জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘পথের দিশা’ কবিতার পঙ্্ক্তিমালায় নিবন্ধের নির্যাস অনুধাবন ও প্রকৃষ্ট স্বরূপ উন্মোচনে সমধিক প্রযোজ্য। ‘চারদিকে এই গুন্ডা এবং বদ্মায়েসির আখড়া দিয়ে/ রে অগ্রদূত, চলতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?/ পারবি যেতে ভেদ করে এই বক্র-পথের চক্রব্যূহ?/ উঠবি কি তুই পাষাণ ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ?/ আজকে প্রাণের গো-ভাগাড়ে উড়ছে শুধু চিল-শকুনি/ এর মাঝে তুই আলোক-শিশু কোন্ অভিযান করবি, শুনি?/ ছুড়েছে পাথর, ছিটায় কাদা, কদর্যের এই হোলিখেলায়/ শুভ্র মুখে মাখিয়ে কালি ভোজপুরীদের হট্টমেলায়/ বাঙলা দেশও মাত্ল কি রে? তপস্যা তার ভুললো অরুণ?/ তাড়িখানার চিৎকারে কি নাম্ল ধুলায় ইন্দ্র বরুণ?/ ব্যগ্র-পরান-অগ্র-পথিক, কোন্ বাণী তোর শুনাতে সাধ?/ মন্ত্র কি তোর শুনতে দেবে নিন্দাবাদীর ঢক্ক-নিনাদ?’ সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য, ষড়যন্ত্র বা হত্যার কুৎসিত রাজনীতি কখনও ইতিহাসের সাবলীল ধারাকে রুদ্ধ করতে পারে না। বিশ্বশ্রেষ্ঠ মুক্তির মহানায়কদের অতুলনীয় অবদান মলিন করার প্রচেষ্টায় যারাই লিপ্ত ছিল, দুর্ভেদ্য সত্যের কাঠিন্যে কালান্তরে তারাই ইতিহাসের নিকৃষ্টতম আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
বিশ্ববাসী সম্যক অবগত আছেন নানামুখী চক্রান্তের ফলশ্রুতিতে যুদ্ধজয়ের কথিত অধ্যায় কালের আবর্তনে ধূসর-কদাচার-পাপাচার স্মৃতির পরিশিষ্ট হয়েছে। স্বল্প পরিসরে বিস্তারিত বর্ণিত করা না গেলেও সংক্ষেপে এটুকু বলা যায়, পবিত্র কারবালা-পলাশীর যুদ্ধের ঘটনা পরিশীলিত মানবতাকেই উদ্দীপ্ত করেছে। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীন মাতৃভূমির প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শাহাদাত বরণের জন্য দায়ী ভয়ঙ্কর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা-হত্যার কুৎসিত পরিবেশ ও ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী-হত্যাযজ্ঞে প্রত্যক্ষ জড়িত খুনীরা ইতোমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্বসমাদৃত আইনের যথার্থ মানদন্ডে পরীক্ষিত প্রমাণিত পর্যাপ্ত প্রচলিত আইনের আওতায় বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে দৃঢ়চেতা সরকার হত্যাকারীদের বিচার-বিচারের রায় কার্যকর করে দেশকে কলঙ্কমুক্তির অভিধায় অভিষিক্ত করতে পেরেছে। বিদেশে লুকিয়ে থাকা খুনীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রায়োগিক ব্যবস্থা গ্রহণেও সরকার তৎপর রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে বর্বরতম এই হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত ঘৃণ্য সেনা-স্বৈরশাসকদের ভূমিকা আড়াল করার শত ব্যর্থ চেষ্টা নিধন করে প্রকৃত ঘটনাবৃত্ত দেশ-বিদেশে নরপশুতুল্য এই দানবদের মুখোশ সুস্পষ্ট করেছে।
৯ জুলাই ১৯৭৯ সাল। আধুনিক সভ্যসমাজের পাঠোদ্ধারে সর্বনিকৃষ্ট কলঙ্কজনক দিন হিসেবে নির্ধারিত। ওইদিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকার প্রদেয় ধরিত্রীর অতি উঁচুমার্গের সর্বস্বীকৃত বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানকে কলুষিত করার ভয়ানক অপচেষ্টার পরিচ্ছদ নির্মিত হয়। এদিন ১৯৭৫ সালের ৫০ নং অধ্যাদেশ হিসেবে পরিচিত আইনটি ১৯৭৯ সালে সংসদ কর্তৃক অনুমোদন দেয়া হয় এবং পঞ্চম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই জঘন্য আইন প্রবর্তন করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া। ১৯৯৬ সালের ১২ নবেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৭ম জাতীয় সংসদে আইনটি বাতিল করে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচারের পথকে সুগম ও উন্মুক্ত করা হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হয়।
উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে, সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্প্রতি প্রয়াত সভাপতি বিশিষ্ট মেধাবী আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিবন্ধের উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিকতায় তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, ‘ন্যায়বিচার প্রাপ্তি মানুষের জন্মগত ও মৌলিক অধিকার। কাউকে হত্যা করলে তার শাস্তি হলো বিচার সাপেক্ষে মৃত্যুদন্ড; বয়স ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় যাবজ্জীবন কারাদন্ডও হতে পারে। কিন্তু কোন নিরপরাধ-নিরস্ত্র নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করে কোন সভ্যতায় কোন আইনে কেউ পুরস্কৃত হতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশের জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পর খুনীদের বিচার না করে বরং নানাভাবে তাদের পুনর্বাসন ও পুরস্কৃত করা হয়। শুধু পুরস্কৃত করাই হয়নি বরং খুনীদের যাতে বিচার না হয় সে জন্য জারি করা হয়েছিল অবৈধ ও অসাংবিধানিক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ।’
