বিশুদ্ধ ভাবনা কবিতার একটি অনুষঙ্গ হলেও কবিতা মাথা ঘামিয়ে মাপ-জোখ করে নির্মাণের কোন বিষয় নয়। কবিতা মূলত হয়ে ওঠার একটি শিল্প। আবার হৃদয় তন্ত্রীতে হঠাৎ বেজে ওঠা ঐশ্বরিক মন্ত্রও কখনও কখনও কবিতা। কারও মতে-সূ² অনুভূতির শৈল্পিক প্রকাশই কবিতা। তবে মূল কথা হলো-কবিতা শিল্পেরও শিল্প। এই শুদ্ধতম শিল্পটি হৃদয়াবেগ ও মননাশ্রিত হলেও এ যুগের কবিতা আবেগের সঙ্গে মেধা ও শৈল্পিক বন্ধনের সঙ্গে কবির ধ্যান মগ্নতাও দাবি করে। কেননা শিল্প মাধ্যমের সবচেয়ে রহস্যময় শিল্পই তো কবিতা। এর শব্দ আর নৈঃশব্দের ভেতর কত যে বিচিত্র ভাবনার পথ রচিত হয়ে বয়ে যায় অসীমের টানে, তা শুধু মুুগ্ধ অনুধাবনেরই মাত্রা বাড়ায়। আমার তো মনে হয়, কবিতা অন্তরাত্মারও এক অনির্বচনীয় বাক্সময় উচ্চারণ। আত্মাকে ধারণ করে রেখেছে যে ভেতরের অনিন্দ্য সুন্দর, সে-ই যেন হাজারো শব্দের ঝিনুকের মুখ খুলে শিল্পানুভূতির মুক্তো ছড়িয়ে দেয় কালো কালো অক্ষরের পরতে পরতে। এই সৌন্দর্যই হয়ে ওঠে কবিতার শিল্পিত ঐশ্বর্য। কবিতা তখন আর নির্মাতার একার থাকে না; অনুরণিত হতে থাকে তৃষিত মন ও মননে। রূপকের ভাষায় কবিতা তো চিরকালই অধরা এক নিক্কন নারী। পড়তে পড়তেই এটি কেবল আপনার হয়ে ধরা দেয়। এই যে কবিতার বিভিন্ন শিল্পরূপ, তা নিয়ে বোদ্ধাদের কথারও শেষ নেই। যেমন বলা হলো- কবিতার শরীর যেন এক অধরা নিক্কন নারী। অবস্থা যদি এমন হয় যে- অধরা নারীরূপ কবিতা পড়তে পড়তেও ধরা দিল না, তাহলে? এর উত্তরটা হতে পারে দুদিক থেকে। সেটি হতে পারে কবিতার নির্মাণগত ত্রæটি-বিচ্যুতি বা স্খলন, হতে পারে পাঠকের গভীর অভিনিবেশের অনুপস্থিতি। স্বাভাবিক বিবেচনায় ভাল একটি কবিতার গঠন শৈলী, ছন্দের দ্যোতনা, বিষয় ভাবনা , প্রকাশভঙ্গির অভিনবত্ব ও হৃদয় বৃত্তির দোলা আগ্রহী পাঠককে কিছুটা হলেও তো নাড়া দেয়ার কথা। এর কোন একটির ব্যত্যয় ঘটলে কবিতা অধরা থাকতেও পারে। কবিতার স্বরূপ নিয়ে, কবিতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে, কবিতার নির্মাণশৈলী নিয়ে এত যে কথাবার্তা তার ভেতরেও কবিতার বিশাল রাজপথের পথিক হওয়ার ইচ্ছেটায় কোন ঘাটতি দেখি না। কিন্তু মহাকালের হাতে থাকা কালোত্তীর্ণ কবিতার মুকুট পেতে হলে যে ত্রিকালদর্শী ধ্যানী হতে হয়, শব্দ-ছন্দ-মাত্রা-চিত্রকল্প, মেধা ও আবেগের মেলবন্ধনে কুশলি হতে হয়, কবিতাকে রক্ত-মজ্জা-আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে নিতে হয়, কখনও কখনও নিজেকে ছাড়িয়েও যেতে হয়- সেই বোধটিকে ধারণ করতে আমরা অনেকেই বোধ হয় কিছুটা কুণ্ঠিত কিংবা বলা যায় অনেকেরই অনেকটা বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়া। প্রায় তিন দশক ধরেই তো দেখছি- কত কবি গভীর উচ্ছ¡াস নিয়ে নিজেকে যুক্ত করলেন এই রাজপথে, লিখতে লিখতে উজ্জ্বলও হয়ে উঠলেন এক সময়, আবার তাদেরই কেউ কেউ নিজেকে নীরবে সরিয়ে নিলেন বা নিচ্ছেন ‘অন্য কোথা, অন্য কোনখানে।’
