপরাজিতা প্রতিবেদক

×