জানি, প্রিয় পাঠাক-পাঠিকাদের কাছে বর্তমান নিবন্ধটির শিরোনাম বিভ্রান্তিকর বলে মনে হবে। নিবন্ধটি না পড়া পর্যন্ত অবশ্য তেমনটি মনে হওয়াই স্বাভাবিক। দীর্ঘমেয়াদী এই বিষয়টি, প্রায় ৮০ বছর ধরে অব্যাহতভাবে চললেও তার সমাধানের ন্যূনতম লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। এই সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের (বিভক্ত কর আর শাসন কর-Divide and Rule নীতিসম্পন্ন) অধীনস্থ অবিভক্ত ভারতবর্ষ, সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসনামলে বিপুল রক্তক্ষয়, আত্মাহুতি, কারানির্যাতন এবং ২৩ বছরের নিরন্তর গণসংগ্রাম ও নয় মাসব্যাপী পরিচালিত সশন্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে কষ্টার্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর।
আগেই বলেছি, ইংরেজ শাসকরা যেহেতু বিদেশী তাই তাদের শাসনের মেয়াদ যতটা সম্ভব দীর্ঘ করে তোলার তাগিদে উরারফব ধহফ জঁষব নীতি গ্রহণ করে। ওই একই স্বার্থে কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক দক্ষিণপন্থী অংশ ও মুসলিম লীগকে দিয়ে অসংখ্যবার ঘটানো হয়েছিল ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ওই দাঙ্গা থামানো এবং ‘সাম্প্রদায়িকতার অবসান’ ঘটানোর লক্ষ্যে পাকিস্তান নামে একটি ঘোষিত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ভারত বিভাগের মাধ্যমে গঠন ও তার ২৩ বছরব্যাপী শাসনকালজুড়ে সাম্প্রদায়িকতা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হানাহানি বজায় থাকলেও তা অস্বাভাবিক ছিল না। ২৩ বছরব্যাপী পাকিস্তানী শাসনামলজুড়েই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিতে অকুতোভয় লড়াই, সংগ্রাম চালিয়ে এবং সর্বশেষ নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে সাত কোটি বাঙালী ১৯৭১ সালে যে স্বাধীন রাষ্ট্রটি গঠন করলেন তার চরিত্র ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী শাসনামলের চাইতে ভিন্ন প্রকৃতির হতেই হবে। কারণ বছরব্যাপী পরিচালিত ওই গণসংগ্রামের এবং নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাহাত্তরের সংবিধানে চার মূলনীতি আকারে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের নয় মাসের মধ্যে। রাষ্ট্রীয় সেই চার মূলনীতিতে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ (বাঙালী জাতীয়তাবাদ) স্পষ্টাক্ষরে লিখিত হয়েছিল।
তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটানো হবে আমাদের পবিত্র সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তদুপরি এ কথাও স্পষ্টভাবেই বলা যায়, যেহেতু বাংলাদেশের জন্ম পাকিস্তান এবং সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গণআন্দোলন এবং সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে তাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত তো দূরের কথা, সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণাও সংবিধানের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হওয়ার কথা। বাস্তব চিত্রটি হলো তার ভিন্ন। সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পুনরাবির্ভাব বাংলাদেশের মাটিতে ঘটতে সময় লাগেনি। এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের অল্পকাল পর থেকেই একটি গোষ্ঠী ওই জঘন্য ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির ঘোষণার পর থেকেই।
দেশের প্রায় সকল জেলা ও উপজেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বিনা কারণে আক্রমণ, হত্যা, নারী অপহরণ, সম্পত্তি ও বসত ভূমি গ্রাস জাতীয় নানা ঘটনা ঘটেই চলেছে। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে বন্দুকের আঘাতে বাহাত্তরের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ্’ সংযোজন এবং জামায়াতে ইসলামীকে বৈধকরণের মাধ্যমে পাকিস্তানীকরণের এক প্রক্রিয়া শুরু করেন এবং অপর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রটির ইসলামীকরণে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন। এই দুটি সংশোধনীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ সকল ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী দল কখনও ঐক্যবদ্ধভাবে আবার কখনও পৃথকভাবে আন্দোলন পরিচালনা করেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ওইসব