ফাহাদ দেয়ালে তার স্ত্রীর ছবির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আজ তার স্ত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী। বিয়ের দুই বছরের মাথায় চার বছর আগে ছিনতাইকারীর হাতে তার স্ত্রীর অপমৃত্যু ঘটে। ফাহাদ তার স্ত্রী নিশাতকে খুব ভালবাসে। নিশাতের স্মৃতিতে এতটাই বিভোর থাকে যে নতুন করে সংসার শুরু করার চিন্তাও তার মাথায় আসে না।
ফাহাদ অফিসে ঢুকেই দেখল তার কলিগরা সবাই গোল হয়ে কী যেন দেখছে। ফাহাদ জিজ্ঞেস করল, এত মনোযোগ দিয়ে কী এমন জিনিস দেখছে সবাই।
রশিদ সাহেব পাশের ডেক্স থেকে বলল, কি আবার, হরোস্কোপ। এই অফিসের সবাই বদরুল সাহেবের বদৌলতে জ্যোতিষ শাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
ফাহাদ বলল, এই যুগেও মানুষ এসব বিশ্বাস করে নাকি?
বদরুল সাহেব ফাহাদের ডেক্সের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, করে করে। জ্যোতিষ শাস্ত্র ফেলনা নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান হলো এক ধরনের সায়েন্স। হাসছেন যে?
ফাহাদ ও রশিদ দুজনেই হাসছে। রশিদ মুখ চেপে বলল, না। না। কোথায় হাসছি?
বদরুল বলল, ফাহাদ সাহেব আপনার জন্ম তারিখটা বলুন তো? দেখি আজ আপনার হরোসকোপে কি লিখেছে।
ফাহাদ বলল, না থাক।
কেন?
ফাহাদ বলল, রাশিফল যারা লেখে, তারা একটা ফর্মুলা ব্যবহার করে লেখে। এমনভাবে লিখে যা কিনা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের সঙ্গে মিলে যায়। ধরুন, মীন রাশির জাতকের বেলায় লিখল, আজ আপনার দিনটি বিষণœ কাটবে। ধরা যাক, দেশের আঠারো কোটি মানুষের মধ্যে মীন রাশির জাতক আছে দেড় কোটি। সেক্ষেত্রে পঁচাত্তর লাখ মানুষের সঙ্গে এই ভবিষ্যত বাণীটি মিলে যাবে। আবার যদি বিপরীতভাবে বলা হয় আজ মীন রাশির জাতকের দিনটি শুভ যাবে, তাও অর্ধেকের সঙ্গে মিলে যাবে। আমাদের জীবন ভাল খারাপ নিয়েই কাটে।
বদরুল সাহেব ফাহাদের কথা শুনে মুখ ভোঁতা করে বসে রইল। মনে মনে বলল, যুক্তিতর্ক দিয়ে জীবন চলে নাকি। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। গরৎধপষবং যধঢ়ঢ়বহ রহ সড়সবহঃং.
অফিস থেকে ফেরার পথে ফাহাদ দেখল, ছোট একটা মেয়ে বেলী ফুলের মালা বিক্রি করছে। নিশাতের বেলী ফুলের মালা খুব পছন্দ ছিল। ফাহাদ মেয়েটির কাছ থেকে সবগুলো মালা কিনে বাসায় ফিরল।
ফাহাদ ফ্রেশ হয়ে ইজি চেয়ারটায় ঝুলতে ঝুলতে কখন যেন নিশাতের স্মৃতিতে হারিয়ে গেল। নিশাতের সঙ্গে পরিচয়টা হয়েছিল একটা মজার ঘটনার মাধ্যমে। থিয়েটারে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল ফাহাদ। নিশাতও গিয়েছিল বান্ধবীদের সঙ্গে। নিশাত বসেছিল ফাহাদের পাশের সিটে। সিনেমার নায়ক নায়িকার একটা দৃশ্যে প্রেম জমে উঠেছে এমন সময় হলের সব দর্শক উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সবাই বিপুল হাততালি দিচ্ছে আর শিষ বাজাচ্ছে। এক সময় নিশাত হাত নাচানাচি শুরু করল। নিশাতে হাতে ছিল আইসক্রিম। ব্যাস, পাশে বসে থাকা ফাহাদ আইসক্রিমে নেয়ে একাকার। তারপর নিশাত সরি বলতে থাকল আর ফাহাদ ইটস ওকে বলতে থাকল। দুজনের মনে ভালবাসার বীজ বপন করা হয়ে গেল। একসময় বীজ থেকে চারা গজাল। চারা থেকে গাছ। গাছে ফুল ফুটল। এ যেমন তেমন ফুল নয়, বিয়ের ফুল।
অফিস শেষে বের হয়ে ফাহাদ আর রশিদ চা খাচ্ছে এমন সময় বদরুল পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। ফাহাদ ডাকল, বদরুল সাহেব চা খেয়ে যান।
বদরুল বলল, আজ না। আজ একটু তাড়া আছে।
বদরুল চলে যাবার পর রশিদ বলল, বদরুল সাহেব যাচ্ছে তার সেই জ্যোতিষীর কাছে। সে নাকি অতীত, ভবিষ্যত সব বলে দিতে পারেন। একদিন যাবেন নাকি?
