কিছুদিন আগে বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংকিং কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। সেখানে স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছিলাম যে, দেশের এজেন্ট ব্যাংকিং অবশ্যই কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে এবং এর বিস্তৃতি কোন অবস্থাতেই বেশি বাড়তে দেয়া ঠিক হবে না। এমন বিধান থাকতে হবে যে, ব্যাংকিং উপসেবা বা বাই-প্রোডাক্টের মাধ্যমে কোন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রতারিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বিনাবাক্যে সেই ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের অর্থ পরিশোধ করবে এবং পরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই গ্রাহকের অর্থ আটকে রাখা যাবে না। এই ধরনের ফ্রড প্রটেকশন গ্যারান্টি যে কোন ব্যাংকিং উপসেবা বা বাই-প্রোডাক্ট প্রদানের পূর্বশর্ত। বিশেষ করে যখন তৃতীয় কোন এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংক কোন সেবা প্রদান করে থাকে, তখন এই ফ্রড প্রটেকশন গ্যারান্টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা হয়। যেমন- উন্নত বিশ্বে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার খুবই জনপ্রিয়। তার অনেক কারণের মধ্যে একটি অন্যতম কারণ এই ফ্রড প্রটেকশন গ্যারান্টি। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির ঘটনা রিপোর্ট হওয়া মাত্রই সেই ব্যাংক বিনাবাক্যে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের অর্থ ফিরিয়ে দেয়। নিজেরই একবার ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার ডলার হাতিয়ে নিয়েছিল। এই ঘটনা রিপোর্ট করা মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে সমুদয় অর্থ সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। এই ধরনের ফ্রড প্রটেকশন গ্যারান্টি ছাড়া বিকাশ, নগদ, অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং বা এজেন্ট ব্যাংকের অনুমতি দেয়া মোটেও উচিত হয়নি। এজেন্ট ব্যাংকের জালিয়াতির দায়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে? যে ব্যাংকের এজেন্সি নিয়ে সেই এজেন্ট ব্যাংক ব্যাবসা করছিল, এখন সেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে গ্রাহকের সমুদয় অর্থ পরিশোধ করে দিতে বাধ্য করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। একবার এমনটি করতে পারলে ভবিষ্যতে সব ব্যাংকই সতর্ক হবে এবং আর কোন ব্যাংকিং উপসেবা বা বাই-প্রোডাক্ট জনপ্রিয় করে তোলার হুজুগে মেতে উঠবে না।
এসব সেবা চালু হয় প্রথমত উন্নত বিশ্বে। সেখান থেকে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে আমদানি হয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের কোন সেবা যখন গ্রহণ করা হয় তখন তা হুবহু গ্রহণ না করে খন্ডিত আকারে বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণমূলক শর্তগুলো বাদ দিয়ে গ্রহণ করা হয়। ফলে পরিণতি যা হবার তাই হয়। কিছুদিন যেতে না যেতেই বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয় এবং শুরু হয়ে যায় হৈচৈ এবং সেইসঙ্গে নতুনভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। ফলে অনেক চেষ্টা করেও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আমাদের দেশে কেন বিকাশ, নগদ, মোবাইল ব্যাংকিং বা এজেন্ট ব্যাংকিং এর মতো উপসেবা বা বাই-প্রডাক্ট এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উত্তর একটিই, তা হলো আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতা। ডিজিটাল বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সত্যিকার অনলাইন ব্যাংকিং সেবা চালু করতে পারেনি। প্রকৃত অনলাইন ব্যাংকিং এমন এক ধরনের আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যাংকের গ্রাহক দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে তার হিসাবে এক্সেস পেতে পারে এবং নগদ লেনদেন ব্যতিরেকে যে কোন ধরনের ব্যাংকিং লেনদেন নিজেই সম্পন্ন করতে পারে। যে কোন ধরনের বিল পরিশোধ, এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে অর্থ স্থানান্তরসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রকার লেনদেন গ্রাহক ঘরে বসেই করতে পারে। এই কাজগুলো মূলত ব্যাংকই তাদের লোকবল দ্বারা সম্পন্ন করে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহক যে লেনদেন করে, সেগুলো প্রসেস করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিভাগ আছে এবং সেই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই লেনদেন প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে এক্সিকিউট বা সম্পন্ন করে থাকে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের অর্থ অনেকেই ভাবতে পারেন যে, গ্রাহকরা নিজেরাই লেনদেন করার স্বাধীনতা পেয়ে যাবেন। বিষয়টি মোটেও তা নয়। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সুবিধা হচ্ছে গ্রাহক যে কাজটি ব্যাংকের শাখায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ করতেন, সেটিই তিনি অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লগ-অন করে করতে পারবেন। মূল লেনদেনের কাজটি ব্যাংকের কর্মচারীরাই পেছন থেকে সম্পন্ন করবেন। যেমন- কোন গ্রাহক অনলাইন ব্যাংকের মাধ্যমে তিতাসের গ্যাস বিল পরিশোধ করার পর সেই নির্দেশ চলে যাবে অনলাইন ব্যাংকিং লেনদেন প্রসেসিং কেন্দ্রে। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সেই পরিশোধিত বিলটি যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হলে প্রসেস করার এন্ট্রি দেবেন এবং লেনদেনটি সম্পন্ন হবে। এখানে তিতাস-এর হিসাব নম্বরটি আগেই ভেরিফাই করে ব্যাংকে তালিকাভুক্ত করে রাখা হবে। ফলে বিলের অর্থ অন্যত্র ক্রেডিট হবার সুযোগ নেই। এভাবে সকল প্রকার বিল পরিশোধ, কোন ঋণের কিস্তি পরিশোধ বা কিস্তিতে কেনাকাটার মাসিক অর্থ পরিশোধসহ সকল প্রকার লেনদেন অনলাইনে সম্পন্ন করতে পারে।
দেশে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কোন ব্যাংকিং সেবা প্রদান করতে গেলে গ্রাহকদের অর্থের নিশ্চয়তা বিধানের যে শর্ত থাকার কথা ছিল, তা রাখা হয়নি। ফলে কোনরকম জালজালিয়াতির ঘটনা ঘটলে গ্রাহকই প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেহেতু আধুনিক আর্থিক সেবা এখন যুগের চাহিদা এবং গ্রাহকরা বিকাশ, নগদ বা এজেন্ট ব্যাংকিং থেকে সেবা পেয়ে একবার অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাই যতই জালজালিয়াতির ঝুঁকি থাকুক এই সেবা আকস্মিক বন্ধ করার সুযোগ নেই। তাই দেশে প্রকৃত অনলাইন ব্যাংকিং সেবা কার্যকর করেই ক্রমান্বয়ে গ্রাহকদের ব্যাংকের উপসেবা বা বাই-প্রোডাক্ট থেকে সরিয়ে আনতে হবে। কাজটি অবশ্যই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর এটি যতদিন না হবে, ততদিন পর্যন্ত যেহেতু বিকাশ, নগদ বা এজেন্ট ব্যাংকের মতো তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবা চালু রাখতে হবে। তাই এই সেবাগুলো কঠোর নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, যাতে করে কোন গ্রাহক জালজালিয়াতির কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। প্রথমেই লেনদেনের পরিমাণ এবং সংখ্যা সীমিত করে দিতে হবে। এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে জালজালিয়াতির ঘটনা ঘটলে এবং এতে কোন গ্রাহকের অর্থ আত্মসাত করা হলে বা গ্রাহক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, যে ব্যাংকের এজেন্টের মাধ্যমে এটি হবে সেই ব্যাংককে গ্রাহকের সমুদয় অর্থ বিনাবাক্যে পরিশোধ করে দিতে হবে তাৎক্ষণিক। এরপর সেই ব্যাংক ক্ষতিপূরণের অর্থ যেভাবে পারে সেভাবে আদায় করে নেবে। একইভাবে বিকাশ, নগদ এবং অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকেও এই ধরেনের ফ্রড প্রটেকশন গ্যারান্টির শর্ত মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। সাধারণত এই ধরনের সেবা চালু করার আগে নতুন ধরনের বীমা চালু করা হয় ফ্রড প্রটেকশন গ্যারান্টি প্রদানের জন্য। সেবা প্রদানকারী সংস্থা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে প্রিমিয়াম প্রদানের মাধ্যমে এই ফ্রড প্রটেকশন গ্যারান্টি পলিসি ক্রয় করে, যার মাধ্যমে জালজালিয়াতির ঝুঁকি সংস্থা নিজের কাধে না নিয়ে ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাঁধে দিয়ে থাকে। যেহেতু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী, তাই তারা এই প্রোডাক্ট বিক্রি করে নিজেরাও লাভবান হতে পারে এবং সেইসঙ্গে জালজালিয়াতির কারণে গ্রাহকদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার ঝুঁকি লাঘবেও ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের দেশে ইন্স্যুরেন্সের সেবার প্রতি মানুষের আস্থা কম, কারণ তারা ক্ষতিপূরণ দিতে অনেক ঝামেলা করে। এই ক্ষেত্রে তেমনটি হবার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ এখানে কোন ব্যক্তি গ্রাহক ইন্স্যুরেন্স কিনবে না। এই পলিসি ক্রয় করবে সেবাপ্রদানকারী সংস্থা, ক্ষতিপূরণও দাবি করবে সেই সংস্থা। তাই ব্যবসা হারানোর ভয়ে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দিতে কোনরকম গড়িমসি করার সুযোগ পাবে না। দেশে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো এই ধরনের বীমা সুবিধা প্রদান করে না। তবে সময় এসেছে এই নতুন খাত নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার এবং এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং প্রথমদিকে সহযোগিতাও দিতে পারে। মোটকথা, বড় ধরনের জালজালিয়াতির ঘটনা ঘটার আগেই এবং গ্রাহকদের বৃহত্তম অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সামাজিক অসন্তোষ তৈরির আগেই এজেন্ট ব্যাংকিংকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসার এখনই উপযুক্ত সময়।
লেখক : ব্যাংকার, টরনটো, কানাডা
[email protected]