উক্ত নিবন্ধে তিনি আরও বলেছেন, ‘বিশ্বে অনেক মহাপুরুষ নিহত হয়েছেন অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে। কিন্তু কোথাও একই পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে হত্যার নজির নেই। যে কোন হত্যাকান্ডের বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়ে থাকে। খুনীরা অজ্ঞাত হলেও খুঁজে বের করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনীরা ছিল আত্মস্বীকৃত। হত্যাকান্ডের পর তারা প্রকাশ্যে বলেছিল, ‘আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি।’ ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাদের এই স্বীকারোক্তির খবর প্রকাশ পেয়েছিল। এর পরও তাদের গ্রেফতার করা হয়নি, বরং ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতার হত্যার বিচার আটকে দেয়া হয়েছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয় এ হত্যাকা-ে খন্দকার মোশতাক ও জিয়ার শুধু মৌন সম্মতিই ছিল না, বরং তারাই ছিল হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড বা কুশীলব।’
কবি নজরুলের কবিতার অমর পঙ্ক্তি ‘অসত্যের কাছে কভু নত নাহি হবে শীর, ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর’ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করেই ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির পদে ইস্তফা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি নিয়োগপ্রাপ্ত হন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তাঁর নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার মূলমন্ত্র ছিল শোষণমুক্ত জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এরই আলোকে ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সংবাদ সম্মেলনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ঠিক পরের দিন রমনা রেসকোর্স ময়দানকে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে নামাকরণের ঘোষণা এবং সরকারী আদেশে মদ, জুয়া, হাউজিসহ অনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করেন।
১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের হাইকোর্ট অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে হাইকোর্ট গঠন করেন। দেশে উচ্চ শিক্ষার প্রসারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ২১ জানুয়ারি ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেন। ২৪ জানুয়ারি পাক-সামরিক জান্তার সহযোগী হয়ে এদেশে যারা মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধা হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধকর্মে জড়িত বা দালালি করেছে, তাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ৩০ এবং ৩১ জানুয়ারি মুক্তি ও মুজিব বাহিনীর সকল সদস্যবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর নিকট তাঁদের রক্ষিত অস্ত্রসমর্পণ করে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণের ঘোষণা দেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘শোষণমুক্ত সোনার বাংলা কায়েমই আমাদের লক্ষ্য।’
বঙ্গবন্ধুর ৫৩তম জন্মদিন অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনন্দিত গণতন্ত্রের ভারতকন্যা প্রয়াত শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে ঢাকায় আসেন এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৫ বছরের জন্য শান্তি, সহযোগিতা ও মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২৬ মার্চ দেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালন এবং সকল ব্যাংক, বীমা ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা করা হয়। ৮ মে সারা দেশে কবিগুরুর জন্মদিন যথাযথ মর্যাদায় পালন এবং ২৪ মে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকায় নিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারকে একটি ভবন ও রাষ্ট্রীয় ভাতা মঞ্জুর করে ২৫ মে এই বিদ্্েরাহ কবির উপস্থিতিতে অত্যন্ত আড়ম্বর পরিবেশে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়।