আরে না। জ্যোতিষ বিদ্যার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। এগুলো এক ধরনের ধোঁকাবাজি।
পরদিন বদরুল অফিসে ঢুকতেই ফাহাদ আর রশিদ নানা প্রকার তামাশা শুরু করল। বদরুল বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল, জ্যোতিষীকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না। তার কথা সবই সত্যি হয়।
ফাহাদ বলল, আপনার জ্যোতিষী কি জানে তার ভবিষ্যত কি হবে?
রশিদ বলল, এমন ফ্রোডদের ভবিষ্যত হলো সরকারী খরচে থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা অর্থাৎ জেল নিবাস। হা হা।
বদরুল বলল, আপনারা বিশ্বাস করছেন না তো। দাঁড়ান আমি এক্ষণই ফোন করছি।
বদরুল জ্যোতিষীকে ফোন করে ফাহাদের ভাগ্য গণনা করতে বলল। বদরুল ফাহাদকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, নিন, কথা বলুন। জ্যোতিষী ফাহাদকে নাম, জন্ম তারিখ, জন্মস্থানসহ নানা তথ্য জিজ্ঞেস করে বলল, আজ আপনার খুশি দিন। আজ আপনার সঙ্গে চমৎকার কিছু ঘটবে।
ফোন রাখতেই বড় সাহেব ফাহাদকে ডেকে পাঠালেন। ফাহাদ রুম থেকে বেরিয়ে আনন্দিত না হয়ে নির্বাকভাবে বসে আছে। রশিদ জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
ফাহাদ বলল, দীর্ঘ সাত বছর পর আমার প্রোমোশন হয়েছে। দই বছর ধরে প্রোমোশন ডিউ হয়ে ছিল।
বলেন কী? তাহলে তো জ্যোতিষীর কথা সত্য হলো। চলুন না, একদিন দেখা করে আসি।
ফাহাদ বলল, আরে না না। এটা একটা কো-ইন্সিডেন্ট, কোন মিরাকেল না।
রশিদ বলল, চলুন, শুধু একবার দেখেই তো আসব।
বদরুল, রশিদ ও ফাহাদকে নিয়ে গেল জ্যোতিষীর বাড়িতে। বসার ঘরে প্রবেশ করেই ফাহাদ বিস্ময়ে অবিভ‚ত হলো। অনেকগুলো বুকশেলফ ভর্তি বই। শুধু গল্প, উপন্যাস কিংবা জ্যোতিশাস্ত্র নয় বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ে গবেষণাধর্মী বইয়ের সমাহার। ফাহাদের মারকাস তুলিয়াস সিসেরোর কথাটা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছেন, বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো। সত্যি এখানে কিছুক্ষণ বসার কারণে ফাহাদের মনের ভেতর অন্যরকম এক অনুভ‚তি জন্ম হয়েছে। দেহের মধ্যে আত্মার তুষ্টি অনুভ‚ত হলো।
কাজের ছেলেটা চা দিয়ে যেতেই ভদ্রলোক বসার ঘরে ঢুকলেন। ভদ্রলোক হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমি দেব্রত চৌধুরী।
ভদ্রলোককে দেখে ফাহাদ খুব অবাক হলো। মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ। বয়স তেপ্পান্ন-চুয়ান্ন হবে। লম্বা, গায়ের রং ফর্সা। জ্যোতিষীদের চুল কি লম্বা হয়? ওনার চুল ছোট। দাড়ি নেই, ক্লিন শেভ করা। তাকে একদমই পামিস্ট মনে হচ্ছে না। পামিস্টরা হাতে আংটি, পাথর পরে। সে সব কিছুই নেই। আলখাল্লা, ফতুয়া তেমন কিছুও নয়। পোশাক-আশাক বেশ স্বাভাবিক ও আধুনিক।
ফাহাদ বলল, আপনি কত দিন যাবত পামিস্টের কাজ করছেন?
