ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

কাওসার রহমান

বাতাসে বাড়ছে ক্ষতিকর উপাদান

প্রকাশিত: ২১:১৬, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১

বাতাসে বাড়ছে ক্ষতিকর উপাদান

ঢাকায় বায়ুদূষণ না থাকলে আপনি আরও প্রায় সাত বছর সাত মাস বেশি বাঁচতে পারতেন। অর্থাৎ ঢাকার বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার মানুষের আয়ু কমেছে ৭ বছর সাত মাস। আর বায়ুদূষণের কারণে গোটা দেশের মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট সম্প্রতি এমন-ই একটি উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সে’ বলা হয়েছে, সারা দেশের ৬৪টি জেলার প্রত্যেকটিতেই বায়ু দূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত তিন গুণ বেশি। দূষিত বাতাসে কঠিন ও তরল পদার্থ উড়ে বেড়ায়, যার মধ্যে রয়েছে কাঁচ, ধোঁয়া বা ধুলা, যেগুলোকে ‘বস্তুকণা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব বস্তুকণার মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলা হয়, সূ²াতিসূ² ‘বস্তুকণা ২.৫’। যেটি মানুষের চুলের ব্যাসের মাত্র তিন শতাংশ, যেটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ঢুকে যায়। এই দূষণ সবচেয়ে বেশি হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে যা মূলত গাড়ির ইঞ্জিন বা বিদ্যুতকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঝুঁকি বিবেচনা করে বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫) গড় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু ঢাকার বাতাসে এই কণিকার মাত্রা ২০১৮ সালে প্রতি ঘনমিটারে ছিল ৯৭ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম, যা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। আর ২০১৭ সালে এই মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭৯ দশমিক ৭ মাইক্রোগ্রাম। এ বছরেরই (২০২১) মার্চে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাতাসে এই বস্তুকণা ২.৫ এর পরিমাণ ৭৭.১ মাইক্রাগ্রাম পার কিউবিক মিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে সাত গুণ বেশি। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ বায়ু দূষণে বিশ্বে শীর্ষস্থানে ছিল, আর রাজধানী হিসেবে ঢাকা ছিল দ্বিতীয় স্থানে। উল্লেখ্য, কাঁচ, ইটের কণা, ধোঁয়া বা ধুলা, এগুলোকে পিএম ২ দশমিক ৫ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পিএম ২.৫ হচ্ছে এমন এক ধরনের কঠিন বা জলীয় অতি সূ²কণা যা আড়াই মাইক্রোন বা তার নিচে চওড়া। এক ইঞ্চি সমান ২৫০০০ মাইক্রোন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এ কণা একটা চুল যতটা চওড়া তার ত্রিশ ভাগের এক ভাগ সমপরিমাণ চওড়া। ফলে এটা এমন সূ²কণা যা খালি চোখে দেখা যায় না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ সূ²কণা দ্বারা আমরা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এ কণাগুলো এত সূ² যে খুব সহজেই প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে হৃৎপিণ্ড হয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগ যেমন হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, নাক দিয়ে পানি পড়া থেকে শুরু করে এমন ছোটখাটো অসুখ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসসহ হার্ট এ্যাটাক এবং ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা পিএম২.৫-কে ‘জি-১ কার্সিনোজেন’ এর তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এ কণা মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টিতে একদম প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। তাছাড়া, বৃদ্ধ এবং বাচ্চাদের জন্য এ কণা আরও বেশি ক্ষতিকর। বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭ নামক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণের কারণে আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ২০১৫ সালে সাকল্যে ৪২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। পহেলা সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে প্রকাশিত লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী, দেশের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে অবস্থিত। আর বাস্তুকণা ২.