ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১১ আগস্ট ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

সমুদ্র হক

কোভিড-১৯ নিয়ে ভাবনা এবং বাস্তবতা

প্রকাশিত: ০০:১৯, ২৭ জুন ২০২২; আপডেট: ০২:০০, ২৯ জুন ২০২২

কোভিড-১৯ নিয়ে ভাবনা এবং বাস্তবতা

কোভিড-১৯ বা করোনা কি দূর হয়েছে? এখনও কি মাস্ক পরতে হবে? কিছুক্ষণ পরপর স্যানিটাইজ করতে হবে অথবা প্রতিবার সাবান দিয়ে বিশ সেকেন্ড ধুতে হবে হাত? শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার দিন কি ফুরিয়েছে? হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় টিস্যু ব্যবহার অথবা কনুই দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে সাবধান থাকতে হবে? যারা এখনও কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নেননি অথবা দ্বিতীয় ও বুস্টার ডোজ নেননি তাদের কি টিকা নিতে হবে? এমন অনেক প্রশ্ন নীরবে-নিভৃতে বিরাজ করছে সাধারণের মধ্যে। এত প্রশ্নের পরও করোনা নিয়ে উদাসীন বেশিরভাগ মানুষ। করোনা দূর হয়েছে, এখন সবই আগের স্বাভাবিক নিয়মে চলবে- এমন ঘোষণা দেয়া হয়নি। বরং বিভিন্ন সময় বলা হচ্ছে করোনা দূর হয়নি। যে কোন সময় থাবা দিতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে করোনা ফিরে আসছে। দৈনিক জনকণ্ঠে ২৩ জুন ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে- করোনার নতুন ঢেউ প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে, যা অমিক্রনের একটি উপধরন (ভ্যারিয়েন্ট)। যে কারণে দেশে প্রতিদিন বাড়ছে করোনা রোগী। নমুনা সংগ্রহের বিপরীতে করোনা শনাক্তের হার বেশি। গত সপ্তাহের ব্যবধানে শনাক্তের হার এক শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। দিন দিন বাড়ছে এই হার। সহযোগী একটি পত্রিকা খবর দিয়েছে দশটি কারণে দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। প্রথম কারণ হলো টিকা গ্রহণ করার পর অথবা করোনা সংক্রমিত হওয়ার পর শরীরে যে এ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয় এর কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমে আসে। আট-নয় মাসের মধ্যে ক্ষয় হয়ে যায়। করোনা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বুস্টার ডোজ নেয়ার পর টিকার প্রয়োজন হয়। এদিকে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলেছেন অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে করোনার চতুর্থ ঢেউ শুরু হয়েছে। সংক্রমণ বাড়ছে। নতুন করে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন। তিনি মনে করেন এখনই করোনার ধরন শনাক্ত করা উচিত। কোন্্ ধরনের মানুষ করোনায় আক্রান্ত তা দেখতে হবে। ঝুঁকি কতটা জানা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। শুক্রবার প্রকাশিত দৈনিক জনকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩১৯ জন। একই সময় মৃত্যু হয়েছে একজনের। দেশে এ পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা ২৯ হাজার ১৩৫ জন। শনাক্ত হয়েছে ১৯ লাখ ৬০ হাজার ৫২৮ জন। শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো করোনা বিষয়ক নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য দেয়া হয়েছে। ধারাবাহিক দৃশ্যপট- এখন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মাস্ক ও স্যানিটাইজার থাকে না ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে। প্রতিটি যানবাহনে লোকজন উঠছে ঠেলাঠেলি করে। আসনে বসছে ও দাঁড়িয়ে থাকছে গাদাগাদি করে। গরমে ঘামছে। সড়কে হেঁটে চলেছেন অথবা রিক্সায় দুজন যাচ্ছেন, কারও মুখে মাস্ক নেই। স্যানিটাইজের বালাই নেই। যাদের গাড়ি আছে তাদেরও প্রায় একই অবস্থা। এদিকে ঢাকা মহানগরীসহ প্রতিটি শহরে এবং নগরীতে বায়ু ও শব্দ দূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কোভিড-১৯ কালের পিক আওয়ারে এগুলো একটু কম ছিল। করোনা শিথিল হওয়ার পর এগুলোর মাত্রা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই ফিরে গেছে। এখন আরও বেড়েছে। এর মধ্যে করোনা পালিয়ে গেছে এ কথা কি বলা যায়? মোটেও না। করোনা পালিয়ে যাক বা না যাক সাধারণ মানুষ ধরেই নিয়েছে করোনা নেই। এখন আর মাস্ক পরে কী হবে। এমন মন্তব্য করেন বগুড়া নগরীর এক সুধীজন। স্যানিটাইজারের কথা বললে তিনি বলেন, ইন্টারনেটের যুগে এ যেন রেডিওর কথা। রিওয়াইন্ড করে দেখা কোভিড-১৯ দিনগুলো- ২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসের পর গোটা দেশে কঠিন আতঙ্ক অবস্থা। পথ-ঘাট ফাঁকা। সকলেই ঘরের ভিতরে। ভয়ে কেউ বাইরে যাচ্ছে না। বাইরে গেলে মাস্ক, পকেটে ডিসইনফেকশন টিউব, কেউ পরছেন পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকশন ইক্যুইপমেন্ট), অফিস করা হচ্ছে ঘরে বসে। চালু হয়েছে ভার্চুয়াল কার্যক্রম। পত্রিকা ও টেলিভিশন অফিসগুলো চলছে সীমিত কর্মী দিয়ে। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর করোনার বিশেষ সংবাদ ও বিজ্ঞপ্তি প্রচার। ভারতীয় টিভি চ্যানেল বারবার প্রচার করে- ‘আমরা ঘরে, করোনা বাইরে’। ক’মাসের মধ্যে টিকা এলো। প্রথমে এ্যাসট্রোজেনেকার কভিশিল্ড। তারপর চীনের ভোরোসেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজারের টিকা। ভয় কেটে গিয়ে অনেকটা স্বস্তি। ওই সময় বলা হলো করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে আসবে ‘নতুন স্বাভাবিক জীবন’ (নিউ নরমাল লাইফ)। কেমন হবে নতুন স্বাভাবিক জীবন এ নিয়ে কতই জল্পনা-কল্পনা। বলা হলো নতুন স্বাভাবিক জীবনের স্বস্তি নিয়েই চলবে করোনা পরবর্তী পৃথিবী। চলমান জীবন কি বর্তমানের এই সময়? এই প্রশ্নের কোন উত্তর মেলে না। চলমান ক্রম- আগের অবস্থা ‘পজ’ করে দিয়ে সাধারণ মানুষ মনে করছে করোনায় আর কি হবে! শহরের সবকিছুই আগের স্বাভাবিক অবস্থার মতো। করোনার কত ঢেউ এলো- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়। এখন বলা হচ্ছে চতুর্থ ঢেউ এসেই গেছে। এখন আর কোন ঢেউ উথাল-পাতাল করছে না। ক’দিন আগে ওয়াশিংটন পোস্ট ছোট্ট একটি রিপোর্টে জানান দিল, ‘করোনা মে এরাইজ উইথ ফোর্থ ওয়েভ’। অর্থ করোনা চতুর্থ ঢেউ নিয়ে আসতে পারে। তারপর আর কোন খবর নেই। বর্তমানের খবর- চতুর্থ ঢেউ আসতে পারে নয়- এসেই গেছে। এর অর্থ করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে অনেক কিছুই ঘটবে। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির পরবর্তী সময়ে দেহে নানা ধরনের জটিলতা পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলছেন, যাদের করোনা হয়েছিল তাদের দেহের অভ্যন্তরে করোনার প্রভাব রয়েছে। এ থেকে পরিপাকতন্ত্র, হার্ট, কিডনি আক্রান্ত হতে পারে। তাহলে ভ্যাকসিনের কি সুফল এলো? এমন কৌতূহলী প্রশ্নে উত্তর মেলে যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাদের ‘তেমন’ জটিলতা হবে না। তবে তাদের বুস্টার ডোজ (তৃতীয় ডোজ) নিতেই হবে। দ্বিতীয় ডোজের পর এই বুস্টার ডোজ ক’জন নিয়েছেন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বগুড়ায় ১৯ জুন পর্যন্ত বুস্টার ডোজের আপডেট হলো- দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ২৩ লাখ ৯৫ হাজার। বুস্টার ডোজ নিয়েছেন ৩ লাখ ৭৩ হাজার। এই চিত্রই বলে দেয় বুস্টারের কি হাল। খোঁজ-খবর করে জানা যায় বুস্টার ডোজের মেসেজ পাঠানো হয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার পর ৩/৪ মাসেও বুস্টার ডোজ নেননি, এই হার অন্তত ৭০ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন মেসেজ পাওয়ার পর বুস্টার ডোজ নেয়া যাবে চার মাসের মধ্যে। তবে এর আগে নেয়া ভাল। এদিকে আরেক খবর দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইসরাইলসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশ। তারা তৃতীয় ডোজ নেয়ার পরও চতুর্থ ডোজ নিচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ কিছুদিন আগে বলেছিল দেশে এই অবস্থা নেই। তবে করোনা মোকাবেলায় আগামীতে প্রতি বছর অথবা ছয় মাস অন্তর টিকা নিতে হতে পারে। যেমন- বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য বছরে একবার ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন এবং প্রতি পাঁচ বছরে একবার নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন নিতে হয়। বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থা চালু আছে। তবে এই ভ্যাকসিন কিনে নিতে হয়। ভ্যাকসিনের দাম বেশি হওয়ায় অনেকে নেন না। শহরের এই চিত্রের সঙ্গে গ্রামের চিত্রের তুলনা কমবেশি একই। গ্রামের মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে ভয়ভীতি নেই। গ্রামের পথে পা বাড়ালে মনে হতে পারে কখনও এই দেশে করোনার কোন অস্তিত্ব ছিল না। বগুড়ার সোনাতলার প্রবীণ ব্যক্তি নূরুল আনোয়ার বললেন, গ্রামের মানুষ এমনিতেই স্বাস্থ্য সচেতন নয়। তার ধারণা, শহরের বিষাক্ত বাতাসের চেয়ে গ্রামে গাছগাছালি ও নদীর তীরের ফ্রেশ এয়ারে গ্রামের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তাছাড়াও কৃষিজীবীদের কায়িক শ্রম বেশি। তারা রোগ সহনশীল। বগুড়া নগরীর প্রবীণ ব্যক্তি সদরুল হক বলেন, করোনাকাল কবে কাটবে তার নির্দিষ্ট কোন সময় কোন বিজ্ঞানী দিতে পারেননি। তবে কোন সময় করোনাকাল বিদায় নিলে করোনার চিত্র হয়ে থাকবে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মহামারী আকারে আসা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিনের মতো করোনা ভ্যাকসিন বিশ্বে চিরস্থায়ী আসন নেবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, করোনা বোধ করি যাবে না কোনদিন। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই টিকে থাকবে। চীনের উহান শহরে যে করোনার যাত্রা শুরু তা থেকেই যাচ্ছে। যখন থেকেই যাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ বলছেন তখন আর রাখঢাক করে লাভ কি? একটি পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, টিকা নেয়ার পর এ্যান্টিবডি থাকে আট থেকে নয় মাস। ধরা যাক প্রায় এক বছর। এখন একটি ভ্যাকসিন নেয়ার পর এক বছরের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে আরেকটি ভ্যাকসিন নিলেই তো মিটে গেল। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের বছরে দুইবার ভিটামিন এ প্লাস টিকা খাওয়ানো হচ্ছে। করোনার টিকা ১৭ কোটি মানুষকে প্রতি বছর একবার করে দেয়া কি সম্ভব? যদি সম্ভব হয় তাহলে ভাল। যদি সম্ভব না হয় তাহলে ভর্তুকি দিয়ে সাধ্যের মধ্যে মূল্য নির্ধারণ করে প্রতি বছর প্রত্যেক মানুষ যেন একবার করে করোনা টিকা নিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা উচিত। বর্তমানে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা টাকা দিয়েই কিনে নিতে হয়। চিকিৎসকগণ মানব শরীরের রোগ জেনে ও বুঝে ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেন। প্রসঙ্গত বলা দরকার, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে স্প্যানিশ ফ্লুতে (ইনফ্লুয়েঞ্জা) অনেক লোক মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা আবিষ্কার হয়। একবিংশ শতকের বিশ্ববাসী সৌভাগ্যবান যে, কোভিড-১৯-এর টিকা এক বছরের মধ্যে আবিষ্কার হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই টিকাকে উন্নতমানের করা, যাতে ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকার মতো প্রতি পাঁচ বছরে একবার নিলেই চলে। লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, জনকণ্ঠ

ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২