প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬-তে প্রথম এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে বিপুলসংখ্যক আসনে নির্বাচিত হয়েও জিয়া ও এরশাদের সংশোধনী বাতিল করে বাহাত্তরের সংবিধান অবিকল পুনরুজ্জীবিত করতে পারিন। ফলে এখনও কোন কোন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা হচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির দৃশ্যমান উত্থান ঘটেই চলেছে। এর সর্বশেষ ঘটনা হলো সম্প্রতি খুলনায় হিন্দু গ্রামে হামলা। খুলনার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রামের চারটি মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু দোকান ও কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত ৯ জুলাই শনিবার শতাধিক দুর্বৃত্ত একযোগে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। এ ঘটনা দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, রাত নয়টার দিকে পূর্বপাড়া মন্দির থেকে কিছু সংখ্যক ভক্ত নারী কীর্তন গাইতে গাইতে শিয়ালী মহাশ্মশানের দিকে যাচ্ছিলেন। পথের মাঝে একটি মসজিদ ছিল। মসজিদটির ইমাম মাঝে মাঝেই ধর্মপ্রাণ নিরীহ মানুষকে উত্তেজিত এবং উন্মত্ত করে তুলে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে। সত্যি সত্যি ধর্মের অবমাননা ঘটছে কিনা তা খতিয়ে না দেখে অবলীলায় অপরাধীরা টার্গেট না হয়ে টার্গেট হচ্ছেন নিরপরাধ সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়। আক্রান্তরা বলছেন, ঘটনার উৎপত্তি এবং এ জাতীয় ঘটনার আশঙ্কার কথা জানানো সত্ত্বেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিষ্ক্রিয় থেকে পরোক্ষভাবে দুষ্কৃতকারীদের সহায়তা করার শাস্তিযোগ্য অপরাধ তারাও করেছেন এবং এমন ঘটনা বারংবার ঘটছে।
অপর এক খবরে জানা যায়, রাজধানী সংলগ্ন কেরানীগঞ্জে এক সংখ্যালঘু পরিবারকে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কয়েকজন। বাড়িঘর ছেড়ে চলে না গেলে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার হুমকি দেয় ওই প্রভাবশালীরা। ঘটনাটি ঘটেছে কেরানীগঞ্জ উপজেলার কালিন্দী ইউনিয়নের ব্রাহ্মণ বিত্তা মালোপাড়া এলাকায়। এ ব্যাপারে ওই বাড়িতে বসবাসকারী মনি রাজবংশী কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। জানা যায়, মনি রাজবংশী পেশায় একজন পিঠা বিক্রেতা। থাকেন কেরানীগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণ বিত্তা মালোপাড়া এলাকায় তার নিজস্ব পৈতৃক ভিটায়। বাড়ির সামনেই একটি টং দোকান করে তিনি পিঠা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই বাড়িতেই থাকেন তার আর এক বোন বনলতা ভৌমিক। কিছুদিন ধরে প্রভাবশালী কিছু লোক তাদের উৎখাতের হুমকি দিচ্ছে। মনি রাজবংশী জানান, এই বাড়িটির মালিক তার বাবা শচীন্দ্র রাজবংশী। বাবা মারা যাওয়ার পর ৩০ বছর ধরে তারা তিন বোন এই বাড়িতেই থাকেন। বিয়ের পর ছোট বোন অঞ্জনা পোদ্দার শ্বশুরবাড়ি রামপুরাতে থাকেন। থানা কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছেন- তারা এ ব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন, কিন্তু এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত (১০ জুলাই দুপুর) তা গৃহীত হয়নি।
সুনামগঞ্জের শাল্লার ঘটনা দেশে-বিদেশে আলোচিত। এই গ্রামে মাস কয়েক আগে প্রকাশ্য দিবালোকে মসজিদের মাইক থেকে প্রচার করে লোকজন ডেকে শতাধিক লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রায় একশত পরিবারকে আহত করে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। ঘটনার কারণ হলো দুদিন আগে হেফাজত নেতা মমিনুল হক ওয়াজের নামে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালালে যুবক ঝুমন দাশ তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। তার প্রেক্ষিতে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওই হামলার ঘটনা ঘটানো হয়। ঝুমন দাশকে আটক করা হয়। গ্রামবাসীরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে জনাকয়েক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয় এবং কিছুদিনের মধ্যে তারা জামিনে মুক্তি পায়। কিন্তু ঝুমন দাশ আজও কারাগারে। সে কারণেই শিরোনাম দিলাম অপরাধীরা শাস্তিহীন-নিরপরাধ কারাগারে।
লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক
[email protected]