এ আর যা-ই হোক, বড় বেদনার। এই যে কবিতা থেকে সরে যাওয়া, এটা হয়ত বা আসে অনেকটা হতাশা থেকে, পাঠকপ্রিয়তার অভাববোধ থেকে। তাহলে কি কবি পাঠকরুচির দিকে তাকিয়ে কবিতা লিখবেন? না, তা অবশ্যই না। কিন্তু এটাও কি সত্যি নয় যে পাঠকের পাঠই কবির কবিতা লেখার একটি বড় প্রেরণা? তাহলে তো এ প্রশ্নটিও ওঠে যে একজন কবিতাপিপাসু পাঠক কবির কবিতাটি পড়বেন কেন। এখানেই একটা উপলব্ধি জাগে যে-কবিতা ও পাঠকের মধ্যে একটি আত্মিক মেল বন্ধনের হয়ত খুব দরকার। এই বন্ধনটি কবির একটি দুর্বল কবিতাকেও কালোত্তীর্ণ করে দিতে পারে। কবিতা নির্মাণের ক্ষেত্রে কবি অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বাধীন কিন্তু কবিতা এগিয়ে যায় তার নিজস্ব শক্তিতে। এবং এগোয় তা কবি ও পাঠকের হাত ধরেই। আমরা কথায় কথায় যে জীবনানন্দ দাশকে উদ্ধৃত করি তাঁর উঁচু মানের কবিতাগুলোর (যেমন-সাতটি তারার তিমির কাব্যসহ অন্যন্য কাব্য) চেয়ে তাঁর দুর্বল কবিতাগুলোই বেশি পাঠকপ্রিয়। বলছি না যে কবিকে দুর্বল কবিতা লিখে জনপ্রিয় হতে হবে। কবি কখনও দুর্বল কবিতা লিখতেও বসেন না। কিন্তু বাস্তবতা এই যে-পাঠকরুচি আসলে কোন্ কবিতাটিকে মনে স্থান দেবেন তা কিন্তু আগেভাগে বলা সম্ভব না।
কবিগুরুও তাঁর কবিতার স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে বলেছিলেন-তিনি যদি তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে বেঁচে থাকেন তবে তা হবে তাঁর গানগুলোই। তাঁর এ কথাটিই কিন্তু আজ অনেকটা সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিন হাজারের বেশি কবিতা লেখার কবি রবি ঠাকুরের ক’টা কবিতা আমরা স্বচ্ছন্দে বলতে পারব? সম্ভবত না। তবে তাঁর অনেক গানের কলিই কিন্তু আমাদের অনেকেরই ঠোঁটে ঠোঁটে। কবিতার চিরকালীন আবেদন যেহেতু শেষ পর্যন্ত পাঠকমনই, সেহেতু কবিতা নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকরুচির বিষয়টিও অনুষঙ্গ হিসেবে মাথায় রাখা যেতে পারে বৈকি। একই সঙ্গে কবিতার শরীরে শব্দের দ্যোতনা ও লাবণ্যের ছোঁয়া থাকাটাও ভাল কবিতা হয়ে ওঠার জন্য জরুরী। আধুনিক কবিতার নামে কবিতার শরীরে অযথা দুরূহ ও অনাবশ্যক শব্দ বসিয়ে, কবিতাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শব্দ ভাঙাভাঙির এক্সপেরিমেন্টের ক্ষেত্র বানিয়ে কবিতাকে অপাঠযোগ্য করে তোলার কোন মানে হয় না। তবে এ-ও ঠিক-কোন কবিরই উচিত না-পাঠকরুচির কাছে নিজেকে সমর্পিত করা। বরং কবিই পাঠকরুচি তৈরির কাজটি করতে পারেন। একজন অধ্যাবসায়ী ও মেধাবী কবির পক্ষেই সম্ভব এ কাজটি করা। তিনিই পারেন-তাঁর কবিতাটিকে পাঠকরুচির অনুগামী করতে।
