ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

ড. মোঃ আবু তাহের

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা

প্রকাশিত: ২০:০৩, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আলোকিত মানুষ তৈরি ও মনুষ্যত্ব গঠন। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে; যাতে সুস্থ চিন্তা, মানবিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এ ধরনের আলোকিত মানুষ সমস্ত সঙ্কীর্ণতামুক্ত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতা পরিহার করে সমাজ-দেশ ও বিশ্বকে আলোকিত করবে। এ ধারণা থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির শুরু থেকে দেশ ও জাতি গঠনে শিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এও প্রত্যাশা করেছিলেন, শিক্ষক সমাজ বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনপূর্বক আলোকিত মানুষ উপহার দিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মূলত বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা তাঁর রাজনৈতিক দর্শন থেকে উৎসারিত, যা নিম্নক্ত উদ্ধৃতি থেকে সুস্পষ্ট। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের ম্যানিফেস্টোতে শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের প্রত্যেকের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। শিক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্রের হাতে থাকিবে এবং প্রত্যেক নারী, পুরুষের পক্ষে শিক্ষা বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। দেশের সর্বত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়া শিক্ষা সহজলভ্য করিতে হইবে। উচ্চতর শিক্ষা বিশেষ করিয়া কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাকেন্দ্র খুলিতে হইবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে সরকারী বৃত্তির সাহায্যে উচ্চ শিক্ষাকে উৎসাহিত করিতে হইবে। মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করিতে হইবে।’ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনে বঙ্গবন্ধু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচীর ৯ ও ১০ নং দফায় দলের শিক্ষানীতি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে- (১) দেশের সর্বত্র প্রাথমিক ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করা হইবে (২) শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার করিয়া শিক্ষাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কার্যকরী করিয়া বেসরকারী বিদ্যালয়সমূহের বর্তমান ভেদাভেদ উঠাইয়া দিয়া একই পর্যায়ভুক্ত করিয়া সকল বিদ্যালয়সমূহে সরকারী সাহায্যপুষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হইবে এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে। ১৯৫৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান গণপরিষদে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাদের দেশে ন্যূনতম শিক্ষা লাভেরও সুযোগ নাই। সিংহলে নিম্নস্তর থেকে উচ্চতর পর্যন্ত প্রত্যেকেই এম. এ. ডিগ্রী লাভ পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষালাভের সুযোগ পায়। অথচ আমাদের দেশে এমনকি প্রাথমিক শিক্ষালাভেরও সুযোগ নাই।’ এটা সত্য যে, আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য শরীফ কমিশন গঠন করেন। শরীফ কমিশন রিপোর্টে বাংলা বর্ণমালা বাদ দিয়ে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার্থে জাতীয় বর্ণমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ, বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ায় এর বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ তখন থেকেই আন্দোলন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে চিন্তভাবনা করতেন ’৬২’র শিক্ষা আন্দোলনে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার মাধ্যমে তার প্রমাণ মেলে। ’৭০’র নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ও শিক্ষায় অধিকতর বরাদ্দের বিষয়টি বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে রেডিও-টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু তাঁর শিক্ষা ভাবনা সুস্পষ্টভাবে জাতির সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার পরিসংখ্যান একটা ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ৮০ জন অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি নিরক্ষর লোক বাড়ছে। জাতির অর্ধেকের বেশি শিশুকে প্রাথমিক অক্ষর গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শতকরা ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে মনি করি। কলেজ ও স্কুল শিক্ষকদের, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা দূরীকরণসহ ৫ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য একটা ‘ক্রাশ’ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণীর জন্য উন্মুক্ত থাকবে। দ্রুত মেডিকেল কলেজ ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ দারিদ্র্য যাতে উচ্চ শিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।’ [মিজানুর রহমান মিজান (সম্পাদিত), বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ঢাকা, নভেল পাবলিকেশন, ১৯৮৯, পৃ. ২৮]বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা পূর্বকালে যা বলেছেন, স্বাধীনতাত্তোর শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে তা করছেন। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’সর্বজনীন অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদানকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বস্তুত শিক্ষা যে একটি মৌলিক অধিকার, তা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। সবার জন্য শিক্ষা ব্যতীত জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির যে উপায় নেই, তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এ লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেন। এর মধ্যে দেশের ছত্রিশ হাজার এক শ’ পনেরোটি প্রাথমিক স্কুল সরকারীকরণ, এগারো হাজার নতুন প্রাথমিক স্কুল স্থাপন, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্য। উচ্চ শিক্ষা প্রসারের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রতিষ্ঠা-১৯৭৩ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছিল, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতসহ শিক্ষকগণ চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার সুযোগ পান। এ সমস্ত কর্মকান্ডের পাশাপাশি দীর্ঘকালীন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদাকে সভাপতি ও অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে সদস্য-সচিব করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। উক্ত কমিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘একটি সমাজতান্ত্রিক দেশের উপযোগী নাগরিক তৈরির জন্য যে ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, কমিশনের উচিত সে ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা সুপারিশ করা।’ এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের জন্য বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা চান, তার প্রতিফলন ঘটে। শিক্ষা বঙ্গবন্ধুর কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তিনি একে সমাজ-দেশ গঠনে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত কমিশন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দেশের শিক্ষার সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুবীক্ষণ, জনগণের কাছ থেকে শিক্ষার বিদ্যমান পরিস্থিতি ও তাদের মতামত নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণপূর্বক ১৯৭৪ সালের ৩০ মে ৩৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত ৪৩০ পৃষ্ঠা সংবলিত রিপোর্টটি বঙ্গবন্ধু সরকারের নিকট পেশ করেন। এই রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা বেশিরভাগই প্রতিফলিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু উক্ত রিপোর্টটি সাদরে গ্রহণ করে রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী একটি বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। জাতির দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর একুশ বছর এ চক্রের পৃষ্ঠপোষকরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গতিপথও পাল্টে দেয়া হয়। তাই কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। তবে এটা সত্য যে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন পরিবর্তন সত্ত্বেও অদ্যাবধি এ রিপোর্টটি একটি চমৎকার রিপোর্ট হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত। বর্তমান সরকার কর্তৃক গঠিত কমিটি পরিবর্তিত বাস্তবতাকে বিবেচনা করে উক্ত রিপোর্টের কিছু জায়গায় পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংযোজনপূর্বক জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০১০ প্রণয়ন করে এবং সে অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইতোমধ্যে শিক্ষা আইনের খসড়াটি প্রণীত হয়েছে। আশা করি, শীঘ্রই শিক্ষা আইনটিও জাতীয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হবে। শিক্ষাই শক্তি, শিক্ষাই আলো, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড ও উন্নতি-অগ্রগতির একমাত্র সোপান। পৃথিবীর কোন দেশ কত বেশি উন্নত তা সে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তাই উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষায় বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে। দেশের উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। আমরা সেই পথই অনুসরণ করব, যে পথে সমাজে অবহেলিত ও পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীকে টেনে তুলে একটি সমতাভিত্তিক মানবিক উন্নয়ন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। জাতির পিতার নির্দেশিত পথ ধরেই যদি আমরা একটি বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল ও উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলেই বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা ও তার সুযোগ্য কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ পরিচালনায় নিরলস পরিশ্রম ও সাধনা সার্থক হবে। লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন
×