দেব্রত চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন, পামিস্ট? কে পামিস্ট? বদরুল তাই বলেছে বুঝি। ও আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আমি নিজের এই বাড়িটা করার আগে বদরুল যে বাড়িতে ভাড়া থাকে সেখানে ভাড়া থাকতাম।
তাহলে বদরুল যে বলল, আপনি অতীত, ভবিষ্যত, সব বলে দিতে পারেন।
একদমই না। শুধু আমি কেন, কেউই পারে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে অনেক কিছু নির্ণয় করা যায়। তাও হান্ড্রেড পারসেন্ট একুরেটলি বলা সম্ভম নয়।
দেব্রত চৌধুরীর কথায় ফাহাদ সন্তুষ্ট হলো। ভদ্রলোকের কথার মধ্যে কোন অলৌকিকতা বা আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া নেই। বেশ সহজভাবে গুছিয়ে কথা বলেন। দেব্রত চৌধুরী আবার বলতে শুরু করলেন।
আমার কৈশোর কাটে বাংলাদেশে। দুরন্ত আর ছুটন্ত মনের ঝোঁক পড়াশোনার দিকে কখনই ছিল না। আমাদের পরিবারের অর্থনীতিক অবস্থা মোটামোটি ভাল ছিল। তবুও বাবা আমাকে আমার কাকাবাবুর কাছে মানে কলকাতায় পাঠিয়ে দিলেন। ওখানেই পড়াশোনা করি। পরবর্তীতে সেখান থেকে শান্তি নিকেতন ভর্তি হই। আমি আর আমার এক বন্ধু শান্তি নিকেতন থেকে তিন/চার কিলোমিটার দূরে মন্দিরের এক পুরোহিতের কাছে হাত দেখা শিখি। পড়াশোনা শেষে কলকাতায় অনেক বছর চাকরি করি। তখন শখের বসে জ্যোতিষবিদ্যার ওপর পড়াশোনা করি, জ্যোতিষ চর্চা করি। কিন্তু কখনও প্রফেশনাললি এটা করিনি। বর্তমানে আমি ব্যবসা নিয়ে আছি। কিছু নিকট বন্ধু-স্বজন মাঝে মাঝে আসে। তখন নিতান্তই অনিচ্ছায় এগুলো করতে হয়। এই যে বদরুলই প্রায় আসে। না করতে পারি না। কিন্তু আমি কোন জ্যোতিষী নই।
ফাহাদ বলল, আপনি সেদিন ফোনে যে বললেন, আজ আপনি খুশির সংবাদ পাবেন। ঐদিনই আমার প্রোমোশন হয়। সেটা কি করে বলেছিলেন।
আপনার রাশি বিচার করে। জ্যোতিষবিদ্যার আদি ট্রিকস। আপনার রাশি বিচার করে পঞ্জিকা থেকে দিন, ক্ষণ হিসেবের মাধ্যমে।
রশিদ বলল, আপনি আমার হাতটা দেখুন তো। দেব্রত চৌধুরী রশিদের হাত দেখে কয়েকটা বিষয় নিয়ে কথা বললেন। রশিদ বেশ আশ্চর্যান্বিত হলো। কিছু সময়ের মধ্যেই রশিদ দেব্রত চৌধুরীর ভক্ত হয়ে গেল।
উঠতে উঠতে রশিদ ফাহাদকে বলল, এতদূর যখন কষ্ট করে এসেছেন, হাতটা দেখিয়ে যান।
ফাহাদ অনেকটা কঠিন গলায় বলল, না এসবে আমার বিশ্বাস নেই।
দেব্রত চৌধুরী অবাক হলেন না, মিটিমিটি করে হাসছেন। বদরুল আর রশিদের চাপাচাপিতে শেষমেশ ফাহাদের রাজি না হয়ে উপায় রইল না।
দেব্রত চৌধুরী ফাহাদের হাত দেখে যা বললেন তার থেকে দুই তিনটে জিনিস খুব করে মিলে গেল। কিন্তু ফাহাদ এমন ভাব করল যে কিছুই মেলেনি। এক সময় দেব্রত চৌধরী হাত দেখতে দেখতে বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তিনি একটা সিগারেট ধরালেন। খানিক বাদে বললেন, একটা বেশ সিরিয়াস বিষয় দেখতে পাচ্ছি।
ফাহাদ বলল, কী?