স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে অর্থবহ করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ দেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। ৭ মার্চের নির্বাচন যাতে নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, সুন্দর এবং রাজনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকল দলের অংশগ্রহণে যথার্থ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা যায় তার জন্য ১৯৭৩ সালের ১০ জানুয়ারি গণভবনে মন্ত্রীদের উদ্দেশে নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রদত্ত ভাষণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমার দেশ চলবে। এটা যে শুধু আমার কথা তা নয়। যে শাসনতন্ত্র আমরা দিয়েছি সে শাসনতন্ত্রে সেটা প্রত্যেক অক্ষরে অক্ষরে গ্রহণ করা হয়েছে। ... এটা শাসনতন্ত্রের মূলনীতি। যে শৃঙ্খলাকে ভিত্তি করে শাসনতন্ত্র দিয়েছি যার জন্য আমরা স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছি, এতো শহীদ হয়েছে, এত রক্ত দিয়েছি এটা মিথ্যা হয়ে যাবে যদি আমরা আমাদের আদর্শ এবং মূলনীতি থেকে দূরে সরে যাই।’
১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে বেতার ও টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আগামীকাল ষোলোই ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় দিবস। আরও স্পষ্ট কথা বিজয় দিবস। লাখো শহীদের রক্তমাখা এই দিন। লাখো মা-বোনের অশ্রুভেজা এই দিন। আবার সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর স্বপ্ন ও পরম আকাক্সক্ষার এই দিন। এই দিন আমরা পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সোনার বাংলার মানুষ বিদেশী শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তি পেয়েছে। এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে বড় পবিত্র, বড় বেশি গৌরব ও আবেগমন্ডিত। এই দিন আমরা শ্রদ্ধা ও শোকের সঙ্গে স্মরণ করি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের, আবার এই দিন আমরা আনন্দ উৎসব করি, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাফল্যের জন্য। এই দিন এক যুদ্ধ শেষ আর এক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের ষোলোই ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমাপ্তি। এই একই দিনে আমাদের দেশ গড়ার সংগ্রাম শুরু। স্বাধীনতা সংগ্রামের চাইতেও দেশ গড়া বেশি কঠিন। দেশ গড়ার সংগ্রামে আরও বেশি আত্মত্যাগ, আরও বেশি ধৈর্য, আরও বেশি পরিশ্রম দরকার।’
চোরের শক্তি বেশি না ঈমানদারের শক্তি বেশি, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে তাঁর মতো জনগণকেও উজ্জীবিত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যদি পঁচিশ বছর পাকিস্তানী জালেমদের বিরুদ্ধে লড়তে পারি, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে আরম্ভ করে গোলাম মোহাম্মদ, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খান আর ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত সবার সঙ্গে বুক টান করে সংগ্রাম করতে পারি, ৩০ লাখ লোকের জীবন দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি, তা হলে দুর্নীতি, ঘুষখোরি, মুনাফাখোরি আর চোরাচালানও নিশ্চয়ই নির্মূল করতে পারব। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, তোমরাও প্রতিজ্ঞা কর। বাংলাদেশের জনগণ প্রতিজ্ঞা করুক। আমার আর সহ্য করার শক্তি নেই।’ (ভাষণ ১১/০১/১৯৭৫, কুমিল্লা) বঙ্গবন্ধুর অকুতোভয় এসব কর্মযজ্ঞ ও ভাষণ অসাধারণ প্রাণস্পন্দন সঞ্চার ও দেশবাসীকে দেশ গড়ার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রচন্ড উজ্জীবিত করেছিল।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অপরিমেয় সাফল্যগাথায় অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতিতে বাংলাদেশ যখন নতুন অভিযাত্রায় পদার্পণ করেছিল, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতার হিংস্র কৌশলে দেশীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে সংঘটিত হয় সভ্যসমাজের ইতিহাসে সর্বনিকৃষ্ট, নৃশংস ও বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গমাতা, শিশু শেখ রাসেলসহ প্রায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেড় মাস অতিক্রমকালে খন্দকার মোশতাক ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএইচ রহমান স্বাক্ষরিত ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ শিরোনামে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটির প্রথম খ-ে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত আইনের পরিপন্থী যাই কিছু ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রীমকোর্টসহ কোন আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোন আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। আর দ্বিতীয় খন্ডে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী জিয়াউর রহমানের সরকার ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আইন ১৯৭৯ পাসের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দায়মুক্তি অধ্যাদেশসহ চার বছরের সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণার বৈধতা দেয়া হয়। ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহার করায় খন্দকার মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ মূলত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ফলে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়ায় কোন বাধা ছিল না। বিশ্লেষকদের মতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করে ভবিষ্যতেও যাতে কেউ ১৫ আগস্টের খুনীদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা না নিতে পারে সে জন্য সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯ পাস করা হয়। পরবর্তীতে বিচারপীত আবদুস সাত্তার, এইচএম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত না করে খুনীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সরকারের ওপর মহলে এবং বিদেশী দূতাবাসে চাকরি দিয়েছিল। এরশাদ সরকার ক্ষমতায় এলে অধ্যাদেশটি বাতিল না করে ১৯৮৬ সালের ১০ নবেম্বর জাতীয় সংসদে পাসের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন, যা সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৮২ সালের ২ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ৯ নবেম্বর পর্যন্ত এরশাদ সরকারের জারিকৃত সকল সামরিক আইন, অধ্যাদেশ, বিধি নির্দেশ ইত্যাদির বৈধকরণে এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল।
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত চরদলীয় জোট সরকার যৌথ অভিযান দায়মুক্তি বিল ২০০৩ নামে সর্বশেষ ইনডেমনিটি আইন পাস করে। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ইমডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল সংসদে উত্থাপন করে। ১৪ নবেম্বর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটি পরিপূর্ণভাবে আইনে পরিণত হয়। ফলে মোশতাকের জারি করা এবং জিয়ার সময় বৈধতা পাওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হয়।’ নৃশংস-বর্বরতম এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিলুপ্তকরণ প্রসঙ্গে ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রদত্ত বক্তব্যটি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘১৯৯৬ সালে যখন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করি তখন সমালোচনা করা হয়েছিল, অনেকেই বলেছিল আমি প্রতিশোধ নিচ্ছি। বিএনপি সেদিন খুনীদের রক্ষা করতে হরতাল ডেকেছিল। বিচারপতির পরিবারের ওপর হামলা হয়েছিল। একজন সাধারণ মানুষের হত্যার বিচার যেভাবে হয়, জাতির জনকের হত্যার বিচারও সেভাবেই হয়েছে।’ বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসী নিগূঢ় আগ্রহের সঙ্গে এই হত্যাকা-ের বিচার কার্যাবলী শুধু পর্যবেক্ষণ করেননি, এই ধরনের সভ্যতা-মানবতাবিরোধী কর্মযজ্ঞের সুবিচার নিশ্চিতকল্পে সরকারের গৃহীত প্রতিটি আইনী পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে অতিশয় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার অপূর্ব দৃষ্টান্ত হিসেবেও গ্রহণ করেছেন।
বিশ্বকবি রবীঠাকুরের ‘ন্যায়দ-’ কবিতার উদ্ধৃতি থেকে নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, সত্যের জয় অনিবার্য। অন্যায় যে করবে এবং প্রত্যক্ষ-প্ররোক্ষভাবে এই অন্যায় সমর্থনকারী উভয়কে সমতুল্য শাস্তি ভোগ করতে হবে। ‘ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,/ হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা তোমার আদেশে।/ যেন রসনায় মম সত্যবাক্য ঝলি উঠে খড়গসম তোমার ইঙ্গিতে।/ যেন রাখি তব মান তোমার বিচারাসনে লয়ে নিজ স্থান ॥/ অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে ॥’ অতিসম্প্রতি আপামর দেশবাসীর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত সকল অন্ধকার ও অশুভ শক্তির পূজারীদের বস্তু-সত্যনিষ্ঠ নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুততর সময়ের মধ্যে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়েছে। বাঙালী জাতি কখনও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় মাথা নত করেনি এবং ভবিষ্যতেও পরাভূত না হয়ে শুভ ও আলোকিত শক্তির বিজয় পতাকা উড্ডীন রাখবেই- এটিই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়