আসা যাক- কবিতার পাঠকের গভীর অভিনিবেশের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে। বলতেই হয় যে কবি তাঁর কবিতা নিয়ে যতটা এগিয়ে গেছেন পাঠক কিন্তু ততটা এগোতে পারেননি। তাঁদের বেশিরভাগই পড়ে আছেন সময়ের দাবির অনেক পেছনে। এর প্রধান কারণ হলো- গল্প উপন্যাসের মতো সাহিত্যের বিভিন্ন ডালপালার সহজবোধ্যতা। সহজবোধ্য বলে সাহিত্যের বেশিরভাগ পাঠকই ঝুঁকেছেন গল্প উপন্যাসের দিকে। কমেছে কবিতার পাঠক। এটাই স্বাভাবিক ও বাস্তবতা। এ বাস্তবতা আগেও ছিল, এখনও আছে। কবিতার পাঠকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে চল্লিশের দশকের কবিরা এক সময় ‘আরও কবিতা পড়ুন’ নামে একটি ¯েøাগান নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।
(সূত্র-সম্পাদকীয়, কৃত্তিবাস, জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যা, ২০১০) উদ্দীপক এই ¯েøাগানটি কতটা কাজ দিয়েছিল, জানি না, তবে কবিতার দিকে পাঠকমনকে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগটি একেবারে নিরর্থকও নয় বরং এখনও এটি অনেকটাই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সমস্যা হলো-কবিতা ধারাবাহিকভাবে এগোতে এগোতে এখন যেখানটায় এসে দাঁড়িয়েছে সেখানটায় পাঠককে রাতারাতি উপস্থিত করানো সত্যিই দুঃসাধ্য। পাঠককে এটা বুঝতে হবে যে আজকের কবিতা হুট করে এমন আপাত: দুর্বোধ্য চেহারা নিয়ে দাঁড়ায়নি। সময়ের ভাঁজে ভাঁজে ভাঙতে ভাঙতে এখানটায় এসেছে। তাঁকে মানতে হবে যে-আধুনিক কবিতা চট করে বুঝে নেবার মতো কোন বিষয় নয়।
পাঠক যদি রবীন্দ্র-নজরুল যুগের অন্তঃমিলের সহজ সরল কবিতা এখনও পড়ার জন্য ব্যাকুল থাকেন, গল্প উপন্যাসের মতো কবিতাতে ডুব দিয়েই রস উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে বলতেই হবে- তিনি নির্ঘাত হতাশ হবেন। পাঠক যদি কবিতা পাঠ করতেই চান তবে তাকে বুঝতে হবে যে আধুনিক জীবনের যন্ত্রণাদগ্ধ আবেগ ও বিশ্ব সংসারের নানাবিধ সঙ্কট ও সংশয় বর্তমান যুগের কবির মনে যে অভিঘাতের সৃষ্টি করে তাতে কবিতার শরীরও হয়ে উঠেছে দৃশ্যত দুর্বোধ্য ও রহস্যের আবরণে আবৃত। তবে এই আবরণ ভেদ করা দুঃসাধ্য বা দুরূহও নয়। কবিতার রস আস্বাদনে আগ্রহী পাঠককেই এগিয়ে আসতে হবে এই আবরণ ভেদ করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতাটুকু নিয়ে। আর এই যোগ্যতা অর্জন করতে বেশি বেশি কবিতা পাঠের কোন বিকল্প নেই।
আজকাল অনেক কবিই ‘অন লাইন’ এ নিজেকে যুক্ত করার দিকে ঝুঁকছেন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেকে ছড়িয়ে দেয়ার তাগিদেই হয়ত বা। তাতে কবিতার যথেষ্ট দেখাও মিলছে। এটি হতে পারে কবির আপলোড করা কবিতার বিষয়ে পাঠকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানার একটা চেষ্টা। হতে পারে কবির কবিতা চর্চার এটি একটি অবারিত মাধ্যমও। পত্র-পত্রিকার কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অনলাইনে বেশি বেশি কবিতা লেখার প্রবণতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখা যেতে পারে। একজন কবিতাপ্রেমী হিসেবে আমি কায় মনোবাক্যে চাই- যে কোন মাধ্যমেই হোক- কবিতা হয়ে উঠুক বিশুদ্ধ মানের, মন ছুঁয়ে যাক কবিতা, কালজয়ী হোক কবিতা, এগিয়ে যাক কবিতা পথ কেটে কেটে, নতুন গতি ও আবেগের মনন ধারায়।








