ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

শীঘ্রই ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণ

প্রকাশিত: ২৩:২৬, ১৮ মার্চ ২০২২

শীঘ্রই ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণ

এম শাহজাহান ॥ নিত্যপণ্যের বাজারে ভ্যাট প্রত্যাহারের সুবিধা কার্যকর করতে ভোজ্যতেলে নতুন করে দাম নির্ধারণ করে দিবে সরকার। তিন স্তরে ভ্যাট কমানোর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ভোজ্যতেলের দাম কতটুকু কমতে পারে এ সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ নিরূপণ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। শীঘ্রই নতুন দাম নির্ধারণ করে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে। কয়েক মাস ধরেই অস্থির ভোজ্যতেলের বাজার। অসাধু ব্যবসায়ীরা মজুদ করার কারণে ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে তেলের দাম। এ কারণে দাম সহনীয় করতে আমদানি, উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে মোট ভ্যাট কমানো হয়েছে ৩০ শতাংশ। ভ্যাট কমানোর এই সুবিধা নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর হচ্ছে কিনা তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বাজার মনিটরিং টিম। রমজান মাস সামনে রেখে মজুদকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত বাজারে অভিযান পরিচালনা করবে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর। এর পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ে কারসাজি বন্ধে গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ, ডিবি এবং সরকারের অন্যান্য এজেন্সি মাঠে থাকবে। জানা গেছে, রমজান মাস সামনে রেখে ভোজ্যতেলসহ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নামছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল, গম এবং খেজুরসহ অন্যান্য আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য দেশে আসা শুরু হয়েছে। দ্রুত এসব পণ্য খালাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া ভোগ্যপণ্যের আমদানি উৎসাহিত করতে শূন্য মার্জিনে এলসি বা ঋণপত্র খোলার সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পাশাপাশি ব্যাংক ঋণও সহজীকরণ করা হয়েছে। ভোজ্যতেলের পাচার বন্ধে সীমান্তে কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। এসব উদ্যোগের ফলে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, ভোজ্যতেলের তিন স্তরে ভ্যাট কমানোর সুবিধা কার্যকর করতে নতুন দাম নির্ধারণ করে দেয়া হবে। ইতোমধ্যে উৎপাদন পর্যায়ে ১৫, ভোক্তা পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং সর্বশেষ আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণে চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ করা হবে। তবে প্রাথমিকভাবে মন্ত্রণালয়ের যে পর্যবেক্ষণ তাতে ভোজ্যতেলের দাম কমে সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। তিনি বলেন, ভ্যাট কমানোর এই সুবিধা সারাদেশে কার্যকর করতে নতুন দাম নির্ধারণ করে দিবে সরকার। নির্ধারিত ওই দামের বাইরে ভোজ্যতেল বিক্রি করার কোন সুযোগ থাকবে না। তিনি জানান, অসাধু ব্যবসায়ী বিশেষ করে যারা মজুদ করে বাজারে ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন তাদের ছাড় দেয়া হবে না। এ লক্ষ্যে বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, জরিমানা এবং জেলে দেয়ার মতো শাস্তি দিবেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ব্যাপারে সরকার আরও কঠোর অবস্থানে থাকবে। এদিকে ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ট্রেড এ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এই দফতর থেকে শীঘ্রই দাম নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেয়া হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। তিন স্তরে ৩০ শতাংশ ভ্যাট কমানোর ফলে খুচরা পর্যায়ে কতটুকু দাম কমতে পারে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে সংস্থাটি। ভোক্তারা যেন এবার বঞ্চিত না হন সেদিকে সবচেয়ে বেশি নজর দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ৬ ফেব্রুয়ারি এক প্রকার চাপে ফেলেই সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হলে পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে ভোজ্যতেল আমদানি করা হবে না বলে আগেই হুঁশিয়ার দিয়েছিল রিফাইনাররা। নতুন করে খোলা হবে না ঋণপত্র (এলসি)। এক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য তৈরির সবচেয়ে বড় উপকরণ ভোজ্যতেল শূন্য হয়ে পড়তে পারে নিত্যপণ্যের বাজার। ব্যবসায়ীরা আরও বড় ধরনের কারসাজির আশ্রয় নিতে পারেন। এই শঙ্কা দূর করতে সেই সময় কয়েক দফা বৈঠকের পর রিফাইনারদের দাবি মেনে দেশের খচুরা বাজারে সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেই সময় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ৮ টাকা বেড়ে ১৬৮ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৭ টাকা বেড়ে ১৪৩ টাকা, বোতলজাত সয়াবিনের ৫ লিটার তেলের দাম ৩৫ টাকা বেড়ে ৭৯৫ ও পাম তেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে ১৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার নির্ধারিত এই দাম কখনই বাজারে কার্যকর হয়নি। এখনও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে খুচরা বাজারে বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি করা হচ্ছে। তবে অভিযানের মুখে মজুদকৃত তেলের সরবরাহ বেড়েছে ভোগ্যপণ্যের বাজারে। এ কারণে নতুন করে আর দাম বাড়েনি। রমজান মাস সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের কারসাজি এখনও বন্ধ হয়নি। এমনকি মৌসুমি কিছু ব্যবসায়ী ঢুকে পড়েছেন ভোজ্যতেলের বাজারে। গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশি অভিযানে বাসাবাড়িতে সয়াবিন মজুদের প্রমাণ মিলছে। সম্প্রতি লালমাটিয়ায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তার বাসা থেকে প্রায় সাড়ে ৫০০ লিটার বোতলজাত ভোজ্যতেল জব্দ করা হয়। জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৩৬ টাকা নির্ধারিত ছিল। আর বোতলজাত সয়াবিনের ৫ লিটার তেলের দাম ৭৬০ টাকা ও পাম তেলের দাম ছিল ১১৮ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস আগেই বাংলাদেশ ট্রেড এ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর জন্য মিলারদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স এ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হলেও প্রতিনিয়ত ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকার নতুন করে যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই দামের চেয়েও কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেল। যেমন বোতলজাত প্রতিলিটার সয়াবিন তেলের নতুন দাম ১৬৮ টাকা। খুচরা বাজারে কোন কোন ব্র্যান্ডের এই তেল এখন ১৭০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। একইভাবে পাঁচ লিটারের বোতল ৭৯৫ টাকা হলেও ঢাকার কোন কোন বাজারে ৮০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকাসহ সারাদেশে ভোজ্যতেলের বাজারে ব্যবসায়ীদের চরম নৈরাজ্য চলছে। খোলা পাম অয়েলের দাম বেশি হওয়ায় বোতলের ক্যান থেকে তেল বিক্রি করার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এরপরও কারসাজি বন্ধ হচ্ছে না।