ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

সংস্কৃতি সংবাদ

লক্ষ্মণ দাস সার্কাস প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী

সংস্কৃতি প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:৫৬, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

লক্ষ্মণ দাস সার্কাস প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী

লক্ষ্মণ দাস সার্কাস প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে বক্তব্য রাখছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ

এক সময় এ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিল বিভিন্ন সার্কাস দল। গণমানুষের বিনোদনের অন্যতম অংশও ছিল সার্কাস। গণমুখী এই শিল্পের সৌন্দর্যে বিনোদিত হতো আপামর মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে  দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানো, শরীরের সঙ্গে রিং বেঁধে ঘোরানো, এক চাকার সাইকেল চালানো কিংবা হাতি-ঘোড়া নিয়ে খেলাসহ সার্কাস শিল্পীদের নানা শরীরী কসরতে মুগ্ধ হতো দর্শক। সার্কাস শিল্পের সেই সোনালি সময়ে ষাটের দশকের শুরুতে বরিশালের গৌরনদী অঞ্চলে দি রয়েল পাকিস্তান সার্কাস নামের দল গঠন করেন লক্ষ্মণ দাস। সার্কাস শিল্পের জনক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার কারণে লক্ষণ দাস শহীদ হন ।

তাকে এবং তার দলের একটি হাতিকে নির্মমভাবে খুন করে পাকবাহিনী। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে লক্ষ্মণ দাসের দুই ছেলে অরুণ দাস ও বিরেণ দাস দ্যা লক্ষণ দাস সার্কাস নামের নতুন দল গড়েন। লক্ষ্মণ দাসের সেই সার্কাস দলের গল্প এবার উঠে এলো সেলুলয়েডের পর্দায়। দলটির টিকে থাকার সংগ্রামসহ বিভিন্ন সার্কাস শিল্পীদের কঠিন জীবন বাস্তবতা এবং ক্রমাগত বিলুপ্তির পথে ধাবমান শিল্পমাধ্যমটির নানা তথ্য উঠে এলো দ্য লক্ষণ দাস সার্কাস নামের প্রামাণ্যচিত্রে। বরিশাল, ধামরাই, কেরানীগঞ্জসহ ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে সরকারী অনুদানে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন ঝুমুর আসমা জুঁই।
বুধবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ। আলোচনায় অংশ নেন নির্মাতা ও বিকল্পধারা চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা মানজারে হাসীন মুরাদ। অনুভূতি প্রকাশ করেন ঝুমুর আসমা জুঁই। সভাপতিত্ব করেন মঞ্চশিল্পী ও নির্দেশক অনন্ত হীরা।
অনুভূতি প্রকাশে ঝুমুর আসমা জুঁই বলেন, সার্কাস একইসঙ্গে আমাদের দেশের ঐতিহ্য এবং বিনোদন। কিন্তু ক্রমশ এই বিলুপ্তির পথে এগুছে এই শিল্পমাধ্যমটি। আগামী কয়েক বছর পর হয়ত সার্কাসের  কোন দল খুঁজে পাওয়া যাবে না।  গত তিন বছর ধরে লক্ষণ দাস সার্কাস দল কোন শো করতে পারেনি। কারণ,  সার্কাস করার অনুমতি পাওয়া যায় না সহজে। তাই সার্কাসের মতো বড় আয়োজনের  খেলা প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের ও জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। এই প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে সার্কাস শিল্পীদের জীবনের কঠিন বাস্তব তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে সামান্য প্রাপ্তির সঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে নির্মম বাস্তবতা। উঠে এসেছে সার্কাস শিল্পীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিত্র।

সার্কাস শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আজীবন সংগ্রাম করে যাওয়া মানুষগুলোর পাশে থাকাই এই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য। প্রসঙ্গক্রমে এই নির্মাতা বলেন, পাকিস্তান আমলে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল লক্ষণ দাসের সার্কাস দল। মুক্তিযুদ্ধে তিনি শহীদ হওয়ার পর তারা দুই ছেলে নতুন দল গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠা করেন দ্য লক্ষণ দাস সার্কাস ও দ্য রয়েল বেঙ্গল সার্কাস। বিগত ৬০ বছর ধরে  দেশের বিভিন্ন প্রন্তরে মানুষকে বিনোদিত করছে এই দুটি সার্কাস দল। অরুণ দাস ও বিরেণ দাস এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। লক্ষণ দাস যুবক বয়সে সার্কাস শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রথমে নিজে অনুশীলন শুরু করেন। এরপর অন্যান্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দল  তৈরি করেন।

জলপথ ও স্থলপথে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এই সার্কাস কোম্পানি সার্কাস প্রদর্শন করত। সঙ্গে থাকত সার্কাস শিল্পী, প্যান্ডেল, সার্কাসের বিভিন্ন সরঞ্জাম, হাতি, বাঘ, সিংহসহ নানা প্রাণী। তাদের প্রধান বাহন ছিল নৌকা। যা এখনও রয়েছে। সার্কাস কোম্পানির মানুষ এবং জীবজন্তু সবাই সার্কাসের শো চলাকালীন এক-দেড় মাস প্যান্ডেল আর নৌকায় জীবনযাপন করত।