৫ বেশি রয়েছে যথাক্রমে নারায়ণগঞ্জ, যশোর, রাজশাহী, খুলনা, পাবনা, ঢাকা ও গাজীপুরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর ছয় মাস। লাইফ ইনডেক্সের গবেষণা মতে, ১৯৯৮ সালে বায়ুদূষণের কারণে গড় আয়ু কমেছিল প্রায় দুই বছর আট মাস, ২০১৯ সালে সেটি পাঁচ বছর চার মাস দাঁড়িয়েছে। অথচ এই ইনেডেক্সের তথ্যেই বলা হয়েছে, কিভাবে চীন কম জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে বায়ুদূষণ কমিয়ে উল্টো তাদের গড় আয়ু বাড়িয়েছে। ২০১১ সালে চীন বায়ুদূষণ কমানোর নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে তাদের গড় আয়ু বেড়েছে ২.৬ বছর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি হয় শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এর মধ্যে হাঁপানি, ফুসফুসের কাশি ছাড়াও লাং ক্যান্সার, স্ট্রোক ও কিডনির সমস্যা হয়। বায়ূ দূষণের জন্য শ্বাসকষ্ট ছাড়াও পেটের সমস্যা, ফুসফুস জনিত সমস্যা, চামড়ার সমস্যা, হাঁপানি বা এলার্জিজনিত সমস্যা, চোখ ও নাকের সমস্যা, যে কোন সংক্রমণ, গর্ভকালীন সমস্যা এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এ দূষণ খুব মারাত্মক প্রভাব ফেলে যা তাদেরকে সারা জীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। এ জন্য বায়ুদূষণের সঙ্গে মানুষের গড় আয়ুর বিষয়টি জড়িত। ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, নবেম্বর থেকে ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত যত শিশু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিল তাদের মধ্যে শতকরা ৪৯ ভাগ শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ছিল। জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)-এর এই গবেষণায় দেখা যায়, ওই সময় রাজধানীর বাতাসে সাধারণত ধুলা ও দূষণ অত্যন্ত বেড়ে যায়। তবে বর্ষা মৌসুমেও শতকরা ৩৫ ভাগ শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগেছিল। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে, গত কয়েক বছর থেকে ঢাকা শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে চলেছে এবং ঢাকা পৃথিবীর দূষিততম নগরীগুলোর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে থাকছে। দেশের অভ্যন্তরে ইটভাঁটি, শিল্প কারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির কালো ধোঁয়া, বস্তিতে প্রায় চল্লিশ লাখ চুলায় আবর্জনা, কাঠ-কয়লা ও কেরোসিন দিয়ে রান্নার ধোঁয়া, ঢাকার বাইরে থেকে আসা হাজার হাজার ট্রাক ও দূরপাল্লার যানবাহনের ধুলা ও ধোঁয়া এবং রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজের ধুলার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণের জন্য এখানকার বায়ু দূষিত হয়ে থাকে। কেন বায়ুদূষণ : ঢাকার বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশ কারণ শহরের আশপাশের ইটভাঁটি। এরপর রয়েছে নির্মাণকাজ। নির্মাণ কাজের কারণে বাতাসে প্রচুর ধুলো যুক্ত হয়। এরপরে রয়েছে যানবাহনে ব্যবহৃত জ্বালানি। এছাড়া নতুন একটি কারণে বাতাস দূষিত হচ্ছে, তা হলো বর্জ্য পোড়ানো। ঢাকায় এখন নানা ধরনের বর্জ্য পোড়ানো হয় এবং এটা দিন দিন বাড়ছে। শিল্প কারখানার মধ্যে স্টিল রিরোলিং মিল বায়ুদূষণ করে এবং ক্ষুদ্র কণা ছড়ায়। এরপরে আছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। ঢাকার বাইরেও বায়ু দূষণের কারণগুলো প্রায় একই রকম। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন-নগরায়ণ ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং নিমার্ণকাজে যথাযথ দূষণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেয়ায় বাতাসে মিশছে ক্ষতিকর সব উপাদান। প্রতিদিন খারাপ হচ্ছে বাতাসের মান। প্রতি বছর বাতাসে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) বা অতি সূ² বস্তুকণার উপস্থিতি বাড়ছে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। এছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি অবশ্যই বায়ু দূষণের একটা বড় কারণ। এক সময় ইটভাঁটির কারণে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হতো। তবে সেটা কিছুটা কমছে কিন্তু আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না। সেটা না হলে ব্যক্তিগত গাড়ি কমবে না, এ ধরনের জ্বালানির ব্যবহারও কমবে না। ঢাকা শহরে যে যানবাহনগুলো চলে সেগুলো বেশিরভাগই ব্যবহারের অনুপোযোগী। অনেকগুলো গড়ি মেয়াদোত্তীর্ণ। গাড়িগুলোর যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেগুলো থেকে বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণ হয়। উন্নত বিশ্ব ‘কন্ট্রোলওয়ে’-তে দূষণ কমাচ্ছে। তারা পুরনো গাড়ি বাতিল করে দেয়। গাড়িতে তারা উন্নতমানের ইঞ্জিন ব্যবহার করে। আমরা নিম্নমানের ইঞ্জিন ব্যবহার করি। তারা গাড়িতে যে জ্বালানি ব্যবহার করে এর সালফারের মাত্রা ৫০ এর নিচে, আমাদের দেশে সেই মাত্রা ২০০০-এর উপরে। তারা ভাল মানের জ্বালানি ব্যবহার করে। তারা ঠিকভাবে গাড়ির মেইনটেন্যান্স করে, আমরা তা করি না। ফলে আমাদের গাড়িগুলো থেকে প্রচুর দূষণ হয়। এদেশে কোন নিয়মনীতি ছাড়া একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ কাজ চলতে থাকে। এ কাজে ব্যবহৃত কাঁচামাল ওখানেই তৈরি হয় এবং তা ঢেকে রাখা হয় না। উন্নত বিশ্বে নির্মাণ কাজ অনেক যতœ এবং কম সময় নিয়ে করা হয়। কাঁচামালগুলো অন্য জায়গায় তৈরি করা হয়। এখানে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা হয় সারা বছর ধরে এবং মাটিগুলো রাস্তার পাশেই রাখা হয়। ওগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এখানে গার্মেন্ট এবং শিল্প কারখানাগুলোর বর্জ্য থেকেও দূষণ ছড়ায় ব্যাপকভাবে। অথচ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এটা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাংলাদেশের বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ আন্তঃসীমান্ত বায়ুপ্রবাহও। মূলত শীতকালে ট্রান্সবাউন্ডারি দূষণটা প্রকট হয়। ইরান, মঙ্গোলিয়া, আফগানিস্তানের শুষ্ক মরু অঞ্চল থেকে ধূলিকণা বাতাসে মিশে যায়। পশ্চিমা লঘুচাপের মাধ্যমে ওই ধূলিকণাসহ বাতাস ভারতে প্রবেশ করে। নবেম্বর থেকে ওই দূষিত বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ভারতের হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশের দূষিত বায়ু এখানে প্রবাহিত হয়। এর ফলে এখানকার বাতাস বেশি দূষিত হচ্ছে। ভারতের কলকাতা, মুম্বাই, পাকিস্তানের করাচী ও বাংলাদেশের ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মারাত্মক যানজট ও ধোঁয়া তৈরি হচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণের ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে ধুলাবালিও বাতাসে মিশছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ওই শহরগুলো এই অঞ্চলের বায়ুকে দূষিত করে ফেলছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের অকালমৃত্যু ও স্বাস্থ্যক্ষতি আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে। এর ফলে মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বায়ু দূষণের ফলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি সেটা সরকারের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণে সরকার সমস্যাটাই দেখতে পারছে না। কি করতে হবে : বায়ুদূষণ কমাতে হলে কম্প্রিহেনসিভ পরিকল্পনা করতে হবে। যার মধ্যে পরিকল্পনা থাকবে, তথ্য থাকবে ও মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। তা হলেই কেবল বায়ুদূষণ কমাতে যেকোনো পদক্ষেপ কার্যকর হবে। নির্মল বায়ুর জন্য স্থায়ী কোনো নীতি গ্রহণ করলেই কেবল জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারে, সেটা গড় আয়ু বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ুর ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। চীন এই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে গড় আয়ু বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়েছে। আমাদেরও সে পথে হাঁটা উচিত। বিকল্প যানবাহনও দূষণ কমায়। মেট্রোরেল ও ইলেকট্রিক কার দূষণ কমাতে সাহায্য করে। আমাদের দেশেও মেট্রোরেলের কাজ চলছে। বিদ্যুতচালিত মেট্রোরেল ২০২২ সালের ডিসেম্বর নাগাদ চালু হলে বায়ুদূষণ কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা যায়। যেহেতু আন্তঃসীমান্ত বায়প্রবাহও বায়ুদুষণের অন্যতম কারণ। তাই স্থানীয়ভাবে ঢাকায় বায়ুদূষণ কমালে কাজ হবে না। এ জন্য আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণ বন্ধ করার বিষয়ে আঞ্চলিকভাবেও উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে এই অঞ্চলের কোনো দেশের বায়ুদূষণমুক্ত হবে না। এক্ষেত্রে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে একত্রিত হয়ে কাজ করতে। এছাড়া, বায়ুদূষণ কমানোর প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাগুলো হলো রাস্তায় পানি দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বা ময়লাগুলো পুড়িয়ে ফেলার মতো নানা ব্যবস্থা। পরিকল্পিতভাবে কারখানাগুলোর ধোঁয়া কমিয়ে আনা। কারখানাগুলো শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া। ট্রাফিক জ্যামের সমাধান করা। উন্নত জ্বালানি ব্যবহার এবং এয়ার কন্ডিশনার কম ব্যবহার করা। অপ্রত্যক্ষ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে : প্রচুর বনায়ন করা, কারণ গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা রাখে। বাড়িঘর ও আবাসিক এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা, যেখানে উদ্যান ও পুকুর থাকবে। নির্মাণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে করা, যাতে সেটি দূষণের কারণ না হয়। বায়ুদূষণ রোধে সরকারের উদ্যোগ তেমন দৃশ্যমান নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তেমন দক্ষ এবং তৎপর নয়। দূষণ পরিমাপে যেসব যন্ত্র ব্যবহার করা হয় তাও তত আধুনিক নয়। সচেতনতামূলক কর্মসূচী নেই বললেই চলে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিবেশ অধিদফতর কাজ করছে। কিন্তু সংস্থাটির কাজে মন্থরগতি আছে। অবশ্য মহামারী করোনার কারণে বায়ুদূষণ রোধে প্রস্তাবিত ‘ক্লিন এয়ার এ্যাক্ট ২০১৯’ এর কাজ পিছিয়ে গেছে। এই আইনটা হওয়া জরুরী। এতে যারা দূষণ বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে এবং বায়ুদূষণের পূর্বাভাসও দেয়া যেতে পারে। সবশেষে বলা যায়, বায়ুদূষণ রোধ করা গেলে মোটামুটি পাঁচটি উপায়ে উপকৃত হবে বাংলাদেশ। ১. গড় আয়ু বাড়বে : স্টেট অব গেøাবাল এয়ার বলছে, বায়ুদূষণ রোধ করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়বে অন্তত এক বছর তিন মাসের বেশি। ২. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা : সবচেয়ে বড় যে উপকারটি হবে সেটি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়তা। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে হলে বায়ুদূষণ রোধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৩. রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা : বায়ুদূষণের জন্য মানুষের শরীরে যেসব রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে, সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে যদি দূষণ রোধ করা যায়। ৪. প্রতিবন্ধী সমস্যা : প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয়ার সংখ্যা কমে যাবে, তেমনি শিশু ও মানুষের গড় আয়ু বাড়বে। এবং ৫. অর্থনৈতিক সুবিধা : বায়ুদূষণ কমানো গেলে একদিকে যেমন মানুষের অসুস্থতা কমবে, গড় আয়ু বাড়বে, সময় সাশ্রয় হবে, পাশাপাশি বেড়ে যাবে জিডিপিও। ফলে মনুষ্য সৃষ্ট বায়ুদূষণ কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী। লেখক : সাংবাদিক, জনকণ্ঠ
×