দেব্রত চৌধুরী বললেন, আপনার হস্তরেখা বিচারে পাচ্ছি, আপনার হাতে একটা খুন আছে।
ফাহাদ রহস্য করে বলল, তাই নাকি। আপনি তো ভাই বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দিতে পারেন। খুব সহজেই মানুষের হাত দেখে খুনী শনাক্ত করতে পারবেন। এই বলে হো হো করে হাসতে লাগল। বদরুল বলল, দাদা, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। ফাহাদ সাহেব বেশ শান্ত স্বভাবের মানুষ। খুন-টুন তাকে দিয়ে সম্ভব না।
দেব্রত চৌধুরী বলল, তাই তো মনে হচ্ছে। নিশ্চয় কোথাও কোন হিসাবে গণ্ডগোল হয়েছে।
রশিদ মনে মনে বলল, বেটা ঠকবাজ, এতক্ষণে তোমাকে চিনলাম। তুমি কিছুই জান না।
ফাহাদের জীবনযাপন আগে মতন চলতে থাকে তবু কোথাও কিছু একটা পরিবর্তন তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। ফাহাদ বাজার থেকে জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর লেখা কয়েকটা বই কিনে আনল। যেমন- প্রবীর ঘোষের অলৌকিক নয় লৌকিক, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর জ্যোতির্বিজ্ঞান শব্দকোষ, শ্রীহরিহর মজুমদারের ফলিত জ্যোতিষ এবং ইংরেজী ভাষায় রচিত আরও কিছু বিখ্যাত বই। কয়েকদিন গবেষণার পর ফাহাদের মনে জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর বিশ্বাস পোক্ত হবার বদলে আরও অবিশ্বাস জন্মাল।
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ফাহাদ একজন পামিস্টের কাছে উপস্থিত হলো। সে ফাহাদের হাত দেখে সব পজিটিভ কথা বললেন। যেমন- আপনার জন্য নতুন বছর বয়ে আনছে দারুণ এক সুসময়। জীবনে আগে যে সাফল্য আসেনি, এখন তা আসবে। প্রশংসনীয় কাজ করে আপনি সামাজিক প্রশংসা লাভ করবেন। টাকা-পয়সা এবং আনন্দ পাবেন। এ বছর দেশের ভেতরে ও বাইরে আপনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ হতে পারে। তবে আপনার শনির একটু অশুভ প্রভাব রয়েছে যার প্রতিকারের জন্য নীলা পাথর ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু ফাহাদের হাতে খুন লেখা আছে এ রকম কিছু বলল না।
ফাহাদ নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আমার হাতের রেখায় কি কাউকে খুন করার ব্যাপারে কিছু আছে।
জ্যোতিষী বলল, না। এমন কিছুই তো দেখলাম না। কেন, কেউ কি আপনাকে এ ধরনের কিছু বলেছে? কাউকে হাত দেখিয়েছেন? জ্যোতিষী আমাকে সতর্ক করে দিয়ে তাদের কমন একটা বাক্য বললেন, যা কিনা সব ক্লাইন্টকেই বলে থাকেন।
প্লিজ কাউকে হাত দেখাবেন না। আপনার হাত খুব ভাল। অন্য কাউকে হাত দেখালে আপনার ক্ষতি হতে পারে।
জ্যোতিষীর কাছ থেকে মনগড়া এবং মুখস্থ কিছু কথা শুনে ফাহাদ বাসায় ফিরল। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় যেতেই ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝরাতে ফাহাদের ঘুম ভাঙল একটা দুঃস্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে দেখল যে সে একজন মানুষকে খুন করছে। ফাহাদ বিষণœ হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। অদ্ভুত মায়াবী চাঁদ। চাঁদের আলোয় রাত জাগা মন্দ হবে না ভেবে সারা রাত ফাহাদ আর বিছানায় গেল না।
পরদিন ফাহাদ অফিসে যেতে পারলো না। তার শরীরটা খুব একটা ভাল লাগছে না। তারপরও বিকেলে সে গেল দেব্রত চৌধুরীর বাসায়।
আপনার বইয়ের সংগ্রহ ঈর্ষাণীয়। এ কথা বলেই ফাহাদ দেব্রত চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করল, এখানেই কি সব নাকি?
