ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১

​​​​​​​দাম কমানোর বিষয়টি জানেন না বেশিরভাগ ব্যবসায়ী

পেঁয়াজ আলু ডিমের বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর হয়নি

​​​​​​​অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২২:৩৯, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩

পেঁয়াজ আলু ডিমের  বেঁধে দেওয়া দাম  কার্যকর হয়নি

আলু ডিম ও পেঁয়াজ

দেশে প্রথমবারের মতো আলু ডিম পেঁয়াজের মতো তিন নিত্যপণ্যের  দাম বেঁধে দেওয়া হলেও বাজারে তা কার্যকর হয়নি। বাজারে খুচরা পর্যায়ে নির্ধারিত ৬৪ থেকে ৬৫ টাকার পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৯০ টাকায়, ৩৫ থেকে ৩৬ টাকার আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়, আর ১২ টাকার ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে সাড়ে ১৩ টাকায়। অর্থাৎ অনেকটা আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে এই তিন পণ্য। শুধু তাই নয়, সয়াবিন তেলের দাম লিটারে টাকা কমানো হলেও নতুন দামের তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এর আগে বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আলু, ডিম পেঁয়াজের মতো পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তবে অনেক ব্যবসায়ী, ক্রেতা বিক্রেতা তিনটি কৃষিপণ্যের বেঁধে দেওয়া দামের বিষয়ে জানেনও না।

শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, ফকিরাপুল বাজার, কাপ্তান বাজার, যাত্রাবাড়ী বাজার, মুগদা বড় বাজার, খিলগাঁও সিটি করপোরেশন কাঁচা বাজার, মালিবাগ রেলগেট বাজারসহ ঢাকার কোনো বাজারে এই তিন পণ্যের নতুন দাম কার্যকর হয়নি। টেলিভিশন, পত্রিকা এবং অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে খবর দেখে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অনেক ক্রেতা নির্ধারিত দামের আলু, পেঁয়াজ, ডিম   সয়াবিন তেল কিনতে বাজারে আসেন। কিন্তু বাজারে এসে কেউ বেঁধে দেওয়া দামে এসব পণ্য কিনতে পারেননি। যদিও ঢাকার বাজারে সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ার অতীত রেকর্ড রয়েছে। বিশেষ করে চিনি এখনো সরকারের  বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, নির্ধারিত দামে আলু, ডিম পেঁয়াজ বিক্রি করতে হবে ব্যবসায়ীদের।

অন্যথায় দেশের প্রচলিত আইনে দাম বেশি নেওয়া ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর করতে কঠোর অবস্থানে থাকবে সরকার। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, নির্ধারিত দামে এসব পণ্য বিক্রি হলেও ব্যবসায়ীদের মুনাফা করার সুযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে সেইভাবে হিসাব করে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন দাম নির্ধারণে কোন পণ্যের উৎপাদন খরচ কত সেই হিসাবে যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট দিয়েছে কৃষি এবং মৎস্য প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়। ছাড়া এসব পণ্য  যে  দামে আমদানি হয়ে থাকে সেগুলোর সঙ্গে সব খরচ যোগ করার পরও দাম নির্ধারণে সুপারিশ করে থাকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন-বিটিটিসি।

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিটি ডিমের দাম সর্বোচ্চ ১২ টাকা বেঁধে  দেওয়ার পরও সাড়ে ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫২ টাকায়। প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজ ৭৫-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তার মানে সরকারের  বেঁধে দেওয়ার দামের তুলনায় কেজিপ্রতি ১০-২৫ টাকা বেশি। ছাড়া প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকায় অর্থাৎ বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে মানভেদে ১১-১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।  ফকিরাপুল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ডিম বিক্রেতারা ৫০ টাকা হালি দরে ফার্মের ডিম বিক্রি করছেন। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম হচ্ছে ৪৮ টাকা। সরকার নির্ধারিত দাম কেন বিক্রি হচ্ছে না জানতে চাইলে ওই বাজারের বিক্রেতা হাবিব জানান, বৃহস্পতিবার আড়ত থেকে ১০০ পিস ডিম কিনেছি হাজার ১৬০ টাকা দরে। তার সঙ্গে ২০ টাকা যোগ করেন ভ্যান ভাড়া।