না। বেশিরভাগ বই আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে। সেখানে জায়গা হয়নি বলে বাকি বইগুলো বসার ঘরে রেখেছি।
চা খেতে খেতে দেব্রত চৌধুরীর সঙ্গে ফাহাদের জ্যোতিষ শাস্ত্রের ইতিহাস, উৎপত্তিসহ নানা বিষয়ে কথা হলো। চলে আসার আগে ফাহাদ ভাবল দেব্রত চৌধুরীকে বলবে তার হস্তরেখা বিচার করে আবার একবার খুনের বিষয়টা দেখতে। কিন্তু কিছু না বলেই ফাহাদ সেখান থেকে এলো।
বাসায় ফিরে ফাহাদ গøাসে রাম নিয়ে একটু তাকিয়ে থেকে পর পর দুই পেগ খেল। তৃতীয় পেগ গøাসে নিয়ে যে দেয়ালে নিশাতের ছবি টানানো সেখানে এসে দাড়াল। নিশাতের ছবির দিকে তাকিয়ে আছে আর একটু একটু করে গøাসে চুমুক দিচ্ছে। ফাহাদের হঠাৎ মনে হলো নিশাত তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফাহাদ ভাবল দৃষ্টিবিভ্রম।
নিশাত কথা বলে উঠল। কেমন আছো, ফাহাদ?
ভাল না।
কেন?
এক জ্যোতিষী বলেছে আমার হাতের রেখায় নাকি কাউকে খুন করার কথা লেখা। তুমিই বল আমি কি কাউকে খুন করতে পারি?
না। পার না। তুমি নিজ হাতে কাউকে খুন করতেন পার না। আর তাই তো অন্য একজনকে দিয়ে খুন করিয়েছ।
কী বলছ? আমি কাকে খুন করিয়েছি?
জগলু আমাকে সব বলছে।
জগলু কে?
তুমি যাকে ভাড়া করেছিলে আমায় খুন করতে।
কী বলছো? কোন জগলু? সে কী বলেছে?
নির্জন রাস্তায় জগলু যখন টাকা, মোবাইল, জুয়েলারি ছিনিয়ে নিচ্ছিল; আমি চুপচাপ সব দিয়ে দেই। তবু জগলু আমায় খুন করতে চায়। আমি তাকে বলি, আমার কাছে যা ছিল সব দিয়ে দিয়েছি, প্রয়োজনে পরে আরও টাকা দেব তবু যেন সে আমায় না মারে। তখন জগলু বলে, আফা, আমি আপনারে খুন করার কাম পাইছি। ওয়াদা দিয়া ফেলছি। এই লাইনে জবানের দাম কোটি টাকা। তখন আমি তাকে বলি ঠিক আছে, সে আমাকে মেরে ফেলুক কিন্তু মৃত্যু পথযাত্রীর শেষ ইচ্ছাটা যেন সে পূরণ করে। মারার আগে কে আমাকে খুন করাতে চায় তার নামটা যেন বলে। কিন্তু কেন ফাহাদ, কেন? কেন এমনটা করলে?
মিথ্যে, মিথ্যে, সব মিথ্যে, বলে ফাহাদ হাতের রামের গøাস ছুড়ে মারল নিশাতের দিকে। গøাস গিয়ে পড়ল দেয়ালে। নিশাতকে আর দেখা যাচ্ছে না। ফাহাদ সিগারেট ধরাল। ইজি চেয়ারটায় গিয়ে বসে মাথা এলিয়ে দিল। সব কিছু যেন ফাহাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
আরিফের সঙ্গে নিশাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটা ফাহাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি ঠিকই কিন্তু আঁচ করতে খুব একটা দেরি হয়নি। আলমারির ড্রয়ার থেকে পাওয়া নিশাতের ডায়েরি আর আরিফের লেখা পুরনো চিঠিগুলো ফাহাদের সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। ফাহাদ চেয়েছিল নিশাতের হাতে হাত রেখে জীবনের পথে হাঁটতে। অন্য কেউ কেন তার ভালবাসার মানুষটার হাত ধরে পাশাপাশি চলবে? ফাহাদ চেয়েছিল নিশাতের চুলের বকুল সুবাসে আকুল হতে, আলত করে ছুঁয়ে দিতে নিশাতের অধর। অন্য কেউ কেন স্পর্শ করবে প্রিয়তমেষুকে?