আবার ১০০ ডিমে গড়ে ৩টি ভাঙা থাকে। এখানে লোকসান হয় ৩০ টাকা। তাতে ১০০ ডিমের দাম গিয়ে দাঁড়ায় হাজার ২১০ টাকায়। তার মানে একেকটা ডিমের দাম ১২ টাকা ১০ পয়সা। তা হলে কীভাবে ১২ টাকায় ডিম বিক্রি করব। তিনি আর জানান, শুক্রবার আড়তে খোঁজ নিয়েছিলাম সেখানে ডিমের দাম কমেনি। একই দামে এসব পণ্য হচ্ছে কাপ্তান বাজার এবং খিলগাঁও সিটি করপোরেশন কাঁচা বাজারসহ অন্যান্য বাজারে। ক্রেতাদের বক্তব্য, আগেও কয়েক দফায় ভোজ্যতেল চিনির দাম বেঁধে দিয়ে তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করতে পারেনি সরকার। তাই পেঁয়াজ, আলু ডিমের ক্ষেত্রে যে এটা এখনই কার্যকর হবে, সে ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না তারা। তবে সরকার নির্ধারিত দাম বাজারে কার্যকর করতে হলে মোবাইল কোর্টের অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ছাড়া ব্যাপারে ভোক্তা অধিদপ্তরকেও আরও কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। 

জানা গেছে, কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮ এর ক্ষমতাবলে সরকার আলু, পেঁয়াজ ডিমের দাম বেঁধে দিয়েছে।  সম্প্রতি কৃষিপণ্যের মূল্য পর্যালোচনা সংক্রান্ত সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। সেখানে বলায় হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা মরিচ ডিমের দাম কমেছে। এই সময়ে পেঁয়াজের দাম প্রতি মেট্রিক টনে কমেছে ১২ শতাংশ, আদার দাম কমেছে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, কাঁচা মরিচের দাম ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং ডিমের দাম প্রতিটিতে দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছে। নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের মধ্যে শুধু রসুনের দাম অপরিবর্তিত আছে। অথচ গত এক মাসে দেশের বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, আমদানি করা রসুনের দাম বেড়েছে দশমিক ৭৬ শতাংশ, আমদানি করা আদার দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে কাঁচা মরিচ ডিমের দাম কিছুটা কমেছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় বলা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও বলছে, দেশের পাইকারি বাজারে গত ২২ আগস্ট প্রতি কেজি আলুর বিক্রয়মূল্য ছিল ৩৩ টাকা ৮৪ পয়সা এবং ১১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ টাকায়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে পাইকারি বাজারে আলুর দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ, যার সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্পৃক্ততা নেই।

ডালের দাম বাড়লেও কমেছে আটা ভোজ্যতেলের সাপ্তাহিক ছুটির দিন নিত্যপণ্যের বাজারে ডালের দাম বাড়লেও কমেছে আটা ভোজ্যতেলের। ছাড়া চাল, চিনি, পেঁয়াজ, সবজি, মুরগি মাছ-মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম বেড়ে প্রতি কেজি মসুর ডাল মানভেদে ১১০-১৫০ টাকা, দাম কমে আটা খোলা প্রতি কেজি ৪৫-৪৮ আটা প্যাকেট ৫৫-৬০ এবং প্রতিলিটার সয়াবিন  খোলা ১৫৫-১৬০ এবং আট লিটারের ক্যান ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে। ছাড়া সবজির বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকাঢেঁড়শ ৪০ থেকে ৬০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, ধুন্দল ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, শসা ৫০ থেকে ৮০ টাকা, প্রতিটি